করোনা কালে সামাজিক দূরত্ব

35

এম আর খায়রুল উমাম
আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগের কথা। শহরের অনেকের প্রিয় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। তার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র দিতে গেলে দোতলা থেকে একটা বালতি নামিয়ে দেওয়া হতো এবং তাতে পত্রটি দিয়ে আসতে হতো। শহরে এটা আলোচনার বিষয় ছিল, নবীনরা সাধারণত এ দায়িত্বই নিতে চাইত না। স্নেহবৎসল অমায়িক মানুষটির বাড়ির এহেন ব্যবহারে অনেকে পীড়িত হলেও তাঁর সান্নিধ্য প্রাপ্তির প্রত্যাশায় কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আর এক কর্মচারী। চাকরি শেষে রাজনীতিতে যোগদান। যথারীতি জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিত্ব পেয়ে যান। আমাদের শীর্ষ সরকারী কর্মচারীরা সাধারণত জনণের সাথে বিশাল দূরত্ব রেখেই চলে। সাধারণত জনগণের সাহস হয়নি কোনদিন এদের স্পর্শ করে দেখে। কিন্তু জনগণের প্রতিনিধিরা তো মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে চলতে পারে না। চলতি পথে মানুষের হাতের সাথে হাত মেলাতেই হয়। এই জনপ্রতিনিধি তাই হাত মেলানোর সময় পকেটে থাকা ডেটল দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিতেন। ২৫/৩০ বছর আগে যা ছিল আলোচনার বিষয় আজ কিন্তু করনাকালে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে এটা অগ্রসরমান ব্যক্তির শিক্ষার ফসল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার ফসল।
১০০ বছর পরপর বিশ্বে মহামারীর তান্ডব দেখা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সোয়ান ফ্লু কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এখন করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে তান্ডব চালাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে মৃত্যুর মিছিল অতীতের মতো না হলেও মহামারীর প্রকোপকে দুর্বল ভাবার কোনো কারণ নেই। করোনা ভাইরাস প্রবল প্রতাপে সারা বিশ্বে তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তি পথ খোঁজে টিকা আবিষ্কারে যে যার মতো প্রচেষ্টারত। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলা, মাস্ক ব্যবহার, সময়-অসময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া চলমান। অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না আসা, যত্রতত্র কফ-থুথু না ফেলা, সবকিছুর যৌথ ব্যবহার পরিহার করা, সবচাইতে কঠিন বিষয় হাতকে নাক-মুখ-চোখের অস্তিত্ব ভুলিয়ে দেয়া। এসব ব্যবস্থা ও প্রতিরোধের মধ্যে সামাজিক মানুষকে অসামাজিক করার প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত হয়েছে। এমনকি ধর্মভীরু মানুষদের শেষ আশ্রয়স্থল উপাসনালয়গুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সামাজিকতার ন্যূনতম কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। অতীতে যেখানে ১/২ জন মানুষকে সমাজের উচ্চতর অবস্থানে থাকার পরও অসামাজিক মনে হতো সে অসামাজিকতা আজ করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী রূপ ধারণ করেছে। বৈষম্যহীন অসামাজিকতার এই প্রতিযোগিতায় দেশের মানুষ ৬ মাস পার করে দিয়েছে। মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে জীবন লন্ডভন্ড। জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে মানুষকে গৃহবন্দী করা হয়েছে। জীবন জীবিকার তাগিদ গৌণ হয়ে পড়েছে। অখন্ড অবসর। শুধু বায়োলজিক্যাল ও সোশাল রিলেশনগুলো রক্ষায় উভয়পক্ষের তাড়া। এতেই সময়ের বেশি কিছুটা খারাপ কাটে না। কিন্তু এ অবস্থা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হওয়ার কারণে সম্পর্কগুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে। এতে করে সামাজিক প্রতিরোধগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। শাসক শ্রেণী সাধারণ মানুষের এ দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে লোকসানের অজুহাতে ২৫ টা পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে এবং এখন আব্র নতুন করে চিনিকল বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করছে। একদিকে চলছে জীবন-জীবিকা রক্ষার নামে প্রণোদনার সহযোগিতা আর বিপরীতে হাজার হাজার শ্রমিকের মুখের অন্ন কেড়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা। অদূর ভবিষ্যতে চিনিকল বন্ধ করে দেয়া হবে তাতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। দেশে উৎপাদিত এককেজি চিনির মূল্য ৮৮ টাকা হলেও বাজারে ৬০ টাকায় বিক্রি করা যাচ্ছে না। বিদেশ থেকে চিনি আমদানি করে কয়েক দফা লাভের পর ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও দেশি চিনি অবিক্রিত থেকে যায়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা কারণ অনুসন্ধানে ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ এপর্যন্ত গ্রহণ করেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম নিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনে মন্থরগতি কারো সহ্য হচ্ছে না। চাহিবামাত্র হাঁসের পেট কেটে একবারে সব ডিমের মালিক হওয়ার প্রচেষ্টা। সে প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই লোকসানের অজুহাতে একটার পর একটা দেউটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। জনকল্যাণের নামে শাসক শ্রেণীর এ এক উত্তম প্রক্রিয়া। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অস্বীকার করা। সস্তা শ্রমের দেশে লোকসানের অজুহাত। এ অজুহাতের পেছনে আকাশ ছোঁয়া দুর্নীতিকে গুপ্ত রেখে লুপ্ত করার চাইতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাগ্য পরিবর্তনের চিত্র বিষয়টিকে স্পষ্ট করে।
কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদী মানববন্ধনের ছবি দেখলাম। এক রাজনৈতিক জোট রাষ্ট্রায়ত্ব ২৫ টা জুটমিল বন্ধ করায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ছবি দেখার পর মনে হলো একটা রাজনৈতিক জোট ২৫ জুটমিল বন্ধের প্রতিবাদে ২৫ জন মানুষকে অংশগ্রহণ করাতে পারেনি। মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের দূর্বলতা এর একমাত্র কারণ না হলেও বর্তমান সময়ে দাড়িয়ে অন্যতম প্রধান কারন বলাই যায়। শারীরিক দূরত্বকে সামাজিক দূরত্ব বলে আজ অনাহারী অনক্ষর মানুষদের পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। তাইতো আগামীতে জীবন জীবিকা অনিশ্চিত জেনেও মানুষ প্রতিবাদহীন থেকে যাচ্ছে। বিবেকী প্রতিবাদ পথ হারিয়ে ফেলেছে, কর্তব্য প্রদর্শনের প্রতিবাদ সর্বত্র। রাজনৈতিক আদর্শে বিভক্তি পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মানুষ সবকিছুর বিনিময়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজের পরিবার পরিজনদের আগামী অভিজাত জীবন গড়ায় নিয়োজিত। প্রতিবাদ সীমিত হয়ে পড়েছে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানের মধ্যে। মনের স্পন্দনহীন এ প্রতিবাদে শাসকরা নড়ে না। পাটকল বন্ধে নড়েনি, করোনায় স্বাস্থ্যসেবা নড়েনি। তেমনি চিনিকল বন্ধে নড়বে না। জনকল্যাণের নামে উন্নয়ন ও অগ্রগতির জয়যাত্রা চলছে এবং চলবে।
করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্থ দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা। রিক্সায় যাত্রী নেই, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের খরিদ্দার নেই, শ্রমবিক্রির হাটে মানুষ নেই, পরিবহন ও নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ নেই, হকার আর মুটেরা বেকার, গৃহকর্মী ছুটিতে। এই মানুষগুলো নিজেদের শ্রমে নিজ পরিবারের অন্ন সংস্থান করে থাকে। হাত পেতে সাহায্য সহজে গ্রহণ করতে চায় না। তাই এ মানুষগুলো সঞ্চয় বলতে যা কিছু ছিল তা শেষ করে ইতোমধ্যে স্থাবর সম্পদে হাত দিয়ে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞদের আশংকা আগামী শীতে করোনার প্রদুর্ভাব বৃদ্ধি পেতে পারে। আজকে বুভুক্ষু মানুষগুলোর জন্য শাসক শ্রেণীর সহায়তার যে বেহাল দশা তাতে আগামী শীতে কি কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হবে তা অনুমান করতে ভয় লাগে। দেশের সিংহভাগ মানুষ যখন মানবেতর থেকে মানবেতর জীবনের দিকে রকেটের গতিতে এগিয়ে চলেছে, জীবন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে তখনও আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, বাড়ছে মাথাপিছু আয়। উন্নয়ন ও অগ্রগতির জোয়ার সর্বব্যাপী।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে বিশ্ব আগামী কত দিনে মুক্তি পাবে জানা নেই। ভাইরাসের টিকা প্রাপ্তির আশ্বাসে অনেকে আশাবাদী হলেও গিনিপিগ হিসেবে পরীক্ষার জন্য আমরা যে অনেকের কাছ থেকে টিকা পাবো, তাতে সন্দেহ নেই। বলা যায় উন্নত বিশ্বের চাইতে অনেক আগেই ভাইরাসের টিকা আমরা পাবো। এতে করে সংশ্লিষ্ট অনেকে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে যাবে। কিন্তু আজ ২/৩ কোটি পরিবারের জীবন রক্ষা না করা হলে টিকার পরীক্ষা কাদের উপর করা হবে? এখনো পর্যন্ত সহায়তার প্রকৃত অবস্থা যা তাতে মানুষের জীবনদীপ নিভু নিভু। আগামী শীতে যদি করোনার প্রকোপ বাড়ে তাহলে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটা আপাতত চিন্তা করতে চাই না। তবে আজ সামাজিক দূরত্ব রক্ষা এবং মাস্ক পরার স্বাস্থ্যবিধি ভেঙ্গে মানুষ দলে দলে বের হয়ে পড়ছে কারণ করোনা ভাইরাসের চাইতে ক্ষুধার অন্নের চাহিদা বেশি। সাধারণ মানুষ সেই অন্নের সন্ধানে ছুটছে। কোনো শংকা, কোনো বিধিনিষেধ বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক,দৈনিক কল্যাণ,কলাম লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here