কিডনি আক্রান্ত মুক্তা এখন অন্য রোগীর পাশে

9

কল্যাণ রিপোর্ট : দূরারোগ্য কিডনি রোগে আক্রান্ত মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা মানুষটি এখন মানবতার আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি এখন অনেক অসহায়-দুস্থ কিডনি রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যাদের পক্ষে দুঃসাধ্য অর্থব্যয় অসম্ভব তাদেরকে তিনি নিজের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করছেন মানবতাময় মানুষটি।
এ মানুষটি হচ্ছে যশোর উপশহরের শেখ নজরুল ইসলাম ও জেবুন্নেসার ছোট মেয়ে নার্গিস পারভীন মুক্তা। বেড়ে ওঠা যশোরেই। যশোর উপশহর মহিলা কলেজের ছাত্রী থাকা অবস্থায়ই মুক্তার বিয়ে হয় শহরের সেই সময়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গণের পরিচিত মুখ রাশেদ সুলতান তপুর সাথে। এইচএমএম রোডের বাসিন্দা তপু তখন জাপানী সাহায্য সংস্থা জাইকার কর্মকর্তা। পরবর্তীতে স্বামীর চাকরিসূত্রে মুক্তা চলে যান ঢাকায়। সেই থেকে এখনও স্বামী আর নয় বছরের এক ছেলে নিয়ে ঢাকাতে বসবাস করছেন মুক্তা।
মুক্তার স্বামী রাশেদ সুলতান তপু জানান, ২০১২ সালের মাঝামাঝি মুক্তা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপসর্গ দেখা দেয় প্রচ- মাথাব্যথা আর উচ্চ রক্তচাপের। সম্ভব সব ধরনের ডাক্তার দেখানোর পরেও মুক্তা সুস্থ হচ্ছিলেন না বরং অসুস্থতা বেড়েই চলেছিল। তখন ডাক্তারের পরামর্শে একটা নিউরো অপারেশানও করানো হয়। কিন্তু তাতেও অবস্থার উন্নতি মেলে না। এক পর্যায়ে ডাক্তারেরা কোন কারণ খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন। উন্নত চিকিৎসার জন্যে মুক্তা তখন যান ভারতের কলকাতায়। সেখানেই ধরা পড়ে তার দুটি কিডনির ৯০ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানকার ডাক্তারেরাও খুব ভালো কোন উপায় দেখাতে পারলেন না।
এরপর ভারত থেকে ফিরে এসে এলোপ্যাথিক, হোমিও এমনকি আবার ভারতে গিয়ে স্টেম সেল চিকিৎসাও গ্রহণ করেন মুক্তা। কিন্তু তাতে উপকার তো হয়ই নি বরং দিন দিন অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় ২০১৬ সালে তার কিডনি পুরোপুরিই অকার্যকর হয়ে পড়ে। শুরু হয় ডায়ালাইসিস।
তপু আরও জানান, কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য মুক্তার নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি মিলেও যায়। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ সংকট। বিগত চার বছর ধরে প্রতিনিয়ত চিকিৎসার ভার বহন করতে গিয়ে পরিবারটি তখন একরকম নিঃস্ব। স্বামী তপু তখন চাকুরি ছেড়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা, যশোর জিলা স্কুলের ব্যাচমেট, মুক্তার বাবার বাড়ির আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা, তপুর তৎকালীন অফিসের সহযোগিতা- সবমিলিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের খরচ জোগাড় হয়। ছয় বছরের একমাত্র ছেলেকে দেশে রেখে মুক্তা আর তপু ভারতে চলে যান চিকিৎসার জন্যে। ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর সফল কিডনি প্রতিস্থাপন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন মুক্তা দম্পতি।
মুক্তা বলেন, নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাংলাদেশে অনেক দরিদ্র কিডনি রোগী আছে যারা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারেন না। তাদের পাশে দাঁড়ানো চিন্তা থেকেই নতুন জীবন পেয়ে গড়ে তুলি ফ্যাশন ভিত্তিক একটি ফেসবুক পেইজ- ‘মুক্তা’স ফ্যাশন’। ২০১৮ সালের শেষদিকে তৈরি করা এই পেইজের বর্তমান ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি। এই পেইজ থেকে মহিলাদের থ্রিপিস আর শাড়ি বিক্রির সিংহভাগই ব্যয় করি দরিদ্র অসহায় কিডনি রোগীদের জন্য। নিজেরাই দরিদ্র কিডনি রোগী খুঁজে বের করি। মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশনে গিয়ে খুঁজে বের করি প্রকৃত দরিদ্র রোগীদেরকে। কারও ডাক্তারের খরচ আবার কারও ওষুধ কিনে দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করার চেষ্টা করি।
মুক্তা বলেন- আমি তো বোনাস জীবন পেয়েছি। আমি নিজে ভুক্তভোগী হওয়ায় জানতে পেরেছি এই রোগের যন্ত্রণা কেমন। কত ব্যয়বহুল এই রোগের চিকিৎসা। আল্লাহ হয়তো কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে আমাকে মোটামুটি সুস্থ করেছেন কিন্তু এমন হাজারও মানুষ আছেন যারা একটু সহায়তার অভাবে নিদারুণ কষ্টের মাঝে জীবন কাটাচ্ছেন। আমি তাদের পাশে আমার ক্ষুদ্র সামর্থ দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি মাত্র।
মুক্তা শুরু খেকেই উন্নতমানের পোশাক সরবরাহ করে খুবই অল্প সময়ে বাংলাদেশের ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করা মহিলা উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়- ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মধ্যে মুক্তাই প্রথম আফটার সেলস সার্ভিস প্রদান শুরু করেন। এর মাধ্যমে ক্রেতার ক্রয় করা পণ্যে কোন ত্রুটি পাওয়া যায়, মুক্তা তা নিজ খরচেই পরিবর্তন করে দেন। বর্তমানে মহিলাদের ফ্যাশন ভিত্তিক ফেসবুক পেইজগুলোর মধ্যে মুক্তা’স ফ্যাশনের অবস্থান প্রথম দশটি পেইজের মধ্যে।
মুক্তা বলেন- মিরপুর এগারো নম্বরের ডেলটা হেলথ কেয়ার- যেখানে মুক্তার ডায়ালাইসিস করানো হতো- তাদের সাথে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি সত্যিকারের দুস্থ রোগী নির্বাচন করে দেবে। আল্লাহ যেন আমাকে সেই দিন দেন, যেদিন আমি একজন রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপনের সমস্ত খরচ বহন করতে পারব।
মুক্তা সবাইকে অনুরোধ করেছেন তার পেইজ থেকে একবার অন্তত ঘুরে আসার জন্য। আর সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন যেন তিনি নিজে সুস্থ থেকে অন্যকে সহযোগিতার কাজটি চালিয়ে যেতে পারেন। মুক্তার পেইজ লিংক-

www.facebook.com/muktasfashion001

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here