সময়ে এক ফোঁড় দিন : বাজার ব্যবস্থাপনা

0
16

মাসখানেক ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। চাল, পেঁয়াজ, আলু, ডিম ও সবজির দাম যেভাবে বেড়েছে এবং কর্তৃপক্ষের বারবার সতর্ক করা, মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বাস্তবে এসবের নিয়ন্ত্রণহীন বাজার আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। শুক্রবার খাদ্য দিবসে জাতীয় একটি সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে তাই বাজার অব্যবস্থাপনার বিষয়টি যথার্থভাবেই উঠে এসেছে। আমরা জানি, করোনাদুর্যোগের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা থাকলেও কৃষক রেকর্ড খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ সেই পণ্য ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারছেন না। এমনকি কৃষকও তার পণ্য উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করতে পারেননি। আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে চাল ও আলুর মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। সম্প্রতি সরকার এ দুটি পণ্যের দাম ঠিক করে দিলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজারে তার কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালে হাওরে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে মোটা চালের কেজি ৫০ টাকায় উঠেছিল, এরপর এবার কাছাকাছি দামে মানুষ চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আলুর দাম কোনো বছরই এ সময় প্রতি কেজি ৩০ টাকার বেশি হয় না। অথচ সেই আলু এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে। আমরা জানি, বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চালের পরেই আলুর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে সবজির চড়া বাজারে দরিদ্র মানুষ বিকল্প হিসেবে খাদ্য তালিকায় নানাভাবে আলুর ব্যবহার করেন। বিশ্বব্যাপী করোনাদুর্যোগের এ সময়ে যেখানে মানুষের আয় কমেছে, চাকরি হারানোসহ অর্থনৈতিক নানা টানাপড়েনের মধ্যে অসহায় মানুষের পাশে স্থিতিশীল বাজার কিছুটা হলেও সহায় হয়ে দাঁড়াতে পারত। অথচ সেই বাজার ব্যবস্থায়ই বিশৃঙ্খলা দেখছি আমরা।
করোনাদুর্যোগের মধ্যে এ বাজার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন ও মজুদে তেমন সমস্যা না থাকলেও প্রশাসনের বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে না পারায় মাশুল দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ শিকল ঠিক করতে হবে। পরিবহন, জনবল, হিমাগার সংকট দূর করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সংকট নিয়ে আলোচনা করতে হবে। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কারা কারসাজি করছে, কারা পণ্য মজুদ করছে তা কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে না। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়াচ্ছে কিনা তাও শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে নিবিড় নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক ভূমিকা রাখতে পারছে না। সমকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে ভুগছে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো। এতে খাদ্য বিতরণ, সংগ্রহ, নজরদারিসহ বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি ব্যাহত হচ্ছে ভেজালবিরোধী অভিযানও। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক। আর দীর্ঘমেয়াদে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আলাদা মন্ত্রণালয়ের যে প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ক্যাব সভাপতি বলেছেন, সেটিও বিবেচনা করা উচিত। ভোক্তাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্য নির্ধারণ, আমদানি করা, বাজার নজরদারি ও বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে আমরাও মনে করি। শুক্রবার খাদ্য দিবসের এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহী হবে কেন? ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া যখন সরকারের লক্ষ্য, তখন বাজারের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আমরা দেখতে চাই, বাজারের অস্থিতিশীলতা দূর করতে কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিত ও সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণে আর সময়ক্ষেপণ করছে না। সময়ে এক ফোঁড় দিতে না পারলে অসময়ে দশ ফোঁড় দিয়েও লাভ হবে না।

LEAVE A REPLY