ওয়ার্কিং ফ্রম হোম!

22

“প্রচণ্ড এই দানবীয় তাণ্ডবের ভেতর কোভিড আমাদের যা দিয়ে গেছে তার একটি হলো প্রযুক্তিকে সামনে নিয়ে যাওয়া। এই দেশের কোটি কোটি মানুষকে প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান দিতে যে পরিমাণ সময় লাগত, সেটা যেন মুহূর্তেই আমাদের হয়ে গেছে”

জাকারিয়া স্বপন
‘ওয়ার্কিং ফ্রম হোম’ টার্মটি প্রথম আমি শুনি সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করতে গিয়ে। প্রথম প্রথম বিষয়টি খুব কানে লাগত। সবেমাত্র বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। কাজ করতে হয় অফিসে গিয়ে। বাসায় বসে আবার কাজ করে কীভাবে! কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না।
চাকরিতে কয়েক বছর চলে গেলেও কোনো দিন সাহস হয়নি বাসা থেকে কাজ। সকালে ঘুম ভেঙে প্রস্তুত হয়ে অফিসে যাব; তারপর সারা দিন কাজ করব; ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরব। এটাই ছিল রুটিন। মাঝে মাঝে এতই ক্লান্ত যে, ফেরার পথে পিৎজা বা কেএফসি থেকে কিছু একটা নিয়ে কোনোরকমে বাসায় পৌঁছে যাওয়া।
আমেরিকার অন্যান্য জায়গার চেয়ে সিলিকন ভ্যালিতে কাজের চাপ বেশি- এটা ধরে নিয়েই মানুষ ওখানে যায়। আমেরিকার অন্যান্য রাজ্যে পাঁচটা বাজলেই পার্কিং লট খালি। কিন্তু সিলিকন ভ্যালিতে রাত আটটার সময়ও পুরো ভবনে লাইট জ্বলতে দেখা যায়। পার্কিং লট পূর্ণ না থাকলেও একদম খালি হয়ে যায় না। সবাই এই কালচারের সঙ্গে পরিচিত। সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করাটা বেশি ভাগ স্টার্টআপগুলোই আশা করে।
এমন একটা পরিবেশে গিয়ে শুনলাম ‘ওয়ার্কিং ফ্রম হোম’। যখন কোনো টেলিকনফারেন্সে যোগ দিয়েছি, নয়তো দুপুরের খাবারে গিয়ে সহকর্মীদের কেউ কেউ অনুপস্থিত- তখন শুনতাম ‘হি ইস ওয়ার্কিং ফ্রম হোম টুডে’। বাহ, বেশ মজার তো!
আমার টিমের মার্ককে একদিন বললাম, তুমি তো মাঝে মাঝে ওয়ার্কিং ফ্রম হোম করো। আমিও কি করতে পারি?
মার্ক হেসে দিয়ে বলল, তোমার প্রয়োজন হলে করবে। সমস্যা কী?
আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, কারো অনুমতি নিতে হবে না?
মার্ক অবাক হয়ে বলল, কার অনুমতি নিতে হবে!
আমিও অবাক হয়ে বললাম, নাহ ধরো, ডেভিড নয়তো ভিপির?
মার্ক বলল, এখানে তো কেউ কাউকে মাইক্রোম্যানেজ করে না। তোমার প্রয়োজন থাকলে বাসা থেকে কাজ করবে। আমার বাড়িতে কোনো প্যাকেট ডেলিভারি থাকলে আমাকে উপস্থিত থাকতে হয়। তখন অফিস থেকে আবার বাসায় ড্রাইভ করে যাব কেন? সময় নষ্ট।
আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম, কেউ যদি কাজে ফাঁকি মারে?
মার্ক হাসতে হাসতে বলল, যারা ওপরে উঠতে চায় তারা কাজে ফাঁকি মারে না। বরং বাড়তি কাজ করে। আর যারা ফাঁকি মারে, তারা অফিসে বসেও মারে! যার যা টার্গেট!
আমি হেসে দিয়ে বললাম, তাহলে তুমি সাহস দিচ্ছো, আমিও মাঝে মাঝে বাসা থেকে কাজ করতে পারি?
মার্ক কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ না করেই জবাব দিল, ওহ ইয়াহ! শুধু গ্রুপে একটা ই-মেইল করে রেখো বাকিরা জানে তুমি ডেস্কে নেই। নইলে তারা তোমাকে খুঁজে পাবে না। ওদের সময় নষ্ট হবে।
আমি মুচকি হেসে বললাম, শিওর। এক দিন করে দেখি কেমন লাগে!
মার্কও হেসে দিয়ে বলল, নট এ বিগ ডিল!
দুই.
যদিও মার্ক আমাকে সাহস দিল, তবু ততটা সাহস বাংলাদেশি মানসিকতায় বেড়ে ওঠা আমার ভেতর কাজ করল না। আমি প্রথাগত নিয়মে অফিস করতে থাকি।
কিন্তু একদিন আমরাও বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ তৈরি হলো। তখনো টেলিফোন লাইন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। মোবাইল ইন্টারনেট তো তখনো সাধারণের জন্য আসেনি। বাসায় হাইস্পিড ইন্টারনেট নেয়ার জন্য অফিসের মাধ্যমে ডিএসএল (এখন আর এটা জনপ্রিয় মাধ্যম নয়) অর্ডার করলাম। এটিএন্ডটি থেকে লোক এসে বাসায় ডিএসএল কানেকশন দিয়ে যাবে- ১.৫ মেগাবিটস/সে.। চরম উত্তেজনা। এত স্পিড দিয়ে কী করব? ফাইবার অপটিক তখনো বাসায় দেয়া শুরু করেনি।
আগের দিন ম্যানেজারকে বললাম, কালকে আমার বাসায় ডিএসএল লাগাবে।
ডেভিড হেসে দিয়ে বলল, যাক তোমাকে আমরা শেষ পর্যন্ত হাইস্পিডে আনতে পারছি।
আমি বললাম, কাল আমাকে তখন বাসায় থাকতে হবে।
ডেভিড বলল, অবশ্যই। তুমি যেন বাসা থেকে কাজ করতে পারো, সেই জন্যই তো ডিএসএল দেয়া হচ্ছে তোমাকে।
আমি মুচকি হেসে দিয়ে বললাম, কানেকশন পাওয়ার পর তোমাকে ই-মেইল করবো নে!
ডেভিড বলল, ভিপিএন নিয়েছো?
আমি বললাম, হুম, আমার ল্যাপটপে ইনস্টল করা আছে।
ডেভিড বলল, গুডলাক।
আমার ভেতর চরম উত্তেজনা। ৬৪ কেবিপিএস থেকে ১.৫ এমবিপিএস! বর্তমান সময়ের ছেলেমেয়েরা সেটা বুঝবে না। কারণ তাদের জীবন শুরুই হচ্ছে ফাইবার অপটিক নয়তো থ্রি-জি দিয়ে। ফেরারি চালিয়ে যার অভ্যাস, সে কি জানে রিকশাচালকের কষ্ট! নাকি সেটা আদৌ সম্ভব!
রাতে একটু ঘুমও কম হলো। কত কিছু স্বপ্নে এসে ভিড় করল! এখন আর টেলিফোন সংযোগ দিয়ে ডায়াল করতে হবে না। সারাক্ষণই ইন্টারনেটে যুক্ত থাকবে আমার বাসার পিসি নয়তো ল্যাপটপ। অফিসে যেমন স্পিড পাই, তেমন স্পিড পাব বাসায় বসেই। কত রকমের সাত-পাঁচ ভেবে দুপুরে একজন লাইনম্যানের সাহায্যে হাইস্পিড ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হলো আমার অ্যাপার্টমেন্ট। একই তার দিয়ে টেলিফোনে কথা বলা যায়, আবার ইন্টারনেটও ব্যবহার করা যায়। খুবই অবাক করা প্রযুক্তি!
সংযোগ নিয়ে প্রথমেই অফিসে টিমকে জানালাম, ‘জাস্ট গট দ্য ডিএসএল কানেকশন, ওয়ার্কিং ফ্রম হোম রেস্ট অব দ্য ডে’।
তিন.
ওপরের ঘটনাটি বেশি দিন আগের নয়। এই মাত্র ১৫-২০ বছর আগেই এমন ছিল। এখন একটি বাসায় ফাইবার অপটিক দিয়ে ১ জিপিবিএস কিংবা তারও বেশি গতি দেয়া হচ্ছে। লাইভ ট্রিমিং করা যাচ্ছে বাসা থেকে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে থ্রি-জি ফোর-জির গতি। বাসাবাড়ি থেকে ফ্রিক্সড টেলিফোন লাইন যেমন হারিয়ে গেল, তার সঙ্গে মারা গেল ডিএসএল! নতুন কিছু এসে পুরোনোকে মেরে ফেলবে, এটাই হলো প্রযুক্তি!
তখন আমরা মাসে এক দিন ওয়ার্কিং ফ্রম হোম করতে পারলে সেই দিনটাকে মনে হতো ঈদ। তবে আমাদের আসল ঈদের দিন যদি ওয়ার্কিং ডে-তে পড়ে যেত, তখন অবশ্যই ‘ওয়ার্কিং ফ্রম হোম’ বলে দিনটা নিজেকে উপহার দেয়া হতো বৈকি! তখন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ম করে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে দিত। তবে সেগুলো নিয়ে সংবাদ হতো। যারা এই ধরনের ফ্লেক্সিবিলিটি দিত, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নভাবে দেখা হতো! কিন্তু এই করোনাকালে কীভাবে পাল্টে গেল জীবন, কনসেপ্ট এবং কাজের ধরন!
আট মাসের বেশি সময় ধরে আমরা বাসা থেকে ফুলটাইম কাজ করছি। এখন কেউ অফিসে গেলে উল্টো বলতে হয়, আমি কিন্তু আজ অফিসে বসে কাজ করছি! পরিস্থিতি কীভাবে পাল্টে দেয় সবকিছু!
আজ সকালে ছোট একটা প্রেজেন্টেশন ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০২০ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সাহেব বললেন, এবারের ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে তিনি অনলাইন কুইজ করতে চান। আমাদের একটি কুইজের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেই কুইজের বিষয়ে বলতে গিয়েই আমার উপস্থাপনা। করোনার জন্য আমি বাইরে যাচ্ছি না। তাই বাসা থেকেই যুক্ত হলাম ভিডিও কনফারেন্সে। আমি বাসার ল্যাপটপে। আর ওখানে অডিটোরিয়ামে বিশাল পর্দায় দেখাচ্ছে আমার স্লাইড! আবার সেটা একই সঙ্গে লাইভ হচ্ছে ফেসবুকে! আমারই এক সহকর্মী আবার সেই লাইভ থেকে ছবি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করছে। কতটা পাল্টে গেল এই পৃথিবী। আর সেই গ্রহের সঙ্গে পাল্টে গেল বাংলাদেশও। এই দেশটি উন্নয়নের অনেক প্যারামিটারে পৃথিবীর অনেক দেশের কাছেই বিস্ময়। এই করোনার সময়ও শতকরা ৫ ভাগের বেশি হারে গ্রো করছে, যা অনেক দেশেরই নেই। বর্তমান সময়ে ছেলেমেয়েরা কতটা সৌভাগ্যবান- সেটাই ভাবছিলাম সারাটা দিন জুড়ে। আগামী ২০ বছর পর আরো কতটা পথ হাঁটবে এই পৃথিবী! তার সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়েগুলোও এগোবে।
চার.
কোভিড আমাদের জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে এবং চলতে শিখিয়ে দিয়েছে। কোভিডের দৌরাত্ম্যে আমাদের জীবন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কখন কে এই গ্রহ ছেড়ে চলে যায়, সেই দুঃস্বপ্ন নিয়ে ভোর হয়। আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় হিসাব মেলাতে হয়, কালকের ভোরটা আমাদের অনেকের জন্য আসবে তো?
পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমরাও আমাদের অনেক গুণী মানুষকে হারিয়েছি, এবং নিত্যদিন হারাচ্ছি। অবস্থা এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা সবাই হয়তো জীবনকে নতুনভাবে বুঝতে শিখছি। জীবন যে কতটা স্বল্প সময়ের, এবং কতটা ভঙ্গুর- কোভিড না এলে হয়তো আমরা বুঝতাম না।
প্রচণ্ড এই দানবীয় তাণ্ডবের ভেতর কোভিড আমাদের যা দিয়ে গেছে তার একটি হলো প্রযুক্তিকে সামনে নিয়ে যাওয়া। এই দেশের কোটি কোটি মানুষকে প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান দিতে যে পরিমাণ সময় লাগত, সেটা যেন মুহূর্তেই আমাদের হয়ে গেছে। দশ বছরের কাজ এক বছরেই হয়ে গেছে। কীভাবে ভিডিও কনফারেন্স করতে হয়, সেটা একজন বুড়ো মানুষও শিখে ফেলেছেন- যা তাকে আগে কখনই করানো যেত না। ছোট শিশুটি আজকে যেভাবে অনলাইন ক্লাস করছে, এবং সেটা করতে গিয়ে যতগুলো টুলস সে শিখেছে – সেটা স্বাভাবিক সময়ে সম্ভব ছিল না। মানুষ অভিযোগ না করে, এডাপ্ট করছে। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! বাংলাদেশের মানুষ বাসা থেকে কাজ করা শিখে ফেলেছে!
বিষয়টা যদিও খুব প্রাথমিক অবস্থায়, তবু যে বাড়তি বাতাসটা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ পালে লেগেছে- সেটা বাংলাদেশকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। করোনার প্রভাব হয়তো আগামী বছরই কমে যাবে। কিন্তু তখন যদি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে না গিয়ে এটাকেই চালিয়ে নেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরো ত্বরিত গতি হবে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মানুষ যদি ঘরে বসেই কাজ করতে পারে, তাহলে ঢাকার ট্রাফিক অনেক বেশি সহনীয় হয়ে উঠবে। মানুষ আরো দক্ষ হবে। সময় বাঁচবে সব কাজে। এখন যেমন কোর্ট-কাচারিতে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট কাজ করতে শুরু করেছে, একইভাবে অন্যান্য সেবাকে যদি ডিজিটাল ফরম্যাটে নিয়ে আসা যায়, তাহলে মানুষকে অফিস থেকে অফিসে ঘুরে বেড়াতে হয় না। টেলিফোনে কিংবা ওয়েবেই কাজটা হয়ে যেতে পারে। আর সেটা যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের আরো বেশি অটোমেশন লাগবে। আশা করছি, সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।
পাঁচ.
বাসা থেকে কাজ করার যেমন উপকারিতা আছে, তার সঙ্গে কিছু বিড়ম্বনাও আছে। প্রথম যখন বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ তৈরি হলো, সবাই এটাকে একটা খুশির বিষয় হিসেবে নিয়েছিলেন। কারণ, তারা ভেবেছিলেন, অল্প কাজ করলেই হবে। যেমন কোভিড সময়ে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে যেন তাদের বাড়ির বাইরে খুব একটা যেতে না হয়। কিন্তু অসংখ্য মানুষকে দেখা গেছে, এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিয়মিত বাইরে বের হচ্ছেন, ক্যাফেতে যাচ্ছেন, কেউ কেউ ভ্রমণেও যাচ্ছেন। কর্মঘণ্টা এবং আউটপুট যে অনেক কমে গিয়েছে, সেটা নিশ্চিত! এটাকে সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেতন কাটতে হচ্ছে। এবং আগামী বছরটা জুড়েই যেহেতু এমন থাকবে, সে ক্ষেত্রে অনেকেরই আয় কমে যাবে।
বাসা থেকে কাজ করার সবচেয়ে বড় ঝক্কি হলো, সবার তো নিজের মতো আলাদা কক্ষ নেই। তাই যেখানে বসে কাজ করছেন, সেখানে অন্যরা চলে আসছেন। সে ক্ষেত্রে মিটিংয়ে আমরা পরিবারের সদস্যদের দেখতে পাই, যারা ক্যামেরা অব করে রাখেন, তারা পেছনের শব্দ, বাচ্চার কান্না, রান্নার শব্দ, স্ত্রীদের ধমক, বুয়ার চিৎকার, এবং আরো অনেক ব্যক্তিগত বিষয় বাইরে চলে আসতে শুরু করেছে। এটুকু মেনে নিতে পারলে বাসা থেকে কাজ করার সুবিধাটাই বেশি।
বাসা থেকে কাজ করার এমন একটি বিড়ম্বনার গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি।
বাসায় ডিএসএল লেগে যাওয়ার পর, আমি মাঝে মাঝে ওয়ার্কিং ফ্রম হোম করা শুরু করি। আমার অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক পাশের অ্যাপার্টমেন্টেই থাকতেন একজন সাদা আমেরিকান নারী, যিনি কাজ করতেন ইয়াহুতে। কাঠের বাড়ি, পাশাপাশি হলেও ওঠার সিঁড়ি ভিন্ন। তার সঙ্গে দেখা হয় উইকএন্ডে- লন্ড্রি রুমে, কাপড় ধুতে গিয়ে। তখন যেটুকু হাই-হ্যালো।
মেয়েটির বয় ফ্রেন্ড ছিল আফ্রিকান কালো সুদর্শন এক যুবক। আফ্রিকান যারা সুদর্শন হয়, তারা আসলেই খুব সুদর্শন। এর একটি কারণ হতে পারে, তারা নিজেদের প্রেজেন্ট করা শিখে ফেলেছে। বাকি আরেকটা গোষ্ঠী এখনো সেটা শিখতে পারেনি। কিংবা আর্থিক কারণে পেরে উঠছে না। আমেরিকাতে অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, সেটা নিশ্চই আপনারা জানেন।
শনিবার সকালটা ছিল আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের অনেকের জন্য খুবই রোমাঞ্চকর দিন। এর একটি বিশেষ কারণ হলো, মেয়েটির সেই কালো বয়ফ্রেন্ডটি শুক্রবার রাতেই মেয়েটির বাসায় চলে আসে। তারপর সকালে তারা প্রেমে মত্ত হয়। এবং তারা দুজনই এত শব্দ করেন, যা আশপাশের সবাই শুনতে পায়। তাদের উন্মাদনার পুরোটাই লাইভ। তাদের আনন্দ চিৎকার মাঝে মাঝে হলিউডের সিনেমাকেও হার মানায়।
আমি একদিন ওয়ার্কিং ফ্রম হোম করছি। প্রেমিক ছেলেটি যে অফিস ডে-তেও আসত, সেটা আমি বুঝতে পারিনি। সেদিন তারা অফিস টাইমেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর আমি তখন প্রেজেন্ট করছি অফিসের মিটিং। এখনকার মতো ল্যাপটপের সঙ্গে হেডফোন লাগিয়ে নয়, আমি জয়েন করেছি আইপিফোন দিয়ে, স্পিকারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের আনন্দ চিৎকার আমার স্পিকার হয়ে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক হয়ে ভারতের বেঙ্গালুরু পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
আমি কথা বলেই যাচ্ছি। আর মিটিং-এ কারো কারো হাসিও শুনতে পাচ্ছি। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি যদি মিউট করি, তাহলে তো আর কেউ আমাকেই শুনতে পাবে না। আমার বস বিষয়টি সহজ করার জন্য হাসতে হাসতে বললেন, ইস দিস কামিং ফ্রম ইয়োর এন্ড?
আমি নার্ভাস হয়ে বললাম, নো, ইট’স মাই নেইবর!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here