রইল বাকি তিন

37

বিজয়ের মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যেই বেঁধে ফেলা সম্ভব হচ্ছে কল্লোলিনী তীব্র স্রোতস্বিনী দুকূল ভাঙ্গা কীর্তিনাশা বলে অভিহিত প্রমত্তা পদ্মাকে। আর বাকি মাত্র তিনটি স্প্যান। তাহলেই পদ্মা নদীর এপার-ওপার দুকূলের মধ্যে সম্পন্ন হবে কংক্রিট ও কঠিন ইস্পাতের সুদৃঢ় বন্ধন। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ৩৮তম স্প্যান বসেছে শনিবার। এই প্রান্তে এটি প্রথম স্প্যান। মূলত এর ওপর দিয়েই পদ্মা সেতুতে উঠবে ছোট-বড়-মাঝারি-ভারি যানবাহন। ঝমঝম শব্দে চারদিক প্রকম্পিত করে চলবে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন। ৩৮তম স্প্যান বসানোর মাধ্যমে সেতুটির পাঁচ হাজার ৭০০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। সর্বশেষ ৪০তম স্প্যানটি সুমহান বিজয় দিবসের পাঁচ দিন আগে ১০ ডিসেম্বর বসানোর জন্য পুরোদমে চলছে দক্ষকর্মযজ্ঞ। আর সেটি বসলেই সম্পূর্ণ সম্ভবহবে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হতে যাচ্ছে আপামর বাংলাদেশবাসীর দীর্ঘদিনের আকাক্সিক্ষত পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের ভয়াবহ মৃত্যুঘাতী সংক্রমণে বিপর্যস্ত, লকডাউনের কারণে যাবতীয় নির্মাণকাজসহ অর্থনীতির চাকা প্রায় স্থবির তখন দেশবাসীর কাছে এর চেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর আর কি হতে পারে? অথচ এই পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশকে ব্যাপক প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলাসহ ভাবমূর্তির সঙ্কটেও পতিত হতে হয়েছে। ভুয়া দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া, নানা গুজব ও নেতিবাচক প্রচার, হাসি-তামাশাসহ দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি ইত্যাদি কোন কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারেনি দেশবাসীর সুদৃঢ় মনোবল, সদিচ্ছা ও কর্মোদ্যোগ। আর এসবের পেছনেই নিরন্তর নির্ভীক অকুতোভয় ও দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাব নিয়ে অকুণ্ঠ সমর্থন-সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। মূলত তাঁর দুঃসাহসী দৃঢ়চিত্ত উদ্যোগ ও সঞ্চালনেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু বর্তমানে অনেকটাই দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি এখন ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে এগিয়ে মূল সেতুর কাজ, ৯০ শতাংশের বেশি। আর্থিক অগ্রগতি বর্তমানে ৭৯ শতাংশের বেশি। অথচ অর্থের জোগান নিয়েই ঘটেছিল বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত বহুকথিত অনর্থের সূত্রপাত। কীর্তিনাশা হিসেবে অভিহিত তা-বপ্রবণ পদ্মার নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার বাস্তব কাজের অগ্রগতি প্রায় এক শ’ শতাংশ। মোটকথা, ভয়াবহ সংক্রামক হন্তারক ব্যাধি কোভিড-১৯ অনেকটাই হার মেনেছে পদ্মা সেতুর নির্মাণের কাছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন যে, পুরো প্রকল্পটি আইসোলেট রেখে স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষা মেনেই এগিয়ে চলেছে। আরও এগিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল যদি না চীনের কয়েক পরামর্শক করোনার কারণে আটকা পড়তেন চীনে। তবু বর্তমানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশী-বিদেশী প্রায় তিন হাজার কর্মী কাজ করে চলেছেন রাতদিন নিরন্তর। চীন অবশ্য বরাবরই বলে এসেছে যে, উহানসহ সে দেশের কয়েকটি শহর করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যতই বিপর্যস্ত হোক না কেন, তারা বাংলাদেশে তাদের সহায়তায় পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য প্রকল্পের কাজ যে কোন উপায়ে শেষ করে দেবে নির্ধারিত সময়ের আগে।
উল্লেখ্য, তথাকথিত দুর্নীতির ভুয়া অভিযোগ তুলে এই সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের তহবিল প্রত্যাহারের পর যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বউদ্যোগে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিলেন, তখন তা বাস্তবায়নের অগ্রদূত হিসেবে এগিয়ে আসেন দেশীয় প্রকৌশলীরাই। দৃশ্যমান এই সেতু ইতোমধ্যে ঢাকা বিভাগের সঙ্গে মুন্সীগঞ্জ ও মাদারীপুরকে সংযুক্ত করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি চালু হলে দেশের দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী অবদান রাখতে সক্ষম হবে নিঃসন্দেহে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here