শুধু আওয়ামী লীগ নেতাদের পালাতে হবে না, রাজনীতিই পালিয়ে যাবে

19

“ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই যে কথাগুলো বলেছেন, এ কিন্তু নতুন কিছু নয়। দেশের মানুষের অজানা কিছু নয়। যদি কেউ ক্ষমতার কাচের ঘরে থাকেন তার পক্ষে হয়তো এ কথাগুলো জানা সম্ভব নয়। তবে দেশের সাধারণ মানুষ সবই জানে। আর এ অবস্থা শুধু নোয়াখালীতে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্ষমতাসীন দলের এ অবস্থা হওয়ার সব থেকে বড় কারণ এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না”

স্বদেশ রায়
‘বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, তারা বলেন অমুক নেতা, তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। এটাই হলো সত্য কথা।’ কথাগুলো বলেছেন নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের মির্জা। তার এই কথা ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এবং মানুষের মুখে মুখে। এর বড় কারণ, আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা একথা বলেছেন শুধু সে জন্য নয়। আব্দুল কাদের মির্জার আরেকটি পরিচয়ের জন্য তার কথাগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। যেহেতু তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। বাংলাদেশে শুধু নয়, পৃথিবীর সব দেশেই রাজনীতিতে পরিবারের একটি গুরুত্ব আছে। যখন কোনো পরিবার থেকে কেউ রাজনীতিতে একটি বড় অবস্থানে চলে যান, তখন তার পরিবারের অন্যদেরও গুরুত্ব বাড়ে। তা ছাড়া, গোটা পরিবারটি অনেক সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তখন পরিবারের অন্য কোনো রাজনৈতিক সদস্য কোনো কথা বললে তার কথার ওপর ওই পরিবারে যিনি রাজনীতিতে অনেক বড় পজিশনে আছেন, তারও একটা ছায়া পড়ে। যেমন এখানে কেউ কিন্তু বলছেন না আব্দুল কাদের মির্জা এ কথা বলেছেন। সবাই বলছেন, ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই এ কথা বলছেন।
তবে ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই যে কথাগুলো বলেছেন, এ কিন্তু নতুন কিছু নয়। দেশের মানুষের অজানা কিছু নয়। যদি কেউ ক্ষমতার কাচের ঘরে থাকেন তার পক্ষে হয়তো এ কথাগুলো জানা সম্ভব নয়। তবে দেশের সাধারণ মানুষ সবই জানে। আর এ অবস্থা শুধু নোয়াখালীতে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্ষমতাসীন দলের এ অবস্থা হওয়ার সব থেকে বড় কারণ এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। যে কারণে তারা যে কাজগুলো করছে, তা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যায় না। যেমন বৃহত্তর খুলনার একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় ওই এলাকার স্থানীয় সাংবাদিক ফোন করে বলেন, সেখানে যিনি প্রকৃত জনপ্রিয় নেতা তিনিও আওয়ামী লীগ করেন। তবে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। দলীয় মনোনয়ন যিনি পেয়েছেন তিনি মূলত সব আমলের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পান- এমন একজন স্থানীয় গুন্ডা প্রকৃতির লোক। তাকে পাস করানোর জন্য জেলার সর্বোচ্চ নেতা সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কারণ ওই গুন্ডাকে স্থানীয় মানুষ গ্রহণ করতে চায়নি। তখন আওয়ামী লীগের ওই সৎ ও জনপ্রিয় নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্বাচনের আগে তাকে গ্রেপ্তার করে শারীরিকভাবে চরম নির্যাতন করা হয়। এবং শেষ অবধি প্রশাসনের সহায়তায় নির্বাচনের ফল উল্টে ওই গুন্ডাকে পাস করানো হচ্ছে। ওই সাংবাদিককে তখন বলেছিলাম, সব ধরনের ডকুমেন্টস পেলে এটা নিউজ করতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ওই সাংবাদিক অপারগতা জানান। তিনি বলেন, নিউজ হলে তিনি এলাকায় থাকতে পারবেন না। তার যেকোনো ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
রাজনীতির পরিবেশ ও সাংবাদিকতার পরিবেশ যে এভাবে দেশে নষ্ট করা হচ্ছে, এটাও কিন্তু অজানা কোনো বিষয় নয়। আর এ কিন্তু সরকারি নীতিতে হচ্ছে না। কারণ, এই সরকারের আমলে সত্য কথা লিখে কেউ কোনো বিপদে পড়েনি। বরং সত্য কথা বললে, অন্য কোনো শক্তি বা রাষ্ট্রের কোনো বিভাগ খড়্গহস্ত হলে সরকারের উচ্চ মহল সেখানে প্রটেকশন দিয়েছে। অথচ স্থানীয় পর্যায়ে এই ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিককে ভীত করে তুলছেন সেখানকার স্থানীয় একশ্রেণির নেতা। এই নেতাদের ভেতর দুই ধরনের মানুষ দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ একসময়ে অত্যন্ত সৎ, জনদরদি নেতা ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার এই দীর্ঘ বারো বছরে তাদের চরিত্র বদলে গেছে। অন্য শ্রেণিটি হচ্ছে সমাজের কিছু অসৎ মানুষ এসে ভিড়েছে এদের দলে। আর তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনের একটি অংশের সহায়তায় এ কাজ করছে।
এই প্যান্ডামিক শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে ঢাকার বাইরে একটি জেলায় কাজের জন্য গিয়ে সেখানে রাত কাটাতে হয়েছিল। রাতে প্রশাসনের কয়েকজন দেখা করতে আসেন। তারা সবাই স্নেহাষ্পদ। তাদের ভেতর একজন বললেন, প্রশাসক হিসেবে নয়, সে ছোট ভাই হিসেবে সত্য কথা বলছে, এখানে কিন্তু আওয়ামী লীগ বলতে ওইভাবে কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই। এখানে প্রশাসনের লোকজনই আওয়ামী লীগ চালাচ্ছে। আর প্রশাসন যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বা যারা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে- এরা কেউই ওই অর্থে আওয়ামী লীগার নন। কাল যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতার থেকে চলে যায়, তাহলে সে মুহূর্ত থেকে তারা রঙ বদলে ফেলবে। আর প্রকৃত আওয়ামী লীগাররা এখন অনেকটা দূরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এমপি-মন্ত্রীরাও তাদের খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। এমপি-মন্ত্রীরা এমনি এলাকায়ও আসেন কম। কেউ কেউ আসেন হেলিকপ্টার নিয়ে। আবার ওই হেলিকপ্টারে চলে যান। তারা ওই ভাবে স্থানীয় বিষয়গুলো জানেন না। এর পরে তাদের কথার ভেতর দিয়ে আরো যে বিষয়টি বের হয়ে আসে তাহলো, বর্তমানে অনেক এমপি, মন্ত্রী ওইভাবে জনগণ বা স্থানীয় নেতাদের কথা ভাবেন না। কারণ, তারা মনে করেন শেখ হাসিনা যত দিন আছেন, তিনি যেকোনোভাবে হোক দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবেন। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নেতা বাংলাদেশে নেই। তা ছাড়া, তারা মনে করেন, শেখ হাসিনার আমলে যে উন্নয়ন হচ্ছে, এই উন্নয়নের কারণেই মানুষ তাদের ক্ষমতায় রাখবে।
ওবায়দুল কাদেরের ভাইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে এখন এসব ঘটনা ও কথাবার্তা মেলালে দেখা যায়, সবই মূলত একই ধরনের। স্থানীয় নেতৃত্বে একধরনের পরিবর্তন এসে গেছে। ত্যাগী রাজনীতিকরা দূরে সরে গেছেন। এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে এসেছে একধরনের দুর্বৃত্ত। আর তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের বড় নেতাদের সহায়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনের একাংশও তাদের সহায়তা করছে। আর তারা এগুলো করছে মূলত এই সাহসে যে শেখ হাসিনা তাদের যেকোনোভাবেই হোক ক্ষমতায় নিয়ে আসবেন। কারণ, দেশে এ মুহূর্তে শেখ হাসিনার থেকে জনপ্রিয় কোনো নেতা নেই। যে কথা ওবায়দুল কাদেরের ভাইও বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নোয়াখালীর মানুষজন বলে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এটা সত্য। কিন্তু আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। টাকা দিয়ে বড় বড় জনসভা করা, মিছিল করা কোনো ব্যাপার নয়।’ ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাইয়ের এই বক্তব্যের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষ এখন একমত। স্থানীয় পর্যায়ে এখন যারা নেতৃত্বে, তাদের একটি বড় অংশই মূলত প্রতিদিন শেখ হাসিনার ভোট কমান। যার আরো একটা ছোট উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে একদিন ফল কেনার জন্য শান্তিনগর কাঁচাবাজারের একটি ফলের দোকানে গেছি। সেখানে কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছেন। তাদের ভেতর থেকে একজন বলছেন, ‘অমুককে (নাম মনে নেই) যেন তাপস সাহেব এই এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে না নামান। সে নির্বাচনী প্রচারে নামলে তাপস সাহেবের ভোট কমবে। কারণ, সে এমপি রাশেদ খান মেনন মন্ত্রী থাকাকালে তার নাম ভাঙিয়ে এলাকায় যা করেছে, তাতে সে ভোট চাইলেই তাপস সাহেবের ক্ষতি হবে।’
স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বাস্তবে এভাবেই যেকোনো দল এবং ওই দলের মূল নেতার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়। এর মূল কারণ, বাস্তবে সাধারণ মানুষ বা স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের অবস্থান ইঁদুরের মতো। সে কখনো সিংহকে দেখে না। সে তার সামনের বিড়ালটিকে দেখেই মনে করে, এই হচ্ছে সিংহ। বাস্তবে ওয়ার্ডের নেতা, ইউনিয়নের নেতা, মহল্লার নেতা- তারাই সাধারণ মানুষের কাছে কোনো দল এবং ওই দলের মূল নেতার প্রতিমূর্তি। তাদের আচার-আচরণের ওপরই নির্ভর করে কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হবে না, সাধারণ মানুষ থেকে দূরে চলে যাবে। যখনই সাধারণ মানুষ কেউ অমুক রাজনৈতিক দল করে শুনলে ভয় পায়, তার কাছে এগিয়ে যায় না, তখনই বুঝতে হবে ওই দল মানুষের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। আর তার জন্য দায়ী থাকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা।

অন্যদিকে রাজনীতিতে আরেকটি বিষয় বদলে গেছে, যা সব রাজনৈতিক দলকে এখন বুঝতে হবে। দেশের বয়স পঞ্চাশ হতে চলেছে। এর ভেতর অনেকগুলো নতুন নতুন প্রজন্ম নানান ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা এখন আসলে রাজনৈতিক দলের কাছে কোয়ালিটি চায়। এখন বিরোধিতার রাজনীতি অর্থাৎ এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষ দিয়ে যাবে শুধু- এটা পছন্দ করে না। যেমন আওয়ামী লীগ স্থানীয় পর্যায়ে এত কিছু খারাপ করার পরেও কেন বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দাঁড়াতে পারছে না। তারা বলে, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের কারণে তারা দাঁড়াতে পারছেন না। এ কথা কিন্তু মোটেই সত্য নয়। আওয়ামী লীগবিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়, তাদেরকে দৌড়ের ওপর রাখার চেষ্টা করে, এটা সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা যে পরিমাপে করছে, তা জিয়াউর রহমানের আমলে বা ২০০১ এর পরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যা করা হয়েছিল, সে তুলনায় কি কিছুই? জিয়াউর রহমানের আমলে যে সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা করা হয়, ২০০১ এর পরে আওয়ামী লীগের যত এমপি হত্যা করা হয়- বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে তা করেনি। তারপরেও বিএনপি কেন সাংগঠনিকভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারছে না। এর মূল কারণ, বিএনপি নেতারা লেখালেখি, টক শো থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে ভাষণে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সমালোচনা করেন। তারা বলতে চান, এ কোনো উন্নয়ন নয়, এটা তারা চুরি করার জন্য করেছে। মানুষ চোখের সামনে উন্নয়ন দেখছে। তাই ওই উন্নয়নের সমালোচনা সে শুনতে চায় না। সে শুনতে চায় এর থেকে আরো ভালো করার কোনো পথ আছে কি না? এবং সেটা কীভাবে তারা করবে? বিএনপি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি ও তাঁর বক্তৃতা-বক্তব্য খেয়াল করলে দেখতে পাবে, আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে যে অবকাঠামো উন্নয়ন করেছিলেন, তার সমালোচনা কখনো করেননি বঙ্গবন্ধু। কারণ, সেগুলো মানুষের চোখের সামনে ছিল। মানুষ সে উন্নয়নের সুফল পাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু তাই সে উন্নয়নের কোনো সমালোচনা না করে তিনি তুলে ধরেছিলেন আইয়ুব খান পশ্চিম পাকিস্তানে যে উন্নয়ন করেছেন, সে তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে কত কম করেছেন। এবং তিনি কীভাবে ছয় দফা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের এই উন্নয়নবৈষম্য ঘোচাবেন, তার সুস্পষ্ট কর্মসূচি দিয়েছিলেন। তা ছাড়া, তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর ভাষণে, বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করতেন কীভাবে তাঁর দেশের মানুষের জন্য তিনি আরো বেশি উন্নয়ন করবেন। কীভাবে পাটের দাম আরো বেশি পাবে কৃষক। কোন পথে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাদের পড়াশুনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী আরো কম দামে কিনতে পারবে। কীভাবে সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আরো কম দামে পাবে। এসবের বিশদ ব্যাখ্যা তিনি দিতেন। তিনি তাঁর ভাষণে এমন সহজ ভাষায় বলতেন, আইয়ুব খানের সঙ্গে কি আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা আছে? তার ছেলের সঙ্গে কি আমার মেয়ে বিয়ে দেয়া নিয়ে কোনো ঝগড়া হয়েছে? না। তার সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। আমার বক্তব্য অতি সোজা, আমি আমার কৃষককে পাটের ন্যায্য দাম দেব। সরকারি দালালি এখানে সম্পূর্ণ বন্ধ করব। বঙ্গবন্ধুর কথা এমনি সহজ-সরল ও স্পষ্ট ছিল।
এর বিপরীতে এখন বিএনপি নেতাদের কথা শুনলে মনে হয় শেখ হাসিনা যেন তাদের ব্যক্তিগত শত্রু। তাদের সব ক্রোধ শেখ হাসিনার প্রতি। তাই তাঁর বিদ্যুৎ উৎপাদন খারাপ। তাঁর পদ্মা সেতু খারাপ। তাঁর ফোর লেন সড়ক খারাপ। এর বিপরীতে তারা কী করবেন, তা কিন্তু কেউ বলেন না। গত বারো বছরে তারা দেশের মানুষের সামনে একটা কিছু হাজির করতে পারেনি যে শেখ হাসিনা যা উন্নয়ন করেছেন সেটা যথেষ্ট নয়। তাদের হাতে এই পদ্ধতি ও এই কর্মসূচি আছে- এ দিয়ে তারা দেশের মানুষের জন্য এর থেকে আরো ভালো কিছু করবে। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে নানান ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে তারা কিন্তু বারো বছরে নিজেদের আরো ভালো হিসেবে উপস্থিত করতে পারেনি।
বিএনপির এই ব্যর্থতার পরেও বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী মনে করছেন, ওবায়দুল কাদেরের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা যা বলেছেন, তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের এমপিদের অনেক জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে হবে। আর মানুষ বিএনপিকে সেখানে বসাবে। বিএনপির এই চিন্তা সঠিক নয়। ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাইয়ের বক্তব্য সত্য, অনেক স্থানে আওয়ামী লীগের অনেক এমপি ও মন্ত্রী স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তার বিকল্প হিসেবে মানুষ বিএনপিকে বসাচ্ছে না। বরং মানুষ প্রতিদিনই রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে -রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের এই আচরণের কারণে। শুধু দূরে সরে যাচ্ছে না, তারা মনে করছে রাজনীতি তাদের এলাকা থেকে পালিয়ে যাক। এ কারণে ধরা যেতে পারে ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই তার এলাকার রাজনীতির কথা বলেছেন। তার ভেতর দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মানুষ কীভাবে নিচ্ছে, তার একটা ছবি এসেছে। বিএনপির অবস্থাও কিন্তু মেজর হাফিজ, শাহ্ মোয়াজ্জেমের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এসেছে। আবার এর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হলেও মানুষ নির্বাচনমুখী হচ্ছে না। তারা ভোটের অংশগ্রহণে ফিরছে না। তেমনি সরকারি দলের স্থানীয় নেতারা ফিরতে দিচ্ছেন না। এর ফলে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কাজ থেকে। এর ফল মোটেই ভালো নয়। বাস্তবে এটা দেশ থেকে রাজনীতি দূরে চলে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত। তাই এখন চিন্তার সময় এসেছে, শুধু কি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পালাতে হবে- না, রাজনীতিই পালিয়ে যাচ্ছে?
লেখক : সম্পাদক, সারাক্ষণ; দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here