হেফাজতে ইসলাম : জামায়াতের আরেক রাজনীতি

0
9

মারুফ রসূল
বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি। সংগঠনটি যে সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সারা বাংলাদেশের চোখ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দিকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর পরিমার্জন, নানা মাত্রিক সংশোধন ও যুগোপযোগী করার কাজ চলছিল তখন। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা।
যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলাম এবং তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাদের তৎকালীন বক্তব্য-বিবৃতি এবং রাজপথে সহিংসতার খবর কারোরই অজানা নয়। ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করা বা বিচার প্রক্রিয়ায় নানাবিধ বাধা সৃষ্টির জন্য তখন হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলাম। সঙ্গে তাদের জোটভুক্ত সংগঠন বিএনপি তো ছিলই।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে হেফাজতে ইসলাম যতগুলো দাবি-দাওয়া বা সংঘাতপূর্ণ ঘটনার জন্ম দিয়েছে, তার ফসল কোনো-না-কোনোভাবে জামায়াতে ইসলামের ঘরেই উঠেছে। জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসই হলো ধর্মকে রাজনীতির একটি ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা। এই ফায়দা হাসিলের জন্য তারা কখনো স্বনামে আবার কখনো বিভিন্ন ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলের ব্যানারে রাজপথে সন্ত্রাস চালায়। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিসহ ছয়দফা দাবি নিয়ে যখন শাহাবাগ আন্দোলন শুরু হয়, তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলাম। কারণ, শাহাবাগ আন্দোলনের ছয়দফা দাবির মধ্যে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত্বের দাবিও ছিল। তখনই আমরা দেখতে পাই রাজনীতির মাঠে হেফাজতে ইসলামের জঙ্গি আবির্ভাব। তথাকথিত ‘ধর্মানুভূতির’ ধোঁয়া তুলে তারা শাহাবাগের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক স্লোগান দেওয়া থেকে শুরু করে ব্লগার-লেখকদের হত্যার হুমকি দেওয়া শুরু করে। এরপর সারাদেশে আমরা শাহাবাগ আন্দোলনের ২৩ জন সহযোদ্ধাকে হারাই। অনেকে এই মৌলবাদী অপগোষ্ঠীর হামলার শিকার হন। ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন, আরিফ রায়হান দীপ, জগজ্যোতি তালুকদার, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয়, ফয়সল আরেফীন দীপনসহ অনেক সহযোদ্ধাদের হারায় শাহাবাগ। প্রতিটি হত্যাকা-ের পিছনে হেফাজতে ইসলামের উস্কানি ও উল্লাস তৎকালীন গণমাধ্যমের পাতা উল্টালে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের চোখে পড়ে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক একটি সংগঠন হলেও, কওমী মাদ্রাসার সঙ্গে এর চরিত্রগত সম্পর্ক সামান্যই। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনটি যে নারকীয় তা-ব চালিয়েছিল, তার সঙ্গে কওমী মাদ্রাসাগুলো থেকে শিক্ষা লাভ করা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণের সম্পর্ক কতটুকু বা আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, সেটা তারাই ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবেন। তবে আদর্শগতভাবে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামের সখ্য ছিল না কোনোদিন; বরং যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন হওয়ায় একটি দূরত্বই ছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম এবং তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বহুকাল ধরেই কওমী মাদ্রাসাগুলোকে দখল নেবার একটি অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এই দখল প্রতিহত করতে একাধিকবার জামাত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এই কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে, অতীতের কতগুলো ঘটনার অনুসন্ধান করলে। তৎকালীন গণমাধ্যমে এই সংবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন- ১৯৮৫ সালে ছাত্রশিবির কওমী অঙ্গনের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় আক্রমণ করে মাদ্রাসাটি দখল করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটে। এই সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তৎকালীন মুহতামিম আহমদ শফী ১০ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে। এই ঘটনার জের ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবির মাদ্রাসায় হামলা করে এবং সংঘর্ষে ১০-১৫ জন আহত হয়।
তখনও হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জামাত-শিবিরের সঙ্গে আদর্শ ও চরিত্রগত দূরত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তাদের সংগঠনের চরিত্র ও আদর্শ জামায়াতে ইসলামীর পথ ধরেই এগোতে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা যা কিছু দাবি উত্থাপন করেছে, তার প্রায় সবকটির বিষয়েই এক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর কঠোর অবস্থানের কথা আমরা জানি। যেমন, ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতির আদলে নতুন নারী উন্নয়ন নীতির খসড়া যখন ২০১১ সালের ৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন হয়; তখন (০১ এপ্রিল ২০১১) চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মোড়ে শাহী মসজিদের সামনে নারীর বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করে রাস্তায় সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম। গাড়ি ভাংচুর থেকে শুরু করে পুলিশের ওপরও আক্রমণ করে হেফাজতে ইসলাম। ঢাকায় তখন এর প্রতিবাদে ছিল ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ফজলুল হক আমিনী। এর প্রতিফলন পরবর্তীতে হেফাজতে ইসলামীর মধ্যযুগীয় বর্বর ১৩-দফাতেও আমরা পাই। সুতরাং হেফাজতে ইসলাম কার পিঠ চুলকানোর জন্য বা কাদের পিঠ বাঁচানোর জন্য রাজনীতির মাঠে এসেছে, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
তিন
চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফী মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পূর্ব থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে আমরা জানি। যেভাবে আহমদ শফীকে বন্দি করে চিকিৎসার আওতার বাইরে রেখে হেফাজতের বাবুনগরী-অনুসারীরা ক্ষমতা কূক্ষিগত করেছে, তা নজিরবিহীন। এমনকি আহমদ শফীর জানাজার ভিডিওতে আমরা তার শব বহনকারী খাটিয়া ঘিরে থাকা জামাত-শিবিরের নেতাদের উপস্থিতিও দেখেছি। জামায়াতের আমীর ও সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী, সাবেক শিবির নেতা ও এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, শিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আইয়ুবি, শিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুল আলিমসহ ৩০-৪০ জন আহমদ শফীর শব ঘিরে রেখেছিল সেদিন, যাদের সিংহভাগই জামাত-শিবিরের সদস্য। এ নিয়ে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখতে পেয়েছি। তখন অনেকেই এই অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন যে, মাওলানা মামুনুল হকের যোগসাজশেই জামাত-শিবিরের সঙ্গে হেফাজতের সেতুবন্ধন রচনার চেষ্টা চলছে।
গত কয়েকদিন ধরেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হেফাজতের মহাসচিব বাবুনগরীর সাম্প্রদায়িক ও হিংসাত্মক বক্তব্যগুলো পড়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাবুনগরীর বয়ানে জামায়াতে ইসলাম কীভাবে তার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছে। প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যে ভাষায় বাবুনগরী হিংসাত্মক বক্তব্য দিয়েছে এবং তাদের জীবননাশের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে; তাতেই স্পষ্ট এই বক্তব্যের খসড়া কাদের লেখা। কারণ, এই বাবুনগরীই ২০১৩ সালে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছিল যে, তাদের নেতৃত্ব মূলত জামায়াতে ইসলামের হাতে (সূত্র : বাবুনগরী কাঁদছেন, দুষছেন জামায়াতকে, প্রথম আলো, ০৮ মে ২০১৩)।
হেফাজতে ইসলামের কাউন্সিলকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল। প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দকে বাবুনগরীর হুমকি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস এবং ১২ নভেম্বর রাজধানীতে ১০টি বাসে আগুন ধরিয়ে সেই আগুন-সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তির কারণে এই আলোচনাগুলো সতর্কতার সঙ্গে সরকারের আমলে নেয়া জরুরি। বাবুনগরীর নেতৃত্বে যে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিল বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের অনেকেই জামাত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতের নেতা-কর্মীরা প্রায়ই বক্তব্য বিবৃতিতে জানান দেয় যে, তারা ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন। কিন্তু গোমড় ফাঁস হয়ে যায়, যখন কাউন্সিলকে সামনে রেখে মহাসচিব হিসেবে নাম আসে মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর। এই কাসেমীর পরিচয় আমরা জানি। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমীকে যখন কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তখন নাটাই কাদের হাতে সেটা বুঝতে বাকি থাকে না।
গত দোসরা নভেম্বর ফরাসি দূতাবাস অভিমুখে মিছিলের কর্মসূচি দেয় হেফাজতে ইসলাম। বাংলাদেশে ফ্রান্সের দূতাবাস বন্ধ করা, ফরাসি পণ্য বর্জন এবং সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করার দাবি নিয়ে দূতাবাস অভিমুখে যাত্রাকারী ওই মিছিলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদেরও দেখা গেছে। এতে হেফাজতের নেতাদের পেছনে একটি মিছিলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ছেলে জামায়াত নেতা শামীম হোসাইন সাঈদীকে দেখা যায়।
হেফাজতের ফরাসি দূতাবাস অভিমুখে যাত্রার দিন যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ছেলে জামায়াত নেতা শামীম হোসাইন সাঈদী। (দ্বিতীয় সারিতে প্রথমসারির গ্লাভস পরা হেফাজত নেতার ঠিক পেছনেই।)
হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল রাজনীতিতে জামায়াতের শূন্যস্থান পূরণের জন্য। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াতে ইসলাম যে সংকটে পড়েছিল, তা থেকে তাদের উদ্ধারের জন্যই গঠিত হয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। সাংগঠনিক ব্যয়নির্বাহ, মৌলবাদের তাঁবেদারি ও ধর্মকে উগ্রপন্থার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রগতিশীল মানুষ হত্যার যে নীলনকশা হেফাজতে ইসলাম কায়েম করেছে, তার রাজনৈতিক কায়দা ও ভাষা সবই জামায়াতে ইসলামের তৈরি। অথচ এক সময়ে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এই যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলাম ও ছাত্রশিবিরকে প্রতিহত করেছিল।
জামাতের মদদে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল জামায়াতে ইসলামকেই রাজনৈতিকভাবে উদ্ধারের জন্য। কওমী মাদ্রাসার স্বার্থ রক্ষা যে তাদের ফাঁকাবুলি ছাড়া কিছুই না, তা তো আহমদ শফীর অসুস্থ থাকার দিনগুলোতেই স্পষ্ট হয়েছে। তার মৃত্যুর পর বাবুনগরী এখন দিগম্বর হয়ে জামাতি কায়দায় প্রাণনাশের হুমকি ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার অসংখ্য শিক্ষার্থীর কোনো উপকার এতে নিহিত নেই।
লেখক : গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী।

LEAVE A REPLY