অনুভূতিহীন আওয়ামী লীগ!

14

প্রভাষ আমিন
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী এবং বিশাল রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। শুধু নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া নয়, ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্বটাও দিয়েছিল আওয়ামী লীগই। একটি জাতির মানস গঠন এবং তাকে মুক্তির জন্য তৈরির কাজটা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর জাতির জনকের মূল প্লাটফরম ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বয়স এখন ৫২ বছর। এই ৫২ বছরে আওয়ামী লীগ যেমন অনেক নেতা তৈরি করেছে, তেমনি অনেকে আওয়ামী লীগ ছেড়েও গেছেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ভাসানী মাত্র ৮ বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠন করেছিলেন। ভাসানী ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ বিকশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। এখনও আওয়ামী লীগে সেই ধারাই বহমান। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ভাসানী বা প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এখন আওয়ামী লীগে ভুলে যাওয়া নাম। এখন আওয়ামী লীগ মানেই শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ মানেই শেখ হাসিনা। এর বাইরে ৭৫-এর পর সত্যিকার অর্থে আওয়ামী লীগকে অন্তরে ধারণ করেছেন, এমন ব্যক্তিদের তালিকা করলে, সবার ওপরে, আসলে অনেক ওপরে থাকবে একজনের নাম; তিনি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি, পিতার আদর্শের উত্তরসূরি। ১৯৭৫ সালের পর শত প্রলোভনেও খুনিদের সঙ্গে আপস করেননি জাতীয় চার নেতা। আর তার মূল্য দিতে হয়েছে তাদের জীবন দিয়ে। নিরাপদ কারাগারেও খুনিদের বুলেট যাদের খুঁজে নিয়েছিল, সেই চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারে যিনি ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি; তার সন্তান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। পিতা যেমন কখনও আপস করেননি, সন্তানও তেমনি। তবে সৈয়দ আশরাফ আর দশজন রাজনীতিবিদের মতো ছিলেন না। আসলে তিনি রাজনীতির মানুষই ছিলেন না। সৈয়দ আশরাফ বরাবরই উদাসী, ভাবুক, কবি প্রকৃতির। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এবং ৩ নভেম্বর তার পিতাসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর সৈয়দ আশরাফ লন্ডনে চলে যান। সেখানেই সংসার পাতেন, চলে তার নিভৃত জীবন। ৯৬ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা তাকে দেশে আনেন, রাজনীতিতে নামান, এমপি বানান, পরে বিমান প্রতিমন্ত্রীও বানান। কিন্তু এসবে তার মন লাগে না, তার উড়ু উড়ু মন। রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফের মন লাগে ১/১১-এর সময়।
৭৫-এর মতো আবার যখন আওয়ামী লীগ বিপদের মুখে, তখন শক্ত হাতে হাল ধরেন সৈয়দ আশরাফ। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পর বাইরে থাকা নেতারা যখন তাকে দল থেকে মাইনাস করতে নানান সংস্কার তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত, গ্রেফতার হওয়া নেতারা যখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা সব সাক্ষ্য দিচ্ছেন; তখন বুকভরা সাহস নিয়ে সৈয়দ আশরাফ দাঁড়িয়ে যান আরেক উন্নত শির জিল্লুর রহমানের পাশে। আবদুল জলিল গ্রেফতার হওয়ার পর দায়িত্ব পান ভারপ্রাপ্তসাধারণ সম্পাদকের। দল ও দেশের সেই কঠিন সময়ে উত্তাল নদী পেরুতে নৌকার হাল ধরেন দক্ষ মাঝির মতো। ২০০৮ সালে জনরায় নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। রেওয়াজ অনুযায়ী দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ পেলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু এমন সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ কখনও দেখেনি। এমন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও কেউ কস্মিনকালে দেখেনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাসায় ভিড়, এই তদবির, সেই তদবির। কাউকে কাজ করে দিয়ে, কাউকে মুখে আশ্বাস দিয়ে, তিন রকমের কালি দিয়ে তদবিরের কাগজে সই করে, কাউকে হাসি দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হয়। পার্টি অফিসে গেলে তার পেছনে সার্বক্ষণিক মিছিল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মানে মন্ত্রী, এমপি আর স্থানীয় নেতাদের রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, উন্নয়নের তদবির।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই সরকারি দলের উন্নয়নের অঙ্গীকার পৌঁছে যায় তৃণমূলে। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ সবার বাড়া ভাতে ছাই ঠেলে দিলেন। এতদিন পর দল ক্ষমতায় এসেছে, নেতারা পদ-পদবি পাবেন, কাজ পাবেন, টেন্ডার পাবেন। কিন্তু পাবেন কীভাবে, সৈয়দ আশরাফই তো হাওয়া। বেলা পর্যন্ত ঘুমান। ইচ্ছা হলে অফিসে যান, নইলে ফাইল ডেকে পাঠান। পার্টি অফিসে যান কালেভদ্রে।
মন্ত্রণালয়ের আমলারা তাকে পান না, নেতাকর্মীরা পান না, সাংবাদিকরা তাকে পান না; এমনকি শেখ হাসিনার ফোনও নাকি ধরতেন না তিনি। তার কথা ছিল, উন্নয়ন যা হওয়ার, তা সুষমভাবে হবে; তদবির লাগবে কেন? যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবি মিলবে, তদবির লাগবে কেন? কিন্তু এমন ঋষিপুরুষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যি আনফিট। আওয়ামী লীগের মতো পুরনো একটি দল; তৃণমূল পর্যন্ত যে দলের কর্মী; যে দলে ‘চান্দাবাজ-ধান্দাবাজ’, ত্যাগী-হাইব্রিড সব আছে; সে দল আসলে সৈয়দ আশরাফকে দিয়ে চালানো অসম্ভব। নেতাকর্মীদের অনেক ক্ষোভ ছিল তার ওপর। শেখ হাসিনার ভালোবাসার ঢাল তাকে আগলে রেখেছে সমসময়। এত ভালোবাসার পরও শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফকে বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাই তো প্রথমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে, পরে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাকে সরে যেতে হয়। সৈয়দ আশরাফ নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতির মানে নামিয়ে আনতে পারেননি। আবার বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিজের মানে তুলে আনতে পারেননি। জানি না, এ অভিমান থেকেই তিনি অকালে চলে গেলেন কিনা।
সৈয়দ আশরাফ আনফিট হলেও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের মতো দলের জন্য একদম পারফেক্ট। তিনি দিনভর পরিশ্রম করেন। নির্বাচনের আগে চষে বেড়িয়েছেন গোটা বাংলাদেশ। অসুস্থ শরীর নিয়েও ওবায়দুল কাদের সবচেয়ে সক্রিয়। তিনি দিনে ২/৩ বার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। আর সৈয়দ আশরাফ বলতেন বছরে ২/৩ বার। হাসিমুখে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় যখন তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম’, তখন আবেগের ঢেউ খেলে যায় সারা দেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এই নেতাকর্মীরা সৈয়দ আশরাফের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল, এটা যেমন সত্যি; আবার তারা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোও বাসতো। শুধু ১/১১-এর সময় নয়; আওয়ামী লীগ সরকারের বড় বিপদ এসেছিল ২০১৩ সালের ৫ মে। সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা নিয়ে কয়েক লাখ হেফাজত সমর্থক মতিঝিল শাপলা চত্বর দখলে নিয়েছিল। সৈয়দ আশরাফের সময়োপযোগী, দৃঢ় সিদ্ধান্তে প্রায় বিনা রক্তপাতে সেদিন তাদের মতিঝিল থেকে সরানো গিয়েছিল। আজ বাংলাদেশে যখন হেফাজত নামের সেই অশুভ শক্তি আবার আস্ফালন করছে, হামলা করছে বঙ্গবন্ধুর ওপর, বাংলাদেশের মৌলিক চেতনার ওপর; তখন সৈয়দ আশরাফের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।
অর্থ, বাড়ি, গাড়ি, বিলাসিতা, পদ, পদবি, ক্ষমতার তৃষ্ণা তার ছিল না। তার তৃষ্ণা ছিল জ্ঞানের। সৈয়দ আশরাফ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির একমাত্র উদাহরণ, ওয়ান পিস। তার মতো কাউকে অতীতে দেখিনি, নিকট ভবিষ্যতে দেখবো– তেমন আশাও করি না। আমি প্রবলভাবে একজন রাজনৈতিক মানুষ। আমি বিশ্বাস করি দেশকে এগিয়ে নিতে চাই বিশুদ্ধ রাজনীতি। সৈয়দ আশরাফ ছিলেন তেমনই একজন।

তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন ঋষিপুরুষ। তিনি যে আওয়ামী রাজনীতিতে আনফিট ছিলেন, তা প্রমাণ করতে আওয়ামী লীগের মাত্র দুই বছর লেগেছে। মৃত্যুর মাত্র দুই বছরের মধ্যে সৈয়দ আশরাফ আজ একজন ভুলে যাওয়া নাম। ৩ জানুয়ারি ছিল সৈয়দ আশরাফের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ যার কাছে নিছক রাজনৈতিক সংগঠন নয়, অনুভূতির নাম; তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সময় পাননি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউই। যে আওয়ামী লীগ সৈয়দ আশরাফের কাছে এক অনুভূতির নাম; হাইব্রিড, চাঁদাবাজ, ধান্দাবাজের দখলে চলে যাওয়া সেই আওয়ামী লীগ আজ এক অনুভূতিহীন দলের নাম।
লেখক : হেড অব নিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here