যৌনতা, ধর্ষণ ও মৃত্যুদন্ড

0
11

মেহেরুন্নেছা
ধর্ষণের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো, ধর্মীয় ও সামাজিক পটভূমিতে মূলত দিনের পর দিন অবিবাহিতদের অবদমিত যৌনাকাঙ্খা ও বিবাহিত নর-নারীর যৌন অতৃপ্তি সমাজকে ক্রমশ ভারসাম্যহীনতার দিকে ধাবিত করে। মাদক ও পর্নোগ্রাফি এই ভারসাম্যহীনতাকে আরো উস্কে দেয়। ফলে ধর্ষকামী পুরুষ সকল বিপদসংকুল পরিস্থিতি আলিঙ্গন করে ধর্ষণ ও বলাৎকারে লিপ্ত হতে একদন্ড ভাবেনা।
অনেক সময় নারীর সহজাত কিছু আচরণ পুরুষের নিকট যৌনতার আমন্ত্রণ বলে মনে করে; যেমন- নারীর পোশাক। আবার অনগ্রসর সমাজে যৌনতা ও ধর্ষণকে একই রেখায় রেখে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। তারা এই জ্ঞানটুকু ধারণ করে না যে, যৌনতা শিল্প আর ধর্ষণ হলো ভায়োলেন্স। যৌনতাকে ধর্ষণের কাতারে নিয়ে যেসব মন্তব্য করে তাতেও তাদের যৌনতা বিষয়ে অজ্ঞতা ফুটে ওঠে। এই অজ্ঞ সমাজ মনে করে, নারী নিজেকে পোশাকে সুসজ্জিত করলে ধর্ষণের ঝুঁকিতে পড়ে। নারী-পুরুষের ডেটিং যত নির্জনে হবে ততই ধর্ষণের ঝুঁকি বাড়বে। এমনকি নারীর ঋতুচক্রকালীন উর্বর সময়ের আচরণও নারীকে ধর্ষণের ঝুঁকিতে রাখে। এসকল পশ্চাৎপদ ধারণা একটি সমাজে সুশিক্ষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাহীনতাই নির্দেশ করে এবং ধর্মান্ধতার সরব উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, ধর্ষণ ও যৌনতা কি! ধর্ষণ হলো যৌন আক্রমণ। ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া অথবা যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। অন্যদিকে মানবের কাম উদ্রেককারী অভিজ্ঞতা হলো যৌনতা। কাঙ্খিত ব্যক্তির প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ ঐ ব্যক্তিকে যৌন অভিমুখী করে। যৌনতা একটি মনোমুগ্ধকর সাড়াপ্রদান কিংবা নান্দনিক প্রকাশের ব্যাপার। বিভিন্নভাবে মানব-মানবী যৌনতাকে উপভোগ করতে পারে। কল্পনা, চিন্তা, আচরণ ও সম্পর্কের মাধ্যমে যৌনতা স্থাপিত হয়। যৌনতা যতই ধর্মীয়, নৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং আইনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক না কেনো; আমি মনে করি যৌনতা তখনই শিল্প হয়ে ওঠে যখন তার মাঝে দার্শনিকতা ও আধ্যাত্মিকতা থাকে। সুতরাং যৌনতাকে শিল্পবোধ এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নিয়ে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।
কিন্তু সময়ের খেয়া পার হয়ে উপমহাদেশের পুরুষতন্ত্র যৌনতাকে তাদের একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। শুধু এতোটুকুতেই পুরুষতন্ত্র থেমে থাকেনি। এ সমাজের পুরুষতন্ত্র এখন নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার প্রকট অভাব হেতু যৌনতাকে ভায়োলেন্সের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। ফলে ধর্ষণের উন্মত্ততা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিলো, “তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসে ধর্ষণ, সিলেট এমসি কলেজ।”একই দিনে আরেকটি শিরোনাম, “মা-বাবাকে বেঁধে পাহাড়ি তরুণীকে ধর্ষণ, আটক ৭।” তারপরেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঘটে গেলো সেই রোমহষর্ক ঘটনা; যে ঘটনায় মানুষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো নারীর প্রতি পাশবিকতা দেখে। ৬ অক্টোবর ২০২০, জাতীয় দৈনিক এই ঘটনার শিরোনাম করেছিলো এভাবে, “প্রতিবাদে ফুঁসছে দেশ,‘মানুষ তুমি চুপ কেন’, বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল হলে ঘটনার প্রায় ৩২ দিন পর থেকে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়।”
ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওতে একজন নারীকে উলঙ্গ করে যত রকমের নৃশংস কায়দায় নির্যাতন ও উল্লাস করা যায় তা করেছে স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনী । হতভাগা নারী বাবা ডেকে, পায়ে পড়েও তাদের অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি। ভিডিওটি এতোই হৃদয়বিদারক ছিল যে, আমি হলফ করে বলতে পারি, কোনো সুস্থ মানুষ তা নিতে পারবেনা। চোখ বন্ধ করলে এখনো তাদের জান্তব উল্লাস কানে বাজে; ঐ অসহায় নারীর নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা ভীতির উদ্রেক করে।
নাহ! এই ভিডিও আমি নিতে পারিনি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। নারী হিসেবে আমাকে ভয় ও আতঙ্ক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। প্রথমে প্রতিবাদস্বরূপ শেয়ার করেছিলাম। পরে মুছে ফেলেছি। কারণ, এই ভিডিও ঐ নারীর জন্য অপমানজনক। এই ভিডিও দেখে পুরুষ নামক কিছু নরকের কীট গোপন উল্লাসে মেতে উঠবে। অন্তত আমার পারিপার্শ্বিকতা কিংবা সমাজ থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা তাই বলে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নির্যাতনকারীর শাস্তিহীনতা, বিচারহীনতা, নারীর নীরবে সয়ে যাওয়ার প্রবণতা, নারীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা, সর্বোপরি সুশাসনের অভাব- এসবই হলো ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধির কারণ। কেবল ধর্ষণ নয়, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ এবং বার্ন ভায়োলেন্সের জন্যও দায়ী কিন্তু এসব নিয়ামক।
নারীরা বাস্তবে যেমন ধর্ষিত হয়, তেমনি অনলাইনেও তারা অশ্লীল বাক্যবাণের শিকার হয়। এই অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে এক শ্রেণীর লালসাকামী অবলীলায় ভার্চুয়াল জগতে নারীদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নারীদের চেয়ে বনের পশুও অনেক নিরাপদ। বেশকিছু দিনের ধর্ষণ সম্পর্কিত পত্রিকার শিরোনামতো সেকথাই জানান দিচ্ছে। সাম্প্রতিক নারীর প্রতি মধ্যযুগীয় বর্বরতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যদিও নারীর প্রতি এমন নির্যাতন অহরহ ঘটছে যেগুলো পত্রিকার পাতায় উঠে আসতে আসতে হারিয়ে যায়। সেইসব নারীদের আর্তনাদ কেবল এ দেশের আকাশে-বাতাসেই চিরকাল হাহাকার করে বেড়াবে। তারপরেও নারীর বিরুদ্ধে কৃত এসব ন্যক্কারজনক অনাচারের বিরুদ্ধে নতুন করে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে যখন পুরো দেশ ফেটে পড়ছে তখনো থামছে না ধর্ষণ। ৯ অক্টোবর, ২০২০, একটি জাতীয় দৈনিক’র শিরোনাম, “ধর্ষণের শিকার আরও ১১ শিশু।” এমনি একটা অবস্থায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদ- করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অথচ দেখুন, ১০ অক্টোবর ২০২০, জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়, “সারা দেশে আরও ১১টি ধর্ষণে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।” ১১ অক্টোবর ২০২০, একটি জাতীয় দৈনিক’র শিরোনাম, “ভুল স্টেশনে তরুণী, পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দল বেঁধে ধর্ষণ।” ১৩ অক্টোবর ২০২০ জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়- “ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড, অধ্যাদেশে কার্যকর।“ ঠিক তার পরদিন ১৪ অক্টোবর ২০২০ একটি জাতীয় দৈনিকে উঠে আসে, “অভিমানে ঘরছাড়া দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণ” এবং তার পাশের কলামটির শিরোনাম ছিল এমন, “ধর্ষণের পাশবিকতা নিয়ন্ত্রণে মৃত্যুদন্ডের বিধান ঃ প্রধানমন্ত্রী।”
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, কেনো আমি পর্যায়ক্রমে ধর্ষণের ঘটনাগুলো আলোকপাত করেছি। একদিকে ভাইরাল মহামারি, আরেকদিকে ধর্ষণের মহামারি। এনজিওগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৮৮৯ টি। নিকটসময়ে যখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে উত্তাল সারা দেশ, যখন সরকার ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণে মৃত্যুদন্ডের বিধান কার্যকরে তৎপর ; ঠিক তখন সেই নরাধমরা তাদের বিকৃত লালসা চরিতার্থে মোটেই পিছপা হচ্ছে না।
তাই ভাবছি, সত্যিই কি মৃত্যুদ- ধর্ষকামীদের ধর্ষণ থামাতে পারবে? আমাদের নিশ্চই মনে আছে, একসময় এদেশে এসিড সন্ত্রাস কোনোক্রমেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিলো না। পরবর্তীতে সরকার ২০০২ সালে এসিড নিক্ষেপের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করে। উপরন্তু এসিড কেনা-বেচা ও পরিবহনের আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে। ফলে এসিড হয়ে পড়ে দুষ্প্রাপ্য এবং এসিডের খুচরা প্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলাফলও বাংলাদেশ পেতে শুরু করে। এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের মতে, ২০০২ সালে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ছিলো প্রায় ৫০০। ২০০৯ সালে কমতে শুরু করে। ২০১৮ সালে এসিড সন্ত্রাস হয় মাত্র ১৮ টি।
ধর্ষণের ক্ষেত্রেও মনে করি, কেবল মৃত্যুদ- কার্যকর করলেই ধর্ষণ কমে যাবেনা। ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে হলে জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। গণমাধ্যমের সহায়তায় কঠিন জনপ্রতিরোধ সমাজকে এহেন কলুষতা থেকে অবশ্যই মুক্ত করতে পারবে। এক্ষেত্রে সমাজ থেকে মাদক, পর্ণোগ্রাফী, ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পও কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আরো একটি বিষয় উল্লেখ প্রয়োজন বলে মনে করি, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার সাথে জড়িত একাংশের মাঝে কোনোক্রমেই যেন ধর্ষণের শিকার নারীর চারিত্রিক ত্রুটি আছে এমন ভাবনার উদ্রেক না ঘটে।
মোদ্দাকথা, ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাইলে, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ- কার্যকরের পাশাপাশি অবশ্যই সমাজ থেকে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বা বিষাক্ত পৌরুষের বিলোপ সাধন করতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।

LEAVE A REPLY