শিশুহত্যার নির্মমতা

18

একটা সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা অগ্রসর তার পরিমাপক কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, মানবিক প্রগতিও। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতটুকুই হোক সেটা যদি সুষম না হয় তাহলে সামগ্রিকভাবে মানবিক প্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে একদিকে যেমন মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে উন্নতির খবর পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি দ্রুততম সময়ে অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি আর দারিদ্র্য বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও পাওয়া যাচ্ছে; যা নিশ্চিতভাবেই দেশে চরম আয় বৈষম্য বাড়তে থাকারই পরিচায়ক। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনিবার্য সামাজিক অভিঘাত রয়েছে। সমাজে লাগামহীনভাবে গুম, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা ধরনের অপরাধ বাড়তে থাকা, সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া সম্ভবত এরই প্রতিফলন। এভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত মানবিক প্রগতি অর্জন থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে সমাজ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মানবিকতার এই পতন আর নৈতিকতার স্খলন আজ আমাদের এমন এক সময়ে হাজির করেছে যেখানে পিতা বা মাতা নিজ হাতেই খুন করছে শিশুসন্তানকে! এই নৃশংসতা এতটাই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, সংবাদ মাধ্যমে শিশুহত্যার শিরোনাম আর পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। নির্যাতনে নিহত শিশুর ভাইরাল-ছবি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে কষ্ট হয়। প্রশ্ন জাগে, যে দেশের মানুষ ‘ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু’ নিয়ে একুশের প্রভাতফেরির গান গেয়েছে, গানে গানে বলেছে ‘শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’ সেই দেশে কেন আজ শিশুহত্যার মহামারী চলছে?
উপরোক্ত পরিস্থিতি যে দেশের এক নির্মম সমাজ বাস্তবতার সাক্ষ্য দিচ্ছে তা সংবাদপত্রের কয়েকটি শিরোনাম দেখলেই বোঝা যাবে। ‘রোগাক্রান্ত হওয়ায় ১৫ দিনের ছেলেকে হত্যা বাবা-মায়ের!’, ‘‘সন্তান ‘কন্যা হওয়ায়’ আছড়ে হত্যা করলেন বাবা’’, ‘বাবা ও সৎ মায়ের বিরুদ্ধে দুই শিশুকে হত্যার অভিযোগ’, ‘৮ মাসের সন্তানকে গলাকেটে হত্যা, মা গ্রেপ্তার’, ‘ভাসুরকে ফাঁসাতে নিজ হাতে সন্তানকে হত্যা’, ‘গলাটিপে নিজের সন্তানকে হত্যা করলেন মা’ সবগুলো সংবাদ শিরোনামই চলতি বছরের। প্রথম চারটিই দেশ রূপান্তরের, বাকি দুটো অন্য সংবাদপত্রের। এমন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি না হলেও এই পরিস্থিতি যে ক্রমেই আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে সেটা অনুধাবন করা জরুরি। চলমান করোনা মহামারীতে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুহত্যার এই মহামারীও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম-বিএসএএফের বছরওয়ারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ফেলে আসা ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩৪টি শিশুর বেশি হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ২০৫টি শিশুহত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪১৮, এর আগের বছর ছিল ৩৩৯। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সব মিলিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে অন্ততপক্ষে দেড় হাজারেরও বেশি শিশু!
পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ ও ধর্ষণের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও ব্যক্তিরা বলছেন, শিশুহত্যার এই সংখ্যা ও ধরন মারাত্মক উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিচারহীনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও দারিদ্র্যের কারণে শিশুহত্যা বাড়ছে। আরও উদ্বেগজনক হলো সহিংসতার ধরন দিন দিন ভয়ংকর হচ্ছে। মানুষ আরও বেপরোয়া হচ্ছে, কোনো অপরাধ করতেই দ্বিধা করছে না। নির্মম এই অপরাধ কমাতে শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যায় দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং সেটা দৃশ্যমান করার ওপর জোর দিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু দেশের বিচারাঙ্গনে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তিতে স্থবিরতা করোনা মহামারীর কালে আরও বেড়ে গেছে। সর্বশেষ কোনো পরিসংখ্যান জানা না গেলেও ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮২টি। বিদ্যমান বাস্তবতায় শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তিতে আদালতের বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া এবং সেটা ত্বরান্বিত করতে সরকারের তরফ থেকে আন্তরিক সহায়তা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশ আজ শিশুহত্যার এক নির্মম মানবিক সংকটে উপনীত। এর মধ্যেই সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখে ‘কন্যা শিশু দিবস’ আর অক্টোবরের প্রথম সোমবার ‘বিশ্ব শিশু দিবস’ উদযাপিত হলো দেশে। এবার কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমরা সবাই সোচ্চার/বিশ্ব হবে সমতার’। আর বিশ্ব শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুর সাথে শিশুর তরে/বিশ্ব গড়ি নতুন করে’। কিন্তু দেশে শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যার মহামারী প্রতিরোধ করতে না পারলে এমন দিবস আর এমন প্রতিপাদ্য কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয় না?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here