নতুন বছরে বিএনপির সরকার পতনের ‘গণঅভ্যুত্থান’?

16

“বিএনপির উচিত হবে, উজানে তরী না বেয়ে ভাটির জন্য অপেক্ষা করা। মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতির মাঠ আঁকড়ে থাকলে মানুষ নিশ্চয়ই সেটার মূল্যায়ন করবে।”

বিভুরঞ্জন সরকার
নতুন বছররের শুরুতেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসীকে সরকার পতনের গল্প শুনিয়েছেন। বলেছেন, ২০২১ সালেই বিএনপি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাবে। বিএনপি মহাসচিবের এই আশাবাদের বাস্তবভিত্তি কেউ দেখছেন বলে মনে হয় না। গত বছরের করোনার ধাক্কা নতুন বছরেও অব্যাহত আছে। করোনাভাইরাস থেকে বিশ্ববাসী কবে মুক্ত হবে সেটা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। একটা অনিশ্চয়তা সবাকেই তাড়া করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বরণ করার চেয়ে জীবন বাঁচানোর গরজ এখন মানুষের বেশি।
করোনায় প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভয়, আতঙ্ক মানুষের মন থেকে দূর হয়নি এখনো। করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে কবে আসবে, কবে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে, কবে মানুষের মুখে হাসি ফুটবে তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। তাছাড়া ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেই রাতারাতি সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলেও মনে হয় না। এ অবস্থায় সরকার পতনের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করা সম্ভব কি না, সে প্রশ্ন সামনে আসবে। নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তনের নিয়মতান্ত্রিক কোনো উপায় নেই। গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি হয়তো মনে করছে যে, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকাকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। সরকার বদলাতে হলে গণঅভ্যুত্থানই ভরসা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি চাইলেই কি দেশে গণঅভ্যুত্থান তৈরি হবে? কোনো দল বা অনেকগুলো দলের সমন্বয়ে গঠিত কোনো জোট বা জোটসমূহ চাইলেই কোনো দেশে গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে? আমাদের রাজনীতির অতীত অভিজ্ঞতা কি বলে?
কোনো দল বা নেতার নির্দেশে কোনো দেশেই গণঅভ্যুত্থান হয় না। গণঅভ্যুত্থানের জন্য বিশেষ পরিস্থিতি লাগে, মানুষের মনে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ থাকতে হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যও একটি গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পূর্বশর্ত। আস্থাভাজন, যোগ্য তথা বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্বও মানুষের সামনে দৃশ্যমান থাকতে হয়। কাকে ক্ষমতাচ্যুত করে মানুষ কাকে ক্ষমতায় বসাবে, সেটা গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ কথা বলা যায় না যে, খুব তাড়াতাড়ি দেশের মধ্যে একটি প্রবল আন্দোলন গড়ে ওঠার কোনো লক্ষণ আছে। তবে এটাও ঠিক যে, আকস্মিক কোনো ঘটনা থেকেও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার গঠনের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে । অর্থাৎ বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে আরও তিনি বছর। এর আগে অবশ্য শেখ হাসিনা তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবারই বিএনপি সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার খোয়াব দেখেছে। কিন্তু একবারও সফল হয়নি। বিএনপির স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই বিএনপির আন্দোলনের হাকডাকে মানুষের খুব একটা ভরসা আছে বলে মনে হয় না। মানুষ এতে আলোড়িতও হয় না। এমনকি বিএনপির কর্মীরাও এতে চাঙ্গা হয় না।
বিএনপির আন্দোলনের হুমকিতে সরকারও ভয় পায় না। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর মুরোদ বিএনপির নেই। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার দমনপীড়ন চালিয়ে বিএনপিকে মাঠে নামতে দেয় না। কোনো দেশে কোনো সরকারই বিরোধী দলের জন্য আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি করে দেয় না। বরং যে ইস্যুতেই আন্দোলন হোক না কেন, তা দমন করাটাই হয় সরকারের নীতি-কৌশল। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি, হয় না, হবে বলেও মনে হয় না। আন্দোলনে রাজনৈতিক শক্তির সক্ষমতা থাকতে হয়।
বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থেকে দলটি দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য কি করেছে কিংবা সাধারণ মানুষের কল্যাণেই বা দলটির ভূমিকা বা অবদান কি, সে সম্পর্কে মানুষের অভিজ্ঞতা আছে। আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শাসনও মানুষ দেখেছে, দেখছে। বিএনপির শাসনামল আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো ছিল সেটা খুব কম সংখ্যক মানুষই মনে করেন। তাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর গরজ মানুষের মধ্যে নেই। আর সেজন্যই বিএনপির আন্দোলনের ডাকে মানুষ সাড়া দেয় না।
আন্দোলনে বিএনপির সাফল্যের কোনো অতীত রেকর্ডও নেই। আওয়ামী লীগের শাসনে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবেশী অনেক দেশের চেয়ে ভালো। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা দূর হয়েছে। মানুষকে আর অনাহারে থাকতে হয় না। মোটা ভাত, মোটা কাপড় সবারই জুটছে। এসব কারণেই এক মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকা যায় না বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তারও পরিবর্তন ঘটেছে।
বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাধ্যমে গণরায় নিয়ে নয়, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গায়ের জোরে ক্ষমতায় আছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, মানুষ তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তলানিতে। বিএনপির এই সব অভিযোগ সবগুলো অস্বীকার করা যাবে না হয়তো। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব দেখেশুনে মানুষ কেন প্রতিবাদী হয়ে উঠছে না? ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য তো একসময় মানুষ আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে। তাহলে সেই মানুষ কেন ভোট নিয়ে বিতর্কের মুখেও এখন নীরবতা পালন করে? মানুষের মনোভাবে এই পরিবর্তন কেন ঘটলো, সেটা কি বিএনপি নেতৃত্ব খুব গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন? পায়ের তলায় মাটি না থাকলে কারো পক্ষে টানা ক্ষমতায় থাকা যে সম্ভব হয় না, সেটা বিএনপির ভালো জানার কথা।
মানুষ শুধু শুধু সরকার পরিবর্তন চায় না। মানুষ পরিবর্তন চায় ভালোর জন্য। গরম কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় কেউ পড়তে চায় না। আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির শাসন দেশের জন্য ভালো হবে এটা মনে না করার জন্যই বিএনপির আন্দোলনের ডাকে মানুষ সাড়া দেয় না। দেশে বিএনপির যেমন সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী আছে, তেমনি আওয়ামী লীগও এদেশের মাটি থেকেই গড়ে ওঠা দল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। বিএনপির মতো কোনো সামরিক শাসকের ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছাপূরণের জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে বর্ণনা করা হলে পাকিস্তানমনা মানুষেরা খুশি হলেও অন্যরা এটা মেনে নিতে পারে না।
আওয়ামী লীগের ত্রুটি-দুর্বলতা নিশ্চয়ই আছে কিন্তু সেটা বিএনপির চেয়ে বেশি হলে মানুষ এই দলের শাসন মেনে নিতো না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনায় তার ব্যক্তিগত দক্ষতা ও যোগ্যতার যে স্বাক্ষর রেখেছেন, তা-ও মানুষের বিবেচনায় আছে। তাই ‘কম গণতন্ত্র বেশি উন্নয়ন’-এর যে ধারণা কয়েক বছর থেকে সামনে আনা হচ্ছে, মানুষ তা খারিজ না করে পরীক্ষা করছে বলও মনে হয়।
বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। দলের নেতৃত্ব এখন বহুধা বিভক্ত। চেয়ারপারসন হিসেবে যখন খালেদা জিয়ার একক কর্তৃত্ব ছিল, খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা যখন গগনচুম্বী, তখনও কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে পেড়ে ওঠেনি বিএনপি। আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে কাবু করতে বারবারই ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। এমনকি জামায়াত-শিবিরের মতো সন্ত্রাসী শক্তির সমর্থন-সহযোগিতা নিয়ে হিংসাত্মক রাজনীতির পথে গিয়েও বিএনপি সাফল্য পায়নি। নানা বিপরীতমুখী রাজনৈতিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়েও বিএনপি পারেনি আওয়ামী লীগকে দুর্বল করতে। বরং রাজনীতির কৌশলের খেলায় শেখ হাসিনার কাছে হেবে গিয়ে খালেদা জিয়া এখন রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থানে আছেন।
বিএনপির ঘর এখন নড়বড়ে। দলের মধ্যে আছে বিভক্তি-কোন্দল। ঘর গুছিয়ে উঠতে পারছে না যে দল তারা কীভাবে ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য’ গড়ে তুলবে এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাবে তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। একাত্তরের পরাজিত সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক সংগঠনের ওপর ভর করে সাঁকো নাড়াতে গেলে সেটা বিএনপিকে নতুন বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দেশের ভেতর কাউকে বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ যে সরকার দেবে না সেটা বোঝার জন্য কারো রাজনৈতিক পণ্ডিত হওয়ার দরকার হবে না।
বিএনপির উচিত হবে, উজানে তরী না বেয়ে ভাটির জন্য অপেক্ষা করা। মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতির মাঠ আঁকড়ে থাকলে মানুষ নিশ্চয়ই সেটার মূল্যায়ন করবে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here