আলী যাকের : অনন্তলোকে আমাদের গ্যালিলিও

35

“স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তিনি যেমন নাটকে কাজ করেছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়। অসাম্প্রদায়িক আর চিন্তাশীল মননের এই মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন, কাজ করে গেছেন নিরন্তর”

সঙ্গীতা ইমাম
নক্ষত্ররা কি অনন্তে বিলীন হয়?
এই দুর্বিষহ মহামারিকালে আমাদের নক্ষত্রেরা একে একে পাড়ি জমাচ্ছেন অনন্তের পথে। মিলিয়ে যাচ্ছেন অনন্তে। গত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) ভোরে বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা থিয়েটারের নক্ষত্র, বিজ্ঞাপনজগতের অন্যতম পথিকৃৎ, অভিনয়শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের চলে গেলেন আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে।
আলী যাকের আমার ছটলু কাকু। অভিনয়শিল্পী আলী যাকের বলতেই মানসপটে ভেসে ওঠে জার্মান কালচারাল সেন্টারের মঞ্চে গ্যালিলিও গ্যালিলির স্থির, অথচ জ্বলজ্বলে দীপ্তিময় দুটি চোখ। আর ছোট পর্দায় কত কত চরিত্র তাঁর। একেকটি প্রজন্মকে তিনি বেঁধেছেন চরিত্রের একেক সম্বন্ধে।
কবে থেকে এই বিশাল মানুষকে চিনি; আজ আর বলতে পারব না। ছোটবেলা থেকে দেখছি তাঁকে। আমার আব্বু সৈয়দ হাসান ইমাম আর ছটলু কাকুর কাছে ইস্ট এন্ড ক্লাবে ক্রিকেট খেলার গল্প শুনেছি। এই ক্লাবের হয়ে ওপেনিং ব্যাটসম্যান সৈয়দ হাসান ইমাম আর আলী যাকেরের যুগলবন্দীর গল্প কত শুনেছি। ছটলু কাকু দেখা হলেই শোনাতেন সে সময়ে তাঁদের পালা করে উইকেট কিপারের দায়িত্ব পালনের গল্প।
মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধা (শব্দসৈনিক) ছিলেন আলী যাকের। তখন ‘সালেহ আহমেদ’ ছদ্মনামে বাংলা খবর পড়তেন সৈয়দ হাসান ইমাম আর আলী যাকের নামেই ইংরেজি খবর পড়তেন ছটলু কাকু। বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার গীতিনৃত্যালেখ্যর দুই ধারাভাষ্যকার ছিলেন আব্বু আর ছটলু কাকু। একাত্তরের সম্মুখ যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির আর শরণার্থী শিবিরগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে তাঁদের উদ্দীপ্ত করতেন এই সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা। এমন কত-শত গল্প শুনে তাঁর আদরে-স্নেহে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে।
দুই.
বরেণ্য শিল্পী আলী যাকেরের বাবার বদলির চাকরির সুবাদে তাঁকে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে হলেও এই শিল্পীর প্রথম স্মৃতি ফেনীতে। সেন্ট গ্রেগরি থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন নটর ডেম কলেজে, আর সেখান থেকে পাস করে ভর্তি হন সমাজবিজ্ঞানে। তখনই যুক্ত হন ছাত্ররাজনীতিতে, করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। স্নাতক শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে চলে যান করাচি। ১৯৬৯ সালে তিনি ফিরে আসেন ঢাকায়।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরে আলী যাকের যোগ দেন আরণ্যক নাট্যদলে। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ওই বছরেরই জুন মাসে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। বাকি ইতিহাস, সৎ মানুষের খোঁজে, দেওয়ান গাজীর কিস্সা, কোপেনিকের ক্যাপটেন, গ্যালিলিও, ম্যাকবেথসহ অনেক মঞ্চসফল নাটকের নির্দেশক, নয়তো অভিনেতা ছিলেন তিনি। বিশ্বখ্যাত সব মঞ্চনাটক রূপান্তর করেছেন। ৪৪ বছর বয়সে তিনি মঞ্চে গ্যালিলিওর চরিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। নাটকে গ্যালিলিওর জীবন দেখানো হয়েছিল ৪৬ বছর থেকে সত্তরোর্ধ্ব বয়স পর্যন্ত। চরিত্রের এই পরিবর্তনটি তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন তাঁর অভিনয় প্রতিভা দিয়ে। তাঁর প্রতিটি মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রেই কিন্তু অসামান্য পরিশ্রমের ছাঁচটি আমরা পাই। যখন নূরলদীনের সারাজীবন করেছেন, তখন কী সুন্দর আয়ত্ত করেছিলেন রংপুরের ভাষা, আবার দেওয়ান গাজীর কিস্সায় যশোরের ভাষা। যখন কাঁঠালবাগান করছেন, তখন আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাষা। নানা আঞ্চলিক ভাষায় দখল থাকলেও তিনি কিন্তু কথা বলতেন স্পষ্ট প্রমিত ভাষায়।
স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তিনি যেমন নাটকে কাজ করেছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়। অসাম্প্রদায়িক আর চিন্তাশীল মননের এই মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন, কাজ করে গেছেন নিরন্তর।
তিন.
বড় হয়ে যখন আমি নিজে যুক্ত হলাম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, তখন মাঠের সহযোদ্ধা হিসেবে কাছে পেয়েছি ছটলু কাকুকে। সংগঠনের জন্য চাঁদা চাইতে পৌঁছে গেছি এশিয়াটিকে কাকুর অফিসে। স্কুলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ক্লাব ‘৭১ অবিনাশী সত্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনার আসরে কাকুকে বলতেই হাজির হয়ে যেতেন। শত শত শিক্ষার্থীকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তাঁর যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথায়।
স্কুলের ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাবের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হতে অনুরোধ করতেই চলে আসতেন। এত কাজের মাঝেও কখনো না বলতেন না। আমার কত অত্যাচার যে সহ্য করেছেন ছটলু কাকু!
সহযোদ্ধা হিসেবে আরো কাছে আসলাম যখন কাকু ‘বসন্ত উৎসব উদযাপন পর্ষদের’ সভাপতি হলেন। উৎসবের সভাগুলো করতে ওনার অফিসে যেতাম। অসীম ধৈর্য ধরে আমাদের কথা-কাটাকাটি, ঝগড়া আর মন-কষাকষির সুরাহা করতেন। যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন উচিত করণীয় কোনটি।
বসন্ত উৎসবের দিন মঞ্চে ‘বসন্তকথন’ শেষ হতেই মনের আনন্দে প্রাঙ্গণজুড়ে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতি আর উৎসবকে ক্যামেরাবন্দী করতেন। আমি যখন আবীর নিয়ে সামনে দাঁড়াতাম, পায়ে আবীর ছোঁয়াতে গেলেই ধরে ফেলে মাথাটা নুইয়ে কপাল এগিয়ে দিতেন। নিজেকে বড় সৌভাগ্যবান মনে হতো ওই প্রশস্ত ললাটে আবীরের রক্তরাগ ছোঁয়াতে পেরে।
২০১৫ সালে আব্বুর আশিতম জন্মদিন উপলক্ষে একটি ডকুমেন্টারি তৈরির পরিকল্পনা করতেই মনে হলো ছটলু কাকুর সাক্ষাৎকার ছাড়া আব্বুর জীবনকে তুলে ধরা কখনোই সম্পূর্ণ হবে না। কারণ আব্বুর খেলোয়াড় জীবনের কথা বলার মানুষ আর কোথায় পাব। এক দুপুরে চলে গেলাম কাকুর অফিসে। কত গল্প, কত স্মৃতিচারণা। সব হয়তো যুক্ত করা হয়নি প্রামাণ্যচিত্রে; কিন্তু ধরা আছে মনে আর লেন্সে।
একজন মানুষ যেমন সাবলীল রবীন্দ্রনাথ-শেকসপিয়ার-ব্রেখট-ইবসেন কিংবা বিশ্বসাহিত্যের নানা শাখার আলোচনায়; তেমনি বোদ্ধা শ্রোতা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের। ফটোগ্রাফিতে তাঁর অসীম ধৈর্য আর নিষ্ঠা। একটা সুন্দর ছবি তুলে শিশুর মতো আনন্দে উদ্বেলিত উচ্ছ্বসিত হতে দেখেছি। দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রের প্রতি অসীম আগ্রহ দেখেছি। বেঙ্গল বা ছায়ানটের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবে, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের যেকোনো আয়োজনে কিংবা দেখেছি নিবিষ্ট মনে সঙ্গীতে নিমগ্ন থাকতে। কথা বলতে বলতে কবিতার প্রিয় পক্সিক্ষ আবৃত্তি করতে দেখেছি এই হিমালয়সম মানুষটিকে।

কর্কট রোগের সঙ্গে চার বছর যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত করাল কোভিডের আঘাতে চলে গেলেন বিশাল এই ব্যক্তিত্ব। যাঁর স্নেহ আর সাহায্যের পরশ থেকে বঞ্চিত হয়নি সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনো মানুষ বা সংগঠন। ২০১৮ সালের গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে শিল্পকলা একাডেমিতে যখন ‘গ্যালিলিও’ করছেন, তখন তাঁর বয়স ৭৪ বছর। নাটকের শেষাংশের গ্যালিলিওর প্রায় সমবয়সী। কিন্তু গ্যালিলিওর তো কখনো মৃত্যু হয় না। যুক্তি, আদর্শ আর ভালোবাসার মানুষের মৃত্যু হয় না কখনোই। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধারজন প্রথিত থাকেন অন্তরের গহিনে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় আনত হব প্রতিটি উৎসবে, আয়োজনে, কর্মের যজ্ঞে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

Previous articleপ্রশাসনের প্রতি প্রধানমন্ত্রী : ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে
Next articleমুস্তাফিজদের সামনে উড়ে গেল মাহমুদউল্লাহ-সাকিবরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here