‘দল করতে টাকা লাগে’, দেশপ্রেম বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা লাগে না

37

“রাজনীতিতে এখন আর আদর্শবাদিতা বলে কিছু নেই। এটা কিছু লোকের অর্থ রোজগারের একটা জায়গা। আর কিছু ভালো ছেলেমেয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে এই রাজনীতি করতে গিয়ে হয় বাবুর মতো আত্মহত্যা করবে, না হয় তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। তাই বাবুর মৃত্যু একটি বদ্ধ পুকুরের পানিতে সাধারণ বাতাসে যে ঢেউটুকু ওঠে, সে ঢেউটুকু ওঠেনি সমাজে”

স্বদেশ রায়
সাতক্ষীরার ছাত্রলীগ নেতা ওবায়দুর রহমান বাবু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার ফেসবুকের স্ট্যাটাস থেকে ‘দল করতে টাকা লাগে’ অংশটুকু নিয়ে এই লেখার শিরোনামে ব্যবহার করেছি। বাবুর স্ট্যাটাসটি ছিল, ‘আমি এই শুক্রবার সুইসাইড করব। আর কিছু দেয়ার নেই আমার জীবন ছাড়া। দল করতে টাকা লাগে, কারণ এখন সে কোন দলের, সেটা বড় কথা না, টাকা কে বেশি দিচ্ছে, কমিটি সে পাবে।’ এরপর বাবুর সর্বশেষ স্ট্যাটাস ছিল, ‘এখন টাকার রাজনীতি হয়, আমার নেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি এখন নেই।’
গোটা দেশ যে সময়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে, তখনই ছাত্রলীগের নেতা দলের প্রতি হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করার আগে ফেসবুকে দুটো স্ট্যাটাস দিয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির আদর্শের দলটিকে চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। বাবু তার জীবন দিয়ে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু আসলে যাদের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো দরকার, তাদের কানে কি বাবুর এই আত্মহত্যা দিয়ে প্রকাশ করা সত্য পৌঁছেছে? শুধু তাদের কানে নয়, বাবুর এ মৃত্যু তেমন কোনো আলোড়ন তুলেছে কি সাধারণ মানুষের মধ্যে? বাবুর মৃত্যুর পরে প্রায় এক সপ্তাহ হতে যাচ্ছে, না কোথাও কোনো আলোড়ন লক্ষ করিনি। যে দলের উদ্দেশে বাবু এ কথা বলেছে, সে দলের ভেতর বাবুর এ মৃত্যু চৈত্র মাসে রাস্তার পাশের গাছটি থেকে একটি শুকনো পাতা ঝরে পড়লে যে শব্দটুকু তোলে, সে শব্দও তুলতে পারেনি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভেতরও তোলেনি বদ্ধপুকুরে সাধারণ বাতাসে যে ঢেউটুকু হয়, সে টেউও। কেন, এমনটি?
দলের ভেতর বাবুর মৃত্যু শুকনো পাতার ঝরে পড়ার শব্দটুকু তুলতে পারেনি তার একমাত্র কারণও কিন্তু বাবু বলে গেছে। ‘আমার নেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি’ এখন নেই। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অন্যতম দিক ছিল তাঁর দলের কর্মীর প্রতি ভালোবাসা। নিজ দলের কর্মীকে বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনের থেকেও মনে হয় বেশি ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু কর্মীদের কত ছোটখাটো বিষয়ে খেয়াল রাখতেন, তার একটি ছোট্ট ঘটনা এমনই- যা আমির হোসেন আমু তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন। একবার বরিশালে গেছেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে দলের কাজে তাঁকে স্পিডবোটে কীর্তনখোলা নদীপথে যেতে হচ্ছে। ওই স্পিডবোটে ড. কামাল হোসেনও ছিলেন। নদীর ঢেউ দেখেই ড. কামাল হোসেনকে তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কামাল, সাঁতার জানিস না বলে ভয় পাস না। কোনো অসুবিধা হলে আমি ও আমু তোকে দুই পায়ে করে ও চুল ধরে সাঁতরে নদীর কূলে নিয়ে যাব। আমুর শরীরেও শক্তি আছে আমার শরীরেও শক্তি আছে। তুই নির্ভয়ে থাক। আর এখন বাস্তবতা হলো বাবুর মতো কর্মী যদি তার নেতার সঙ্গে অমন স্পিডবোটে থাকত আর সে যদি সাঁতার না জানত, তাহলে হয়তো তার নেতা ওই সময়েই বলত, ‘বাবু, স্পিডবোট ডুবে গেলে তোকে বাঁচাতে পারি, তবে আগে বল সে জন্য কত লাখ টাকা দিবি?’ এই হৃদয়হীনতা, এই টাকার লোভ দলের নেতাদের চারপাশে এত শক্ত দেয়াল তুলেছে যে সেখানে বাবুর জীবন দেয়ার আর্তনাদ কেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও আদর্শ প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে না।
সাতক্ষীরার বাবু হয়তো দলের অবস্থা দেখে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু অনেক বাবু নীরবে দল থেকে বিদায় নিয়েছে। অনেক বাবু দলের জন্য ধুঁকে ধুঁকে অকালে মারা যাচ্ছে। আবার অনেকে চুপচাপ বসে আছে- রাজনীতির ওপর এক চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে। কারণ, ওই যে বাবু লিখে গেছে, ‘কে কোন দল করেছে সেটা বড় কথা নয়। কে বেশি টাকা দিচ্ছে সেই কমিটি পাবে।’ কমিটি পাবে অর্থাৎ দলে পদ পাবে। শুধু দলের কমিটি নয়, সবখানেই যে বেশি টাকা দিচ্ছে সেই সবকিছু পাচ্ছে। সব কিছু এখন টাকার দখলে। আর যারা দেশকে ভালোবেসে, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শকে ভালোবেসে রাজনীতি করে, তাদের পক্ষে তো ওইভাবে টাকা রোজগার সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ১২ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় কিন্তু মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ যা করেছিলেন, সে কাজ আওয়ামী লীগ করেনি। মাহাথির দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তার দলের কর্মীরা যাতে স্বচ্ছভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হতে পারে, তার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা করেছিলেন। যুবকর্মীরা যাতে ছোট ছোট শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারে, সে ব্যবস্থা করেছিলেন। যার ভেতর দিয়ে দেশে আরো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল এবং একটি আর্থিক স্বচ্ছতার ভেতর দিয়ে দেশ ও দল এগিয়ে চলতে পারে।
এর বদলে আওয়ামী লীগের এই ১২ বছরে দেখা গেছে দলীয় নেতারা একশ্রেণির লোক লাগিয়ে রিকশাস্ট্যান্ড থেকেও চাঁদা আদায় করেছে, পারলে আরো নিচে নামছে। যারা সৎ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আওয়ামী লীগ কর্মী, তারা ওই সব কাজে যেতে পারেনি। আর পারেনি বলে তারা ক্রমেই দূরে সরে গেছে নেতাদের থেকে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির স্থানীয় কর্মীরা যখন বুঝতে পেরেছে আপাতত তাদের দলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তখন তারা ধীরে ধীরে ভিড়তে শুরু করেছে ওই সব নেতার কাছে। শুধু রিকশা স্ট্যান্ড থেকে নয়, নানান ফন্দি করে ওই জামায়াত-বিএনপির কর্মীরা নব্য আওয়ামী লীগ কর্মী হয়ে চাঁদাবাজি শুরু করে। আর নেতাও বসে বসে অর্থ পান দিন শেষে। তখন এই সব দুধাল গাভির মতো নব্য আওয়ামীলীগ নামধারী কর্মীরাই প্রিয় হয়ে ওঠে নেতাদের কাছে। তারা আওয়ামী লীগের আদর্শবাদী কর্মীদের দেখলে বরং বিরক্তই হয়। যেমন জিয়া পরিষদ করতেন এক ব্যাংক কর্মকর্তা, তার চাকরির শেষ দিন অবধি ওই সরকারি ব্যাংকের সরকারি দলের নিয়োগ দেয়া বোর্ডের কাছে খুবই প্রিয় ছিলেন। কারণ, যারা বঙ্গবন্ধু পরিষদ করত ওরা কেবল মিছিল মিটিং করত। আর তিনি দিতে পারতেন টাকার জোগান। এখন অবশ্য জিয়া পরিষদের প্রায় সবাই কোথাও না কোথাও সরকারি দলে ঢুকে গেছে।
আর যখনই কোনো আদর্শহীনতা আসে, যখনই কোনো কিছু একবার নিচের দিকে নামতে শুরু করে, তখন সে কেবলই নিচে নামতে থাকে। এই অবৈধ অর্থ নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত কয়েক বছর ধরে এটা এসে ঠেকেছে নিজ দলের কমিটি গঠনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল দল থেকে সব অঙ্গসংগঠনের একটি ওয়ার্ড কমিটি বা গ্রাম কমিটিতে স্থান পেতে হলেও তার জন্য টাকার প্রয়োজন দেখা যায়। সেখানে নিলামে ডাকার মতো হয়। যে বেশি অর্থ দিতে পারবে, সেই নেতা হবে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে শেষ অবধি অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি ভেঙে দিতে হয়, প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে সরিয়ে দিতে হয় শেখ হাসিনার নিজ উদ্যোগে। কিন্তু তারপরও যে অর্থ লোলুপতার সে পাগলা ঘোড়া থেকে দল মুক্তি পায়নি, তার প্রমাণ দিয়ে গেল সাতক্ষীরার ছাত্রলীগ নেতা বাবু আত্মহত্যা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এতে দলে কোনো ঝড় তো দূরে থাকুক শব্দও উঠল না। এর থেকে প্রমাণিত হয়, অবৈধ অর্থ ও সহজ অর্থ দলকে অন্ধ ও বধির করে ফেলেছে। এই অন্ধ ও বধির দল নিয়ে কত দূর যাওয়া যাবে শেষ অবধি!
অন্ধ ও বধির দল নিয়ে কত দূর যাওয়া যাবে, সে প্রশ্নে যাবার আগে দেখতে হয়, বাবুর এ আত্মহত্যা কেন স্বাভাবিক একটি খবর হলো? কেন এ নিয়ে সমাজে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না? এর মূল কারণ মানুষ এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতি থেকে। মানুষ ধরেই নিয়েছে রাজনীতিতে এগুলো স্বাভাবিক। অর্থাৎ রাজনীতিতে এখন আর আদর্শবাদিতা বলে কিছু নেই। এটা কিছু লোকের অর্থ রোজগারের একটা জায়গা। আর কিছু ভালো ছেলেমেয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে এই রাজনীতি করতে গিয়ে হয় বাবুর মতো আত্মহত্যা করবে, না হয় তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। তাই বাবুর মৃত্যু একটি বদ্ধ পুকুরের পানিতে সাধারণ বাতাসে যে ঢেউটুকু ওঠে, সে ঢেউটুকু ওঠেনি সমাজে। কারো মুখে একবারও একটা হাহুতাশ দেখা যায়নি, যে ছেলেটি মারা গেল এভাবে! কেবল একটি পরিবার থেকে একটি শিক্ষিত ছেলে ঝরে গেল। কষ্ট ও ক্ষতি শুধু ওই পরিবারেরই হলো। আর পাশের পরিবারটি এসব দেখে শিক্ষা নিল, তার ছেলে যেন রাজনীতি না করে। এভাবেই শিক্ষিত ছেলেরা ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। যে কারণে এখন কোনো মহল্লা থেকে ছাত্রলীগের কোনো মিছিল বের হলে প্রশ্ন ওঠে, এরা সবাই কি ছাত্র? আগামী দিনে এ প্রশ্ন আরো উঠবে।
শুধু ছাত্রদের ক্ষেত্রে নয়, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তির জায়গায়ও কিন্তু একই ঘটনা ঘটছে। দলে দুর্বৃত্তরা, টাকাওয়ালারা চলে আসায় তারা এখন তাদের অনুগত বুদ্ধিবৃত্তির লোক খুঁজছে। তারাই প্রাধান্য পাচ্ছে সবখানে। চাটুকারিতাই যাদের মূল যোগ্যতা। যার ফলে রাজনীতি ঘিরে যে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ছিল, সেটাও ধীরে ধীরে নষ্ট হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। এই অধোগতি নিয়ে কারো যে কোনো মাথাব্যথা নেই, তা বাবুর আত্মহত্যার পরও কোনোরূপ শব্দ না হওয়া বলে দেয়। এর অর্থ দাঁড়ায় যে রাজনীতির দায় ছিল সমাজকে সতেজ করা, সজীব করা- সেই রাজনীতি এখন সমাজকে একটি মৃত সমাজে পরিণত হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দেশ যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন তার দল ও রাজনীতি ধীরে ধীরে এই অধোগতির পথে পা বাড়াচ্ছে। আত্মহত্যা করছে বাবুরা। তাই এখনই যদি রাজনীতি ও সমাজকে সুস্থ পথে না আনা হয়, তাহলে শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরে আসা হবে না; সরে আসা হবে যে আদর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধু এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেখান থেকে। একটি সৎ চিন্তার অগ্রসর সমাজ তিনি গড়তে চেয়েছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে। অথচ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে এসে বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর দলই আজ রুগ্ন । এমনকি এখন বঙ্গবন্ধুর দল করতে শুধু টাকা লাগে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা লাগে না। লাগে না বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিজ জীবনে ধারণ করা।
লেখক : সম্পাদক, সারাক্ষণ; সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here