বলিউডের পাশাপাশি হলে সব দেশের সিনেমাই দেখানো হোক

27

“বাংলাদেশ থেকে হলে বসে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে উঠে যাবে, এটি অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য নয়! হলিউড, বলিউড, থাইল্যান্ড, ইরানি, কোরিয়া বা জাপান সব দেশের সিনেমা আমাদের দেশের হলে প্রদর্শিত হোক, সিনেমাপ্রেমীরা হলে আসবেই। ভালো এবং ভিন্নধর্মী সিনেমা দর্শক ফেরানোর কাজটি হয়তো সহজেই করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি সিনেমা নির্মাতারাও হয়তো প্রতিযোগিতায় টিকতে ভালো সিনেমা তৈরি করবেন। অনেক অভিনেতা- অভিনেত্রীও হয়তো তাদের কাজে আরো মনোযোগী হবেন”

ইব্রাহিম নোমান
একটা সময় বাংলা সিনেমারও সুদিন ছিল। সে সময় হলগুলোতে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। সব টিকিট শেষ হয়ে যেত। পরের শোর জন্য দর্শকরা লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, মাত্র দুই দশক আগেও এমন চিত্র দেখা যেত। কিন্তু নানা কারণেই হলগুলো দর্শক হারাতে থাকে। হারাতে হারাতে শূন্যে এসে অনেক হলই বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই সিনেমা প্রিয়। একসময় যে হলগুলোতে যে উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত, সেটা তো অন্য কোনো দেশের চিত্র না, বরং এই দেশেরই চিত্র। সিনেমাপ্রীতি এখানকার মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। মানুষ সব সময় ভিন্ন কিছু খোঁজে। সে দিক থেকে বিবেচনা করা হলে হয়তো দর্শক ফিরতে পারে।
গত মার্চ মাস থেকেই শুরু করোনা পরিস্থিতি। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। কয়েক মাসের জন্য হলগুলো বন্ধ রাখতে হয়। সে সময় সিনেমার কাজগুলো মোঁটামুটি বন্ধই রাখতে হয়। আবার অনেক সিনেমা মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে এলে গত ১৬ অক্টোবর হলগুলো আবার খুলে দেয়া হয়। কিন্তু খোলার পর মাস পেরুলেও দর্শক খরা কাটেনি। এই খরা কাঁটতে এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ হল মালিক সমিতির নেতাসহ অন্যরা বলিউডের সিনেমা হলে চালানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই বলিউডের সিনেমা কি পারবে হলে দর্শক ফেরাতে? কিন্তু শুধু বলিউডের সিনেমা কেন এই সুবিধা পাবে?
‘বজরঙ্গি ভাইজান’র মতো ছবি পাকিস্তান থেকে সতেরো কোটি ইন্ডিয়ান রুপি আয় করেছে। এটা দেখে পাকিস্তানের লোকাল যারা প্রোডিউসার বা স্টুডিও মালিক, তারা স্টুডিওর আধুনিকায়ন করেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর ২০১৪ সালের ২০ মার্চের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে সেখানে মাত্র ২০টি প্রেক্ষাগৃহ ছিল। ২০১৫ সালে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪। আর স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাণেও একটা পরিবর্তন এসেছে। ভারতীয় চলচ্চিত্র পাকিস্তানি চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করতে পারেনি, বরং পরিবর্তনে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
২০১৫ সালে সালমান খান অভিনীত ‘ওয়ান্টেড’ সিনেমা আমাদের দেশে চালানো হয়। কিন্তু তাতে খুব বেশি দর্শক খরা কাটেনি। যদিও পরে আর বলিউডের সিনেমা চালানো হয়নি। সাফটা (সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে চুক্তি) চুক্তিতে তো বলিউডের বাইরেও অনেক দেশের ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। সিনেমা হলের মালিকরা হয়তো আপাত খরা কাঁতে প্রথমে বলিউডকেই বেছে নিচ্ছেন। তবে বাংলাদেশের হলগুলোতে তো সেসব দেশেরও সেরা সিনেমাগুলো চালানো যেতে পারে। যদি সুস্থ সংস্কৃতি ফেরে, ভালো সিনেমা দেখানো হয়, তবে হলগুলোতে সুদিন ফিরতে পারে।
এবার আসা যাক সিনেমার মানের প্রসঙ্গে। দর্শকদের একাংশের অভিযোগ, এখন ভালো সিনেমা তৈরি হচ্ছে না। অনেক নির্মাতাও এর সঙ্গে একমত। তা ছাড়া, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একটা অংশ তা-ই মনে করে। যারা গল্প লিখছেন তারা একই গল্পের পুনরাবৃত্তি করছেন কিংবা বিভিন্ন সিনেমার গল্প থেকে ধার করে গল্প লিখছেন। দেশের মানুষ যেহেতু সিনেমা দেখে, তারা কিন্তু ঠিকই এই কারচুপিটা ধরে ফেলে। তা ছাড়া, যারা অভিনয় করছেন তারা সিনেমায় চরিত্রকে কতটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারছেন? অনেক ক্ষেত্রে অভিনয়ের কৃত্রিমতটা চোখে পড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া, আমাদের প্রযুক্তিগত দিকটিও দেখতে হবে। তবে কিছু ভালো কাজ অবশ্যই হচ্ছে। সেগুলো ঠিকই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
দর্শকদের আরেকটি অংশ হলের পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। তাদের ওপর আবার ইন্টারনেট সুবিধা। এত সুবিধা রেখে মানুষ কেন হলে যাবে? তাহলে নিশ্চয় দর্শকদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা রাখতে হবে। প্রযুক্তির দিকটা হল মালিকদের মাথায় রাখতে হবে। সিনেমা দেখার সেরা অভিজ্ঞতাঁ দর্শককে দিতে হবে। তা হলেই না দর্শক ফিরবে! যদিও বাংলাদেশে দু-চারটি সিনেমা হলে রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়। বাংলাদেশের দর্শকরা বিভিন্ন দেশের সিনেমা দেখেন। অনেকে তো হলিউডের কোনো সিনেমা বাদ দেন না। অনেকের কাছে কোরিয়ান সিনেমার অ্যাকশন এবং গল্প ভালো লাগে। কারো কারো কাছে তুর্কি এবং ইরানি সিনেমা ভালো লাগে। কারো কাছে হয়তো ইতিহাস নিয়ে তৈরি সিনেমা ভালো লাগে। কেউ হয়তো চীনা-জাপানি সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন। তাদের হলে ফেরাতে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে? সেসব সিনেমাও তো দেশের হলগুলো চালাতে পারে। বলিউডের সিনেমার পাশাপাশি অনান্য দেশের সিনেমা দেখালে হয়তো বেশি দর্শক ফিরতে পারে। বিনোদন বা সংস্কৃতি পাখির মতো, একে নিয়মের বেড়াজালে বন্দী রাখা যায় না! যত বেশি মুক্ত রাখা যাবে তত বাড়বে এর সৌন্দর্য! আমরা বাসায় বসেই এখন নেটফ্লিক্স, আমাজনে পৃথিবীর সব দেশের মুভি দেখছি। তবে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার যে আনন্দ, তার সঙ্গে ইউটিউব কিংবা নেটফ্লিক্সের তুলনা চলে না। শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও হলে বসে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে হলে বসে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে উঠে যাবে, এটি অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য নয়! হলিউড, বলিউড, থাইল্যান্ড, ইরানি, কোরিয়া বা জাপান সব দেশের সিনেমা আমাদের দেশের হলে প্রদর্শিত হোক, সিনেমাপ্রেমীরা হলে আসবেই। ভালো এবং ভিন্নধর্মী সিনেমা দর্শক ফেরানোর কাজটি হয়তো সহজেই করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি সিনেমা নির্মাতারাও হয়তো প্রতিযোগিতায় টিকতে ভালো সিনেমা তৈরি করবেন। অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীও হয়তো তাদের কাজে আরো মনোযোগী হবেন। তা ছাড়া, সরকারকেও চলচ্চিত্র খাতে নজর দিতে হবে। চলচ্চিত্র সরকারের বড় একটি আয়েরও উৎস হতে পারে।
বাংলাদেশে হল এবং সিনেমার হারানো সংস্কৃতি ফিরে আসুক। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় হয়তো সেই সুদিন দেখতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। আবারো হলগুলোতে শোর সব টিকিট শেষ হয়ে যাবে। সিট ভরে যাবে দর্শকে। সিনেমা শেষে সুখস্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরবে দর্শক। অনেক লেখক হয়তো লিখবেন ‘একদিন আমাদেরও সুদিন ছিল’।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সারাক্ষণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here