বাবার ‘রাজ্যে’ ইরফান ছিলেন একমাত্র ‘সম্রাট’

0
21
ইরফান

কল্যাণ ডেস্ক : ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম ২০১৬ সালে আকস্মিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ট্রোকের পর বাকশক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন। শারীরিক এমন অবস্থার মধ্যেই ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ঠিকঠাকভাবে কথা বলতে না পারায় তার খুব বেশি কর্মসূচি বা তৎপরতা ছিল না।
লালবাগ-চকবাজারের লোকজন জানান, এর পর থেকে মূলত হাজী সেলিমের ছেলে ইরফানই বাবার ‘রাজ্যের’ হাল ধরেন। বাবার হয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু দলীয় পদ না থাকায় মাঝেমধ্যে বিপাকে পড়তে হয় ইরফানকে। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে যান ইরফান। বাবা আর শ্বশুর এমপি-সেই প্রভাবে সরকার সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থীকে হারিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে জিতে যান তিনি। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একাধারে কাউন্সিলর ও ‘ছায়া এমপি’ হয়ে পুরান ঢাকায় এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন তিনি। অভিযোগ আছে- অনেক বাড়ি-জমি দখল করছেন ইরফান। গঠন করেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী; যারা পুরো লালবাগ-চকবাজার এলাকা তটস্থ রাখত।
‘রাজার’ মতোই চলতেন ইরফান। বাবার ‘রাজ্যে’ তিনিই ছিলেন একমাত্র ‘সম্রাট’। অনিয়ম-দুর্নীতি আর ক্ষমতার দাপট সমানতালে চললেও কেউ ভয়ে মুখ খুলতেন না। তবে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর এখন অনেকেই ইরফান ও তার বাহিনীর ব্যাপারে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন।
জানা গেছে, ৪০ দেহরক্ষী নিয়ে চলত হাজী সেলিমের পরিবার। একাধিক দেহরক্ষী ছিল ইরফানেরও।
মঙ্গলবার তাকে কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এদিকে, ইরফান সেলিম ও তার সহযোগী জাহিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনের পৃথক দুটি করে মোট চারটি মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত এই নির্দেশ দেন।
এর আগে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরীর আদালত দুই আসামি ইরফান ও জাহিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের দুটি মামলার এজহার গ্রহণ করে আগামী ১৭ নভেম্বর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর হাকিম মামুনুর রশিদের আদালত তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলার এজহার গ্রহণ করে আগামী ৩ ডিসেম্বর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

ইরফানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা ডিবিতে :

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী জাহিদের বিরুদ্ধে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) মামলাটি হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আশফাক রাজীব হাসান।
তিনি জানান, মামলাটির তদন্তভার ইতোমধ্যে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার নথি-পত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এ বিষয়ে আদালতের অনুমতি চাওয়া হবে। আদালতের নির্দেশক্রমে ধানমন্ডি থানা হেফাজতে থাকা দুই আসামিকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বুধবার দুপুরে ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী জাহিদকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধানমন্ডি থানা হেফাজতে নেওয়া হয়।

৪০ দেহরক্ষী এক পরিবারে :

স্থানীয় লোকজন ও র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, দ- পাওয়া ইরফান সেলিম ও তার পরিবারে মোট ৪০ জন দেহরক্ষী। তারা সব সময় ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ী’ ঘিরে রাখত। এরমধ্যে ১২ জন দেহরক্ষী ছিল শুধু ইরফানের। সুঠাম দেহের অধিকারী এসব দেহরক্ষীকে তিনি নিজেই নিয়োগ দেন। ইরফান বা তার পরিবারের কেউ বাসভবনের বাইরে গেলে অন্তত আধাঘণ্টা আগেই ভিভিআইপি প্রটোকলের মতো করে চকবাজারের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হতো। তারা বাসায় ফেরার আগে একই কাজ করত ওই দেহরক্ষীরা।
স্থানীয়রা জানান, ইরফান বা তার পরিবারের যাতায়াতের সময়ে কেউ রাস্তায় থাকলে বা ভুলে কোনো রিকশা-গাড়ি রাস্তায় ঢুকলে তাদের বেদম পেটানো হতো। ওই ৪০ দেহরক্ষীর বাইরে অন্তত ১০০ বেতনভুক্ত ক্যাডার রয়েছে ইরফানের।

দখলের ‘সাম্রাজ্য’ :

চকবাজারের পুরোনো একজন বাসিন্দা জানান, হাজী পরিবারের (হাজী সেলিমের পরিবার) দুই রূপ। এলাকার বড় অংশের কাছে পরিবারটি ‘ফেরেশতা’র মতো। দান-খয়রাত থেকে শুরু করে সবকিছুই করে গরিব আর সাধারণ মানুষের জন্য। জনপ্রতিনিধি হয়ে এলাকার উন্নয়নও করেন বাবা-ছেলে। কিন্তু পরিত্যক্ত জায়গা দেখলেই তা দখল করে নেন তারা। সেখানে সব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বহুতল ভবন তৈরি করেন।
অবশ্য হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ বহু পুরোনো। জনশ্রুতি আছে, তিনি ওই এলাকার কাউন্সিলর থাকাকালে পরিত্যক্ত ভবন দেখলেই তালা লাগিয়ে দিতেন। এরপর সেখানে নিজের নামে সাইনবোর্ড টানাতেন। এজন্য তখন তাকে অনেকে ‘তালা হাজী’ নামেও কটাক্ষ করতেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত ইরফানও বাবার পথেই হেঁটেছেন। দখলের ঐতিহ্য থেকে তিনিও বের হতে পারেননি।
স্থানীয় সূত্রগুলো অভিযোগ, মিটফোর্ড বেড়িবাঁধ এলাকায় সরকারি জায়গায় মদিনা ক্রোকারিজ দোতলা টিনশেড মার্কেট, নলগোলা এলাকায় বিহারিদের জায়গা জবরদখল করে মদিনা টাওয়ার, সোয়ারীঘাট এলাকায় বিআইডব্লিউটিএর জায়গা দখল করে মদিনা ট্যাঙ্কের শোরুম, কেল্লার মোড় বেড়িবাঁধ এলাকায় জায়গা দখল করে মদিনা ট্যাঙ্ক, রড-সিমেন্টের মার্কেট নির্মাণ, ওয়াইজঘাটের জি.এল পার্থ লেনে তৎকালীন তিব্বত হলের জায়গা দখল করে স্ত্রী গুলশানআরার নামে মার্কেট নির্মাণ করেছেন হাজী সেলিম। অবশ্য এসব দখলের অভিযোগ হাজী সেলিম বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাবার অসুস্থতার সুযোগে ইরফান নেতৃত্বে আসার পর গেল দুই বছরে মৌলভীবাজারে অগ্রণী ব্যাংকের পরিত্যক্ত গুদামঘরের ১০ কাঠা জায়গা, চকবাজারের প্রাচীনতম ভবন জাহাজ বিল্ডিং, লালবাগে ঢাকা সরকারি বধির হাই স্কুলের এক একর জমি দখল করে নেন। এসব জায়গা দখলে হাজী সেলিমের নাম এলেও নেপথ্যে কাজ করে ছেলে ইরফান বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া চকবাজারের বশির মার্কেটে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর দোকান লিখে নেওয়ার অভিযোগ আছে ইরফানের বিরুদ্ধে।
চলতি বছর ওই মার্কেটের জাহেদ রনি নামের এক ব্যবসায়ীর সাতটি দোকান ইরফানের লোকজন জোর করে দখলে নেয়। মঙ্গলবার জাহেদ রনি ঘটনাস্থলে বলেন, এক রাতে তাকে মদিনা আশিক টাওয়ারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। এমপি সাহেবের (হাজী সেলিম) ডেভেলপার ম্যানেজার সাইদুর রহমান তাকে জানান, বশির মার্কেটে থাকা তার দোকানগুলো ছাড়তে হবে। এগুলোতে কাউন্সিলর সাহেব মার্কেট করবেন। এর কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন তার দোকানগুলো নাকি কিনে নেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি মামলা করেন। এদিকে গত সোমবার র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতে ইরফান সেলিমের দ- হওয়ার পর অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের জায়গা দখলে নিয়েছে। মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে ব্যাংকের অন্তত ৩০ জন শ্রমিককে মাটি সরাতে দেখা যায়।
অগ্রণী ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখার ব্যবস্থাপক বৈষ্ণব দাস ম-ল জানান, জায়গাটি সরকারি সম্পত্তি। করোনার সময়ে নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যাংকের ভল্ট পাহারায় ছিল। ওই সময় কেউ পরিত্যক্ত ওই জায়গা দখলে নিয়ে ভবন নির্মাণের চেষ্টা করে। তবে এখন সরকারি সম্পত্তিটি ব্যাংকের দখলে রয়েছে।
এসব দখলের বিষয়ে হাজী সেলিমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করে । মঙ্গলবার দুপুরে এই প্রতিবেদক তার বাসায় যান। দেবীদাস ঘাট লেনের বাসভবনে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী মিজানুর রহমান সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেননি। তিনি জানান, এমপি সাহেব বাসায় নেই। ভেতরে কারও প্রবেশের অনুমতিও নেই। পরে সাংসদ হাজী সেলিমের মোবাইল ফোনে কয়েক দফা কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

দখলে সহায়তা করায় ‘উপহার’ :

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, চকবাজারের আশিক টাওয়ারের ইরফানের অফিসের টেবিলের ড্রয়ারে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে। তার মধ্যে একটি সাদা কাগজে ‘নোট’ ছিল। তাতে লেখা, ‘৭৮/১ মৌলভীবাজারে ভাঙার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য চকবাজার মডেল থানা আমাদের আন্তরিকভাবে সহায়তা করেছে। যার কারণে নিশ্চিন্তে এবং নির্বিঘেœ শামীম স্টোরের দখলে থাকা বিল্ডিংটি ভাঙা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং উক্ত কাজে আন্তরিকভাবে সহযোগিতার করার জন্য চকবাজার মডেল থানার ওসি মহোদয়কে উপহারস্বরূপ…।’ ওই নোটটির ওপরে তারিখ দেওয়া আছে ২৪/১০/২০২০। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। অনেক সময় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অনেকে প্রতারণা করেন। যদি কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে আসে তাহলে মামলা করব।’

টর্চার সেল :

র‌্যাবের অভিযানে চকবাজারের মদিনা আশিক টাওয়ারের ছাদে যে টর্চার সেল আবিস্কার হয়, সেটি দুই বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ওই টর্চার সেলে বিভিন্ন ভূমি মালিককে, পুরোনো ভবনের মালিকদের এবং পাওনাদারদের ধরে নিয়ে হুমকি এবং নির্যাতন করা হতো।
ওই ভবনটির আশপাশের লোকজন নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, মদিনা আশিক টাওয়ারের ছাদটি ছিল মূলত প্রমোদখানা। সেখানে ইরফান সেলিম ফূর্তি করতেন। প্রায় প্রতিরাতেই সেখানে চলত আতশবাজি। শব্দে স্থানীয়দের ঘুম হারাম হয়ে যেত। কারোরই কিছু বলার ছিল না।
সূত্র জানায়, মদিনা আশিক টাওয়ারের ছাদে ব্যবসায়িক বা পারিবারিক সম্পত্তি বৃদ্ধির জন্য টর্চার সেল তৈরি করা হলেও ২৫ নং দেবীদাস ঘাট লেনে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ছিল রাজনৈতিক টর্চার সেল। এলাকার নানা অপরাধ, বিভিন্ন ঝামেলা দূর করা হতো সেখানে। বিচারের নামে লোকজনকে ধরে নির্যাতন চালানো হতো ওই অফিসে।

স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক কাটেনি :

মঙ্গলবার দেবীদাস ঘাট লেনে ইরফান সেলিমের আলিশান ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ীতে’ ছিল সুনসান নীরবতা। বাড়িটির চারপাশসহ ছাদে নিরাপত্তাকর্মীরা থাকলেও শুধু মূল ফটকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে দেখা গেছে।ওই এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, ইরফান সেলিমকে গ্রেপ্তারের পর তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। অনেকে কল্পনাও করতে পারেননি, ইরফান গ্রেপ্তার হতে পারেন। তবে তাদের আতঙ্ক কাটেনি। ফলে বিভিন্নজন ইরফান সেলিমের অপকর্মের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরলেও কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।
উল্লেখ্য, ২৫ অক্টোবর রাতে ধানমন্ডিতে ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ‘সংসদ সদস্য’ লেখা সরকারি গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করা হয়। পরদিন এ ঘটনায় ইরফানসহ আরও চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২-৩ জনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়। সোমবার পুরান ঢাকায় হাজী সেলিমের বাসায় দিনভর অভিযান চালায় র‌্যাব। ইরফানকে দেড় বছর ও তার দেহরক্ষীকে এক বছর কারাদ- দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

LEAVE A REPLY