মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ : টোল হোক টেকসই হাতিয়ার

18

যেসব মহাসড়ক চার লেনে এবং ‘এক্সপ্রেসওয়ে’ বা ঝটিকাপথে উন্নীত হয়েছে, সেগুলোতে চলাচলকারী যানবাহন থেকে টোল আদায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে-জাতীয় একটি দৈনিকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু বিষয়টি ‘নতুন’ নয়। আমাদের মনে আছে, সর্বপ্রথম ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় মহাসড়কগুলোতে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে একনেকের আরও একাধিক সভায় বিষয়টি উঠেছে। সর্বসাম্প্রতিক ‘প্রস্তুতি’ তারই ধারাবাহিকতা। আমরা জানি, একসময় সড়ক ও সেতুমাত্রই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য হলেও এখন প্রায় সব বৃহৎ সেতুতে রয়েছে টোল ব্যবস্থা। রাজধানীর প্রথম উড়াল সড়ক উন্মুক্ত হলেও পরবর্তীগুলো এসেছে টোলের আওতায়। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর সড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একাংশ এবং ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের চলনবিল অংশে কয়েক বছর ধরেই টোল আদায় করা হচ্ছে। সম্প্রতি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও চালু হতে যাচ্ছে একই পদ্ধতি। আমরা এও জানি, বিদেশে মহাসড়কে টোল বিরল নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো দেশে সব জাতীয় মহাসড়ক ও একপ্রেসওয়েতে টোল ব্যবস্থা প্রবর্তন কি বাস্তবসম্মত?
অবশ্য এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য যে, সংশ্নিষ্ট মহাসড়কের সংস্কার ও উন্নয়নে টোল ব্যবস্থা থেকে উপার্জিত অর্থই ব্যয় করা উচিত। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই নির্বাহী পরিচালকের এই বক্তব্যও সঙ্গত যে- সড়ক ব্যবহারকারী অর্থ গুনবে না কেন? কিন্তু এই প্রশ্নও অসঙ্গত হতে পারে না যে, গাড়ির মালিকমাত্রই যেখানে প্রতিবছর ‘রোডট্যাক্স’ দিচ্ছে, সেখানে নতুন করে টোল নির্ধারণের অর্থ কী? আমরা আশা করি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টরা এসব বিবেচনা করবেন। এ ছাড়া সমকালের প্রতিবেদনে কয়েকটি মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্য যে টোলহার নির্ধারণ করা হয়েছে, তার যথার্থতাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে টোল সড়ক ব্যবহারের উপযুক্ত বিকল্পও রাখতে হবে বৈকি। টোলহীন সড়কও ব্যবহার করার স্বাধীনতা যাতে নাগরিকদের থাকে। অস্বীকার করা যাবে না যে, নতুন নির্মিত ও সংস্কারকৃত পুরাতন মহাসড়কগুলোর দুই পাশে টোলহীন ধীরগতির লেনও থাকছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি যেন এমন না হয়, টোলযুক্ত সড়ক যতটা নির্বিঘ্ন, টোলমুক্ত সড়ক ততটাই বিড়ম্বনাপূর্ণ। আমরা এও মনে করি, টোল ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ টেকসই করে তোলায় জোর দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সড়ক-মহাসড়ক সংস্কার কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্বের ঘাটতি নিছক আর্থিক বরাদ্দের জন্য নয়। আমরা দেখছি, প্রতিবছরই জাতীয় মহাসড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ হয়। কিন্তু সংস্কার শেষ না হতে হতেই ফের ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে। এতে করে কাজটি যেমন টেকসই হতে পারে না; তেমনই থাকে দুর্নীতিরও অবারিত সুযোগ। এক্ষেত্রে আমাদের বিনীত প্রশ্ন, মহাসড়কেটোল আদায় করে বরাদ্দের অপ্রতুলতা হয়তো কাটবে, বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহারের অভাব ঘুচবে কি? এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না, সড়ক-মহাসড়ক বিপর্যস্ত হওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি ওজনের মালামাল পরিবহন। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর উৎসমুখে ‘এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে সমাধান দিতে পারে। কিন্তু যদি সংস্কার ও নির্মাণ কাজে অনিয়ম রোধ করা না যায়, তাহলে সকলই গরল ভেল! টোলের অর্থ বছর বছর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের পকেট ভারী করার মাধ্যম যেন না হয়।
ভুলে যাওয়া চলবে না, মহাসড়কে টোল ব্যবস্থা চালু হলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। তাতে করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপে পড়বে সাধারণ নাগরিকরাই। নজর দিতে হবে টোল সড়কপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেও। সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। আমরা দেখেছি- দেশের অধিকাংশ জাতীয় মহাসড়কে পথে পথে বাজার ও ব্যবসাকেন্দ্র বসানোয় কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যায়নি; বরং বেড়েছে দুর্ঘটনার হার। টোল সড়কে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here