‘পুরুষ’ হওয়া খুব সহজ!

0
11

ফারজানা হুসাইন
ইন্টারন্যাশনাল মেনস ডে বলে যে একটা তারিখ আসলেই আছে তা আমার মোটামুটি জানা ছিল, কিন্তু সেই তারিখটা যে নভেম্বর মাসের ১৯তম দিন, তা জেনেছি গত বছর। আমি পাবলিক সার্ভিসে আছি, ২০১৯ সালে আমার কর্মস্থলে ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস ডে পালন করা হবে, এবং সেই উদযাপনকে কনসেপ্টুয়ালাইজড ও ওরগানাইজড করলাম আমি এবং আমাদের ছোট্ট একটি টিম। এই টিমে অফিসের বড়বাবু যেমন শামিল হলেন, তেমনি নারী সহকর্মীদের সঙ্গে শামিল হলো কয়েকজন পুরুষ সহকর্মীও। বেশ ঘটা করে নারী দিবস পালনের শেষে বেশ কিছু পুরুষ সহকর্মী খানিকটা মজা করেই হয়তো আমাকে জিজ্ঞেস করলো নারী দিবস তো হলো, পুরুষ দিবস বলে কি আদৌ কিছু আছে? নাকি কেবল নারীর ক্ষমতায়ন আর নারীর প্রতি সামাজিক, অর্থনৈতিক আর কর্মক্ষেত্রে করা বৈষম্যই আমাদের চোখে পড়ে?

তখনই ইন্টারনেট খুঁজে বের করলাম পুরুষ দিবস বলে আসলেই নভেম্বরের একটা দিন আছে।
আমি আইনের ছাত্র, আইনের শিক্ষকতা করেছি, অল্প-বিস্তর যে লেখালেখি করি, তা আইনঘনিষ্ঠ। সামাজিক ট্যাবু, বৈষম্য নিয়ে লিখি বলেই হয়তো গায়ে নারীবাদী তকমা লেগেছে। যদিও আমি তা মানতে নারাজ। আমি সব মানুষকে নিয়েই লিখি, অন্তত লিখতে চেষ্টা করি।
যাই হোক, এই কলামে আমি দ্ব্যথর্হীন কণ্ঠে সবাইকে বলে দেই আমি একেবারেই পুরুষবিদ্বেষী নই। বরং পুরুষদেরকে আমি ভালোইবাসি। আমার জীবনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বয়সী পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন রোল প্লে করেছেন। কেউ পিতা বা পিতৃস্থানীয় হয়ে স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েছেন, কেউ ভাই বা ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। বন্ধুরূপে কিছু পুরুষকে পেয়েছি যেন সাক্ষাৎ দেবদূত! কোনও কোনও প্রেমিক-পুরুষ হয়েও হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল হয়ে ফোনালাপ চালিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
মনে আছে বহু বছর আগে এমনই কোনও এক পুরুষ সম্পর্কে আমার বাবার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় আমার বাবা আমার কাছে জানতে চাইলেন ওই ভদ্রলোককে কেন আমার পছন্দ? কী বিশেষত্ব আছে তার?
সদ্য তরুণী সেই আমার ঝটপট উত্তর ছিল, সে খুব ভালো নিহারী রান্না করতে পারে। আর পৃথিবীর সব দেশ, রাজধানী ও মুদ্রার নাম মুখস্থ বলে দিতে পারে এক নিমেষে। আমার বাবা এই উত্তর শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল উচ্চারণ করেছিলেন, হুমম। আমার ধারণা তিনি তার মেয়ের নির্বুদ্ধিতায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন হয়তো।
আমাকে মুগ্ধ করতে সেই পুরুষকে তেমন কাঠখড় পোড়াতে হয়নি, আমি বরাবরই অতি অল্পে মুগ্ধ মানুষ। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই মুগ্ধতা কাটতেও বেশি সময় লাগেনি আমার। না, তিনি তেমন কিছুই হয়তো করেননি। তিনি কেবলই পুরুষ ছিলেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি কেবল দিনে দিনে আরও পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন।
কেমন করে পুরুষ হয়ে উঠতে হয়? পুরুষ হওয়া খুব সহজ। আমি কিংবা আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে এরকম অনেককেই পুরুষ হতে দেখি। পুরুষ তার বাহুবলে পুরুষ হয়ে ওঠে। কোনও কিছু তার মতের বিরুদ্ধে গেলেই রাস্তার মোড়ে, পাড়ায়, বাসে-ট্রেনে-বাড়িতে চিৎকার করে, হাতাহাতি, মারামারি করে নিজের পেশিশক্তি দেখিয়ে রোজ রোজ আমার, আপনার ভাই, বন্ধু, বাবা, স্বামী পুরুষ হয়ে ওঠে। পছন্দের মানুষটির উদ্দেশে ফুল ছুড়ে দেওয়া ছেলেটি, সারা জীবন মেয়েটিকে ভালো রাখা আর ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা করা ছেলেটি, প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসিড ছুড়ে দিয়ে, ইন্টারনেটে মেয়েটির অপ্রীতিকর ছবি ছড়িয়ে দিয়ে, পরিচিতজনের কাছে মেয়েটির নামে কুৎসা রটিয়ে পুরুষ হয়ে ওঠে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই অফিস থেকে ফিরে সোফায় পা তুলে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে আর বউয়ের বানানো বিকেলের চা-নাশতা খেতে খেতে স্বামীটি পুরুষ হয়ে ওঠে। রাস্তায় কোনও নারীকে একা পেয়ে ‘ওই ওড়না কই’ বলে কটাক্ষ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গভীর রাতে অশ্লীল বার্তা পাঠানো ছেলেটি একজন পুরুষ।
পুরুষ কী কেবল ছেলেরাই হয়? না, নারীও কখনও কখনও ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠে। পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার গৌরবে যখন কোনও মা নিজের কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্য করে তখন সেই মা হয়ে যায় পুরুষতান্ত্রিক নারী। এই পুরুষতান্ত্রিক নারী ছেলের বউকে যখন কটু কথা শোনায় তখন তার মাঝে সেই পুরুষেরই ছায়া দেখা যায়। নারী সহকর্মীর প্রমোশনে যখন আরেকজন নারী সহকর্মী কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করেন, তখন সেই নারীটিও পুরুষ হয়ে ওঠে।
এমনকি অনেক বাবা-মাকেও বলতে শুনেছি আমি আমার মেয়েকে মেয়ে হিসাবে নয় বরং ছেলে হিসেবে বড় করেছি। এর অর্থ হলো, পারিবারিক পরিমন্ডলে ওই বাবা-মা তাদের মেয়ে সন্তানকে ছেলে সন্তানের সমতুল্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বড় করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই সুবিধা হলো মেয়েটি ভালো কোনও স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে, প্রতিবেলার খাবার পাতে ভাইটির মতো সেও একটা ডিম, সন্ধ্যায় এক গ্লাস দুধ পেয়েছে। স্কুল-কলেজের বৈতরণী পার হতে না হতেই বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে দায়িত্ব না নামিয়ে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দিয়েছে। এবং এই সুযোগ-সুবিধাগুলো দিয়ে বাবা-মা গর্ব করে বলছে তারা তাদের মেয়েটিকে ছেলের মতো করে বড় করেছে।
তাদের প্রতি আমার বিনীতস্বরে প্রশ্ন, আপনার মেয়েটিকে ছেলের মতো করে নয় বরং আপনার সন্তানকে তা সে ছেলে কিংবা মেয়ে যেই হোক তাকে সন্তান হিসেবে বড় করার চেষ্টা একবার করবেন কি?
লেখার শুরুতেই বলেছি পুরুষ হওয়া খুবই সহজ। কেন বলেছি এবার একটু ব্যাখ্যা করি। পুরুষ মানেই যখন সব সুখ-সুবিধা ভোগ করার জন্মগত অধিকার, নিজেকে ফার্স্ট জেন্ডার আর অন্যকে সেকেন্ড জেন্ডার বিবেচনা করে নিচু করার অধিকার, তখন অধিকাংশই পুরুষ হতে চায়, পুরুষ হতেই চাইবে এতে আর দোষের কী?
ঘরে-বাইরে-আইনে-কর্মক্ষেত্রে-ধর্মীয় আচারে সমঅধিকারের দাবিতে নারীর যে শতকের পর শতক ধরে চলে আসা সংগ্রাম তাকে আমি কখনও ছোট করে দেখি না, প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের অধিকার আদায় করে নেওয়ার এই সংগ্রামকে ছোট করে দেখার অবকাশও নেই। কিন্তু এই সংগ্রাম নারী করতে পেরেছে কারণ সে জানে তার প্রতি যে আচরণ সমাজ করছে তা বৈষম্যমূলক। নারীর অধিকারের প্রশ্নে বিশেষত পারিবারিক আর সম্পত্তির বিষয়ে আইনও অনেক সময় একচোখা। অধিকারহীন মানুষ তার প্রাপ্য চাইবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে জন্মসূত্রে কেবল একটি ওয়াই ক্রোমোজোমের মালিক হয়ে জন্মানো মানবসন্তান যখন বিনা প্রচেষ্টায় সব পেয়ে যায়, সেই ‘সব পেয়েছি’র দেশ থেকে বেরোতে হলে তাকে এমনি এমনি পাওয়া সবকিছুকে স্বত্ব ত্যাগ করতে হয়।
‘কেবল পুরুষ আমি, তা বলেই আমি অন্যের চেয়ে শ্রেয় নই। কেবল পুরুষ আমি, তা বলেই ঘর-সংসারের দায়িত্ব কেবল আমার স্ত্রীর নয়। কেবল পুরুষ আমি, তা বলেই উত্তরাধিকার সূত্রে আমার বোনের চেয়ে দুই গুণ বেশি সম্পত্তি আমি ভোগ করতে রাজি নই। কেবল পুরুষ বলেই, সমাজের বলে দেওয়া নিয়ম মেনে আমি অশ্রু লুকিয়ে লৌহমানব হয়ে উঠতে রাজি নই। কেবল পুরুষ বলেই হৃদয়ের সকল ক্ষত, সকল হাহাকার লুকিয়ে রাখতে না পেরে আত্মহত্যা করতে আমি রাজি নই। আমি লৌহমানব বলেই, সংবেদনশীল কাউকে মেয়েলি পুরুষ বলে তিরস্কার করতে আমি রাজি নই।
কারণ, আমি কেবল পুরুষ নই, আমি একটু একটু করে হৃদয় দিয়ে, মানবিকতাবোধ দিয়ে, মেধায়-মননে, চিন্তা আর চেতনায় পরিবর্তন এনে, বুড়ো সমাজ আর তার প্রাচীনপন্থী ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি মানুষ হয়ে উঠছি।’
কোনও পুরুষ যখন সমাজ, পরিবার আর আইনের দিক থেকে পাওয়া পক্ষপাতদুষ্ট সুযোগ-সুবিধা ভোগ না করে বরং অযাচিত প্রাপ্যকে পায়ে ঠেলে দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে, তখন সেই মানুষের প্রতি মুগ্ধতা সহজে কাটে না। সেই মুগ্ধতা হয় চিরস্থায়ী।
তাই, পুরুষ হওয়া খুব সহজ, কিন্তু মানবিক ‘মানুষ’ হওয়া কঠিন। আমাদের পরিচিত যে পুরুষগুলো বা পুরুষতান্ত্রিক নারীগুলো একটু একটু করে মানুষ হয়ে উঠছে, সামান্য দেরিতে হলেও তাদেরকে পুরুষ দিবসের শুভেচ্ছা। তোমরা আছো বলেই এখনও আমরা ‘মানুষে’ বিশ্বাস করি।
লেখক : আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট

LEAVE A REPLY