সম্ভাবনাময় বাজারে শঙ্কার ছায়া : অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা

0
12

বাংলা ভাষায় ‘সস্তার তিন অবস্থা’ প্রবাদটি নতুন নয়। কম দরে বেগুন কিনে তার পোকায় খাওয়া অংশ কেটে ফেলতে ফেলতে যা থাকে, তা ওজন দিলে বাজারের স্বাভাবিক মূল্যে প্রাপ্য অংশই মেলে- এমন চিত্রকল্প আমাদের কথাসাহিত্যেও কম নেই। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে এসে ‘অনলাইন মার্কেট’ করতে গিয়ে ‘অফলাইন’ সেই প্রবাদই যে ভিন্ন রূপে ফিরে আসতে পারে, কে ভেবেছিল? প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি আরও গুরুতর। অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে দামি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্য কিনতে গিয়ে হাতে পেয়েছেন সস্তা পণ্য, এমন অভিজ্ঞতা এখন বিরল নয়। হাতে পাওয়ার পর পছন্দ না হলে ফেরত দিয়ে উপযুক্ত পণ্য পাওয়া যাবে- এমন প্রতিশ্রুতিও যে কতবার ভঙ্গ হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দেওয়া কঠিন।
আলোচ্য প্রতিবেদনেও মোবাইল ফোনসেট কেনার চাহিদা জানিয়ে অর্থ পরিশোধের পর সস্তা বা নষ্ট পণ্য পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আরও অবাক করার বিষয়, আগাম অর্থ পরিশোধের পর কোনো পণ্যই মিলছে না! ‘হাওয়া’ হয়ে যাচ্ছে, খোদ ‘সেবাদাতা’। ফেসবুকে যেসব পেইজ খুলে এসব পণ্য ‘বিক্রয়’ করা হয়, সেগুলোও আর সচল থাকে না। বস্তুত অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা কীভাবে ক্রমেই বাড়ছে, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে জমা হওয়া অভিযোগের সংখ্যা থেকে তা খানিকটা ধারণা করা যেতে পারে। আমাদের মনে আছে, গত বছর সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, মাত্র ছয় মাসে সরকারি এই সংস্থায় সাড়ে পাচশ‘র বেশি অভিযোগ জমা পড়েছিল অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে। এই অনুমান অমূলক হতে পারে না যে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। আমাদের দেশে খুব কম গ্রাহকই প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পর্যন্ত যায়। প্রতারণার শিকার বেশিরভাগ হয়তো যে ফেসবুকেই একটি ‘স্ট্যাটাস’ দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষান্ত হন। অস্বীকার করা যাবে না যে, প্রতারণার ফাঁদ অনলাইনে বা অফলাইনে যে কোনো স্থানেই পাতা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সতর্কতার বিকল্প নেই। অনলাইনে কেনাকাটা অফলাইনের তুলনায় ‘সহজ’ হলেও সেখানে প্রতারণাও যে সহজ, ভুলে যাওয়া চলবে না। কোন সাইট থেকে কিনছেন, তা এক্ষেত্রে বড় বিষয়। প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য সাইটগুলো থেকে কেনাকাটাই যে কারণে নিরাপদ। অনেক বিশেষজ্ঞ যে অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তাও হতে পারে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। কারণ এতে করে আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড অন্তত থেকে যায়। সেখান থেকে প্রতারকদের শনাক্ত এমনকি আইনের আওতায় আনা কঠিন হতে পারে না। আমরা মনে করি, গ্রাহকের সচেতনতার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এ ধরনের প্রতারণা রোধে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। প্রয়োজন উপযুক্ত আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা। অনলাইন প্রতারণা রোধে বিশেষায়িত পুলিশি ব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনলাইন প্রতারণা দেশের সম্ভাবনাময় একটি খাতে শঙ্কার ছায়া ফেললে তার প্রভাব হবে বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী।
আমরা দেখছি, আউটসোর্সিংয়ের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ ক্রমেই নিজের স্থান করে নিচ্ছে। বিশেষত তরুণদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে অনলাইন তৎপরতার মাধ্যমে আয়মূলক এই খাতে। আমরা দেখছি, ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় রাজধানীর বাইরেও প্রত্যন্ত এলাকার তরুণ-তরুণীরা ঘরে বসে আয় করছে এই খাতে। বিশেষত করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে কেনাকাটা বেড়েছে। এতে করে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এই সময়ে এসে অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা যেমন গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে, তেমনই নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সৎপথের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও ক্ষুন্ন করতে পারে। আমরা চাই, সম্ভাবনাময় এই বাজার থেকে শঙ্কার ছায়া সরাতে কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হোক। প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সক্রিয়তা বাড়–ক। তবে ঢালাও অভিযানও কাম্য হতে পারে না। অনলাইন কেনাকাটা খাতের সৎ উদ্যোক্তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখতেই হবে। আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচিও নেওয়া জরুরি। প্রতিষ্ঠিত অনলাইন মার্কেটিং কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসতে পারে গ্রাহক সচেতনতা কর্মসূচি নিয়ে। যাতে করে আগ্রহীরাই আসল ও নকলের পার্থক্য বুঝতে পারে। আমরা সম্ভাবনাময় এই খাতের বিকাশই দেখতে চাই, বেআইনি কর্মকা- কদাচ নয়।

LEAVE A REPLY