নেপালের সঙ্গে জয় : ফুটবলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

0
7

“করোনার মধ্যেও আবার ফুটবল মাঠে নামানোর যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, বাফুফে তাতে জিতেছে। মাত্র ২৫ দিনের অনুশীলনে ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পাওয়ার সুকঠিন চ্যালেঞ্জে জিতেছেন ফুটবলাররা। ফিটনেসে এগিয়ে থাকার সুবাদেই হারানো গেছে নেপাল দলকে”

পবিত্র কুন্ডু
করোনার মধ্যেও আবার ফুটবল মাঠে নামানোর যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, বাফুফে তাতে জিতেছে। মাত্র ২৫ দিনের অনুশীলনে ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পাওয়ার সুকঠিন চ্যালেঞ্জে জিতেছেন ফুটবলাররা। ফিটনেসে এগিয়ে থাকার সুবাদেই হারানো গেছে নেপাল দলকে
পেছন থেকে বাড়ানো বলটি পেয়ে মাহবুবুর রহমান সুফিল চিতার ক্ষিপ্রতায় দৌড়ে গেলেন বক্সে। দেহের দোলায় ছিটকে ফেললেন গায়ে গায়ে লেগে থাকা ডিফেন্ডারকে। তারপর গোলকিপারকেও ডজ দিয়ে দূরের পোস্টে ঠেললেন বল। বাংলাদেশ এগিয়ে গেল ২-০ গোলে। খেলার তখন ৮১ মিনিট। নেপালের আর ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় ছিল না। আগাম জয়ের সৌরভে তখন গ্যালারি উন্মাতাল। করোনাভীতি দূরে ঠেলে এই জয়ের আশাতেই তো ছুটে যাওয়া স্টেডিয়ামে। কত দিন… কত দিন নেপালের বিপক্ষে এমন জয়ের স্বাদ পাওয়া যায়নি!
আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু প্রীতির চিহ্ন ম্যাচটির শরীরে কোথাও ছিল না। সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিল প্রতিশোধ নেয়ার আকাক্সক্ষা। সেই আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়েছে। ১৩ নভেম্বরের পর ১৭ নভেম্বর ছিল দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচ। সেটিতে নেপালকে হারানো যায়নি বটে, তবে নেপালও বাংলাদেশের জালে কোনো গোল দিতে পারেনি। মোট কথা, বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের জোড়া প্রীতি ম্যাচ বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ছিল আনন্দ সংবাদ।
২০১৮ সাফ ফুটবলে নেপাল এই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামেই ২-০ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক বাংলাদেশকে যেতে দেয়নি সাফ ফুটবলের সেমিফাইনালে। বুকের মধ্যে সেই ব্যথাটা চিন চিন করছিল। সেই ব্যথাটার একটু উপশম তো হলো। সর্বশেষ ২০১৫ সালে এই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেই নেপালকে বাংলাদেশ হারিয়েছিল ১-০ গোলে। সেটিও ছিল প্রীতি ম্যাচ। তারপর আর কখনো হারানো যায়নি হিমালয়ের দেশটিকে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ওরা আমাদের ১৭ ধাপ পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। ওরা ১৭০, আমরা ১৮৭।
এই জোড়া প্রীতি ম্যাচ দুই দিক দিয়ে বাংলাদেশকে দিয়েছে স্বস্তি। এক, করোনাভাইরাসের মধ্যেও ফুটবল ফেরানো গেছে ঘরের মাঠে। দুই, একেবারেই নিম্নমুখী ফিফা র‌্যাঙ্কিংকে ওপরের দিকে টেনে তোলার একটা প্রক্রিয়া শুরু করা গেছে। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন আবার বাফুফেতে নির্বাচনে জেতার আগে ইশতেহারে এই র‌্যাঙ্কিং বাড়ানোকেই গুরুত্ব দিয়েছেন সবিশেষ। না, স্বস্তি আছে আরেকটি দিক দিয়েও এবং শেষ বিচারে সেটিই বড় হয়ে উঠছে।
নেপালের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ ঠিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বাফুফেকে অনুরোধ করে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের বাকি ম্যাচটি কাতারে গিয়ে খেলে আসতে। তারপর তারা অনুমতি নিয়েছে ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের। কাতার আগামী ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক। এশিয়ার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কাতার বেশ প্রভাবশালী দেশ, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। তা ছাড়া, নেপালের সঙ্গে দুটি প্রীতি ম্যাচ দলের জন্য সহায়ক হবে ভেবেই বাফুফে প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর হবে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে কাতারের সঙ্গে ফিরতি ম্যাচটি। গত বছর অক্টোবরে ঢাকায় এসে খেলে গেছে তাদের অ্যাওয়ে ম্যাচ। সে ম্যাচে বাংলাদেশ যথেষ্ট ভালো খেলেও হেরে যায় ২-০ গোলে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা প্রাপ্ত সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে স্কোরলাইনটা অন্য রকম হতে পারত।
শীত আসতেই ইউরোপে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইডিসিআর) বলছে বাংলাদেশেও আবার বাড়তে শুরু করেছে করোনা সংক্রমণ। এর মধ্যে ফুটবল মাঠে নামিয়ে বাফুফে সত্যিই সাহসের পরিচয় দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় আর কোনো দেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল দূরে থাক, ঘরোয়া ফুটবলই মাঠে নামেনি।
ইউরোপে করোনা বিস্তৃতির জন্য ফুটবলকে একটা দায় এখনো বয়ে বেড়াতে হয়। ধারণা করা হয়, ইতালি, ইংল্যান্ড ও স্পেনে করোনাটা ছড়িয়েছে ফুটবলের মাঠ থেকেই। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, মিলানের সানসিরোয় ইতালির আতালান্তা ও স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ক্লাবের মধ্যে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ ম্যাচে দর্শক ছিল ৪৪ হাজারের বেশি। আর সেদিন গ্যালারিতে ছিলেন এমন এক করোনাক্রান্ত ব্যক্তি, যে পরবর্তীকালে চিহ্নিত হয়েছেন ‘সুপার স্প্রেডার’। ওই ম্যাচটির পর হাজার হাজার মানুষ করোনাক্রান্ত হতে থাকল। মিলানের উত্তরের লম্বার্ডি প্রদেশের বার্গামো (আতালান্তা যে শহরের ক্লাব) হয়ে উঠল করোনার এপিসেন্টার। আর যে হাজার দুয়েকের মতো সমর্থক এসেছিলেন স্পেন থেকে, তারাও স্পেনে ফিরে গেলেন করোনা নিয়ে। স্পেনেও ছড়াতে থাকল করোনা।
পরের মাসে লিভারপুলের সঙ্গে খেলতে ইংল্যান্ডে এল স্পেনের আরেক দল আতলেতিকো মাদ্রিদ। এটিও চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ। আজও ইংলিশদের অনেকেই মনে করে, ১২ মার্চের ওই ম্যাচ থেকেই লিভারপুল এবং ইংল্যান্ডের তৎসংলগ্ন অঞ্চলে করোনা ছড়িয়েছে। কারণ সেদিন অ্যানফিল্ডে ৬০ হাজারের বেশি দর্শকের মধ্যে থাকা আতলেতিকো মাদ্রিদের কয়েক হাজার সমর্থকের মধ্যে করোনা আক্রান্ত ছিলেন অনেকেই। এবং তাদের মাধ্যমেই বিস্তৃতি ঘটেছে করোনার।
ইউরোপের কোথাও এখনো ফুটবল মাঠে দর্শক অনুমোদন করছে না ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, উয়েফা। স্পেনের লা লিগা স্টেডিয়ামের এক-তৃতীয়াংশ দর্শক উপস্থিতির অনুমোদন চেয়েছিল। সেটি অনুমোদিত হয়নি। একই অবস্থা জার্মানি, ইতালি ও ইংল্যান্ডে। দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামেই চলছে ফুটবল। যদিও ইউরোপে ফুটবল ফিরেছে গত জুন মাসেই।
আর বাংলাদেশে বাংলাদেশ-নেপাল প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে ফুটবল মাঠে ফিরল গত মার্চ মাসে অসমাপ্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের পর। বাংলাদেশ সর্বশেষ ঘরের মাঠে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেছিল জানুয়ারি মাসে, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলে। তার ঠিক ১০ মাস পর আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখা। আর সেটি স্মরণীয় হলো দর্শক উপস্থিতিতেই।
বাফুফে টিকিট ছেড়েছিল আট হাজার। তবে বাফুফে কর্মকর্তাদেরই ধারণা, বিনা টিকিটেও হাজার দুয়েক দর্শক ঢুকে পড়েছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। কারণ, ফুটবল বুভুক্ষু দর্শককে নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়নি। নেপালের বিপক্ষে বহু কাক্সিক্ষত জয়ের আশায় উদ্বেল ছিল এই ফুটবল জনতা।
এই দুটি প্রীতি ম্যাচ করোনার বিস্তারে সহায়তাকারীর ভূমিকায় চিহ্নিত হবে কি না, সেটি বলবে ভবিষ্যৎ। তবে একটা কথা বলা যেতে পারে, বাফুফে তাদের পরিকল্পনায় সফল। করোনার মধ্যেও আবার ফুটবল মাঠে নামানোর যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, বাফুফে তাতে জিতেছে। মাত্র ২৫ দিনের অনুশীলনে ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পাওয়ার সুকঠিন চ্যালেঞ্জে জিতেছেন ফুটবলাররা। ফিটনেসে এগিয়ে থাকার সুবাদেই হারানো গেছে নেপাল দলকে। আর এই জয়ের উজ্জীবনী শক্তি নিয়েই এখন বাংলাদেশ যাচ্ছে কাতার অভিযানে।
ফিফা র‌্যাঙ্কিং ও মান বিবেচনায় অনেক এগিয়ে থাকা কাতারের সঙ্গে তাদের মাঠে গিয়ে জয়ের আশা করাটা দুঃসাহস। তবে বাংলাদেশ দলের মানসিক স্বস্তি এখন আছে। অন্তত এই কথাটা এখন বলতে পারছে, হারার আগে লড়াই ছাড়ব না। সেই আত্মবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছে নেপালের সঙ্গে জোড়া প্রীতি ম্যাচ। কাজী সালাউদ্দিন বলতে পারছেন, ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেল।
লেখক : সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক

LEAVE A REPLY