বড় অসময়ে চলে গেলেন মুনীর ভাই!

34

চিররঞ্জন সরকার
এমন একটা দুঃসংবাদের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। খবরটি শোনার পর সত্যিই স্তব্ধ হয়ে গেছি! মুনীর ভাইয়ের মতো এমন একজন চটপটে, প্রাণবন্ত মানুষ এভাবে অকালে চলে যাবেন, তা সত্যিই ভাবতে পারছি না!
মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় সেই ছাত্রজীবন থেকে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো। তখন তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। আমি যখন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক। তিনি দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন।
আশির দশকের শেষ দিকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’-এ মুনীর ভাইয়ের সরজমিন প্রতিবেদনগুলো তখন ঝড় তুলেছিল। সেই প্রতিবেদনগুলো ছিল অনন্য, অসাধারণ। সম্পাদক শফিক রেহমানের রাজনৈতিক ডিগবাজির পর মুনীর ভাই ‘যায় যায় দিন’ ছেড়ে দেন। এরপর তিনি সাপ্তাহিক চলতিপত্রে প্রতিবেদন ও কলাম লিখতেন। পরে তিনি দৈনিক সংবাদে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৯৯ সালে আমি সংবাদের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিলে মুনীর ভাইকে পাই সহকর্মী হিসেবে। তখনই প্রথম জানতে পারি তার পোশাকি নাম খন্দকার মুনীরুজ্জামান। মুনীরুজ্জামান নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। ছোটখাটো গড়নের এই মানুষটি ছিল তেজে ঠাসা। তিনি অত্যন্ত ক্ষুরধার সব কলাম লিখেতেন। সংবাদের আরেকজন সহকারী সম্পাদক মকবুলার রহমান (আমাদের সকলের প্রিয় মকবুল ভাই) মুনীর ভাইকে বলতেন ‘বিপ্লবী কমরেড’। সেই সময় কোনো বিষয়ের উপর যদি কড়া ভাষায় কিছু লিখতে হতো, তাহলে সংবাদের সম্পাদক বজলুর রহমান সেই দায়িত্ব দিতেন মুনীর ভাইকে। মুনীর ভাই খুব দ্রুত লিখতে পারতেন। একটা কলাম লিখতে তিনি বড়জোর আধাঘণ্টা সময় নিতেন। এত দ্রুত এত সুন্দর করে ধারালো রাজনৈতিক মন্তব্য বাংলাদেশে আর কেউ লিখতে পারে বলে আমার জানা নেই।
মুনীর ভাই আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। সারাক্ষণ একটা আড্ডার মেজাজে চলতেন। তবে তার বক্তব্যে সব সময়ই একটা ঝাঁঝ বা মেজাজ থাকত। তিনি প্রচলিত রাজনীতি, অবক্ষয়গ্রস্ত রাজনীতিবিদদের একজন কড়া সমালোচক ছিলেন। তার লেখাতেও এর প্রতিফলন ছিল। সাম্যবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে তিনি সব সময়ই উচ্চকিত ছিলেন। ভন্ডামি, কপটতা, স্বার্থপরতাকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। মুনীর ভাই বিরাজনীতিকরণকে অপছন্দ করতেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকা উচিত। তাদের যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক। সবার বরং চেষ্টা করা উচিত কীভাবে রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা যায়। তিনি বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজের ‘অনির্বাচিত সরকার গঠনের’ বিভিন্ন রকম অপতৎপতার কঠোর সমালোচনা করতেন। অনেক ব্যক্তির প্রতিই তার ছিল প্রকাশ্য অশ্রদ্ধা। বিশেষত যাদের তিনি ‘ধান্দাবাজ’ মনে করতেন। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানকেই তিনি বলতেন ‘ধান্দাবাজির দোকান’। তাই তিনি কোনো সভা-সমিতি-সেমিনারে যেতেন না। সবার সঙ্গে মিশতেনও না।
তিনি শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-সিনেমারও অনুরাগী ছিলেন। ধ্রুপদী সংগীতে তার ছিল বিরাট আগ্রহ। বিভিন্ন জনের কাছে গান ও সিনেমার সিডি সংগ্রহ করতেন। রাজনৈতিক কলামের বাইরে তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, চিত্র সমালোচনা লিখতেন। তিনি শিশুদের অনেক বইয়ের অনুবাদও করেছেন। তার অনূদিত ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য চেম্বার অব সিক্রেটস’ এবং ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অব আজকাবান’ বই দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এ ছাড়া তিনি দেশ টিভিতে একটি নিয়মিত টকশোর সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন টকশোতে বক্তা হিসেবেও অংশগ্রহণ করেছেন। ‘টু দ্য পয়েন্ট’ বলা এবং লেখার ক্ষেত্রে মুনীর ভাই ছিলেন অনন্য।
বজলুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। আমৃত্যু তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। রিপোর্টিং ও সম্পাদনাতেও তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন।

দেশ, দেশের রাজনীতি নিয়ে মুনীর ভাই সবসময়ই উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে এই উদ্বেগের কথা জানাতেন। কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লিখতেও তিনি পরামর্শ দিতেন। এমনকি খোঁজ-খবর নিতেও মাঝে মাঝে ফোন দিতেন। সাবধানে থাকার পরামর্শ দিতেন। মুনীর ভাইয়ের মৃত্যুতে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শূন্যতা অনুভব করছি।
মনে পড়ে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা। ২০১৬ সালে আমার লেখা একটি রম্যরচনার সংকলন ‘প্যাঁচের রাজনীতি, রাজনীতির প্যাঁচ’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটারিয়ায়। সেখানে মুনীর ভাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। মুনীর ভাই ফোনে বলেছিলেন, আমি তো কোনো ফরমাল অনুষ্ঠানে যাই না। কিন্তু তোমাকে তো না করতে পারি না। ঠিক আছে, যাব।
মুনীর ভাই যথাসময়ে এসেছিলেন। সেখানে দেশের ক্রমবর্ধমান ধর্মান্ধতা ও দিশাহীন সংকীর্ণ রাজনীতির বিপরীতে প্রগতিশীল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের যে একটি এক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া উচিত-এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ বক্তব্যও রেখেছিলেন।
মুনীর ভাই জীবনকে উভোগ করতেন। কোনো সংঘ-সংগঠনে না জড়িয়ে নিজের মতো করে নিজের একটি পরিমন্ডল গড়ে তিনি সুখেই জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু আকস্মিকই যেন ছন্দপতন ঘটল।
সদা চঞ্চল, সপ্রতিভ, আমুদে মানুষটি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন গত ৩১ অক্টোবর। বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু করোনা-পরবর্তী নানা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তিনি মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। বাংলাদেশ হারালো একজন মেধাবী সাংবাদিককে।
সংবাদে কাজ করার সময় আমি অগ্রজপ্রতিম যাদের পেয়েছিলাম একে একে তাদের সবাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। প্রথমে গিয়েছিলেন সংবাদের মালিক-সম্পাদক আহমদুল কবির। এরপর সন্তোষ গুপ্ত। এরপর বজলুর রহমান, মকবুলার রহমান। দু সপ্তাহ আগে বিদায় নিলেন আবুল হাসনাত। সর্বশেষ গেলেন মুনীরুজ্জামান। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে এক-একটি নক্ষত্রের মতো। যারা জীবনভর আলোকিত থেকেছেন, সমাজকে আলোকিত করেছেন। তাদের মৃত্যু এদেশের সাংবাদিকতা জগৎ ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। এসব শূন্যস্থান কখনই পূরণ হবার নয়।
এমনিতেই আমাদের দেশ মেধাবী ও মননশীল মানুষের সংকটে ভুগছে। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আগামী প্রজন্ম যাদের খুঁটি হিসেবে ধরতে চান যাদের, আশ্রয় পেতে চান, পথের দিশা পেতে চান, তারা একে একে চলে যাচ্ছেন। সুস্থ সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা, মানবিকতা, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা যখন প্রায় উধাও, তখন মুনীর ভাইও চিরবিদায় নিলেন! একে একে নিবিছে দেউটি, দীপ জ্বালানোর কেউ থাকছে না।
মুনীর ভাই বড় অসময়ে, অকালে চলে গেলেন। পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা, মোসাহেবি, অন্ধ দলতন্ত্র, সর্বগ্রাসী অবক্ষয় ও ধর্মের আলখেল্লা যখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে, অন্ধকারের ছায়া যখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, তখন মুনীর ভাইয়ের মতো তেজস্বী লড়াকু সাংবাদিক ও লেখকের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।
স্পষ্টবাদী, নির্ভীক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল এই মানুষটির প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।
লেখক : কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here