বিদায় মিজানুর রহমান খান : এই হাসি অম্লান থাকুক

15

মোস্তফা হোসেইন
‘মোস্তফা ভাই, আপনার ডায়েরিটা ফেলে গেছেন, নিয়ে যাবেন এসে একবার।’নোটবুক (ডায়েরিটি) আনতে গিয়ে বললাম- আপনার টেবিলভর্তি বই ও টুকরো কাগজের ফাঁকে তাহলে নোটবুকটির অস্তিত্ব টিকে আছে। হা হা করে হেসে গম্ভীরতাকে হালকা করে দিলেন। বললেন, আমি হারিয়ে গেলেও এক টুকরো কাগজও হারাবে না, আর এটা তো বড় একটা ডায়েরি।
মাত্র কয়েক বছর আগে বলেছিলেন মিজানুর রহমান খান। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা, জাপানের ড. গিয়ালপো পেমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথম আলোর দেওয়া দাওয়াত খেতে আর গিয়ালপো পেমার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে। হাসতে হাসতে বলা এক টুকরো কথা আমাকে বড় ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে আজ। ভাবছি- হ্যাঁ, মিজানুর রহমান খান আপনার টুকরো কাগজগুলো থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণের কোনোটাই হারাবে না। অন্তত দশ বিশ কিংবা পঞ্চাশ বছরেও আপনাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে হবে আমাদের আইন-আদালত ও সংবিধান বিষয়ক সাংবাদিকদের। হয়তো বা আপনার জীবদ্দশাতেই যেভাবে আদালতেও আপনার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে, আগামীতেও তেমনি হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, বড় শূন্যতা তৈরি হয়ে গেলো সাংবাদিকতার এই ক্ষেত্রটিতে।
আপনার সাংবাদিকতার তারুণ্যটা দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আজকে যারা মিজানুর রহমান খানকে আইন-আদালত-সংবিধান বিষয়ে তারকা সাংবাদিক হিসেবে জানেন, তারা অনেকেই জানেন না মিজানুর রহমান আসলে পড়–য়া এবং কঠোর অধ্যবসায়ী সাংবাদিক ছিলেন সবার আগে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় বাংলাবাজার পত্রিকা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে। একদল তরুণকে দেখা গিয়েছিল সেই পত্রিকায় নিজেদের উজাড় করে দিতে। মিজানুর রহমান খান ছিলেন তাদের অন্যতম। ওই সময় একটা ঘটনায় মালিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই সময় তাকে এত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে দেখেছি, তা আজও আমাকে ভাবিয়ে তোলে।
পরবর্তী সময় দৈনিক মুক্তকণ্ঠে তার সঙ্গে আবার কাজ করার সুযোগ হয়। তখন তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছিলেন। দিনশেষে ধীর পায়ে অফিসে প্রবেশকালে স্পষ্ট মনে হতো দেহের ভার সইতে পারছিলেন না যেন। আমার মনে হতো, আসলে সারা দিন যা মাথায় ঢুকিয়েছেন সেই ভার বহনে কষ্ট হচ্ছে যেন। তারপর তিনি যা স্লিপপ্যাডে লিখতেন তা পত্রিকার গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিতো। আর সেই গুরুত্ব বাড়ানোটাই ছিল তার নেশা। যে কারণে তাকে দেখা যেতো পুরো স্লিপ লেখা শেষ হওয়ার পর সেটা বাদ দিয়ে আবার লিখছেন। মাঝখানে ফোনে তথ্য যাচাই করছেন, এবং প্রুফ সেকশন থেকে কপি এনে আবার সেটা সম্পাদনা করছেন। একটা সিঙ্গেল কলামের সংবাদের ক্ষেত্রেও তার ঘষামাজা এভাবেই চলতো। যে কারণে রিপোর্টারদের প্রায় সবাই অফিস ছাড়লেও তাকে দেখা যেতো সন্তোষ গুপ্তের মতো টেবিলে মাথা নুইয়ে প্রুফ কপিতে সংশোধন করছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অসামান্য তথ্য- আমেরিকার গোপন দলিল প্রথম আলোতে ধারাবাহিক প্রকাশের পর বুঝতে পেরেছিলাম, আসলে পররাষ্ট্র বিষয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসু মানসিকতাই তাকে সেদিকে নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো আগের সেই অভিজ্ঞতাই তাকে সহযোগিতাও করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অসাধারণ তথ্য প্রকাশে। প্রথম আলোয় ধারাবাহিক প্রকাশিত তথ্যগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে বইও প্রকাশিত হয়েছে। যা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষকদের কাজে রেফারেন্স হিসেবে সমাদৃত।
গণমাধ্যমে আইন-বিচার ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে গত ৩০/৪০ বছরের মধ্যে গাজী শামসুর রহমানের পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম মিজানুর রহমান খান, এ নিয়ে বোধ করি কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। এই বিষয়ে তার উচ্চাবস্থা প্রমাণে আদালত পর্যালোচনাতেও দেখা যায়। সাধারণত বিচার ও বিচারালয় নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সাংবাদিকই জড়তায় ভোগেন। কখন যে আদালত অবমাননা হয়ে যায়, কোথায় কোন ত্রুটি হয়ে যায় এমন দ্বিধা কাজ করে বলেই সাধারণত এমনটা হয়। বলতে দ্বিধা নেই, সাংবাদিকদের এসব বিষয়ে শিক্ষাস্বল্পতাই এই দুর্বলতার বড় কারণ। সেক্ষেত্রে আইন-আদালত বিষয়ের সাংবাদিকদের একতরফা দোষও দেওয়া যায় না। কারণ, বিষয়ভিত্তিক সাংবাদিকতার পেশাগত নিরাপত্তার অভাব। কিন্তু মিজানুর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি যখনই যে বিষয়ে কাজ করেছেন, তার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই বিষয়ে লেখাপড়া করতেন। যা হয়তো অন্য সবার ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না।
তাঁর অনেক সাহসী লেখা আছে, এই মুহূর্তে স্পিকার ও বিচারপতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তিনি যে সাহসী লেখা আমাদের উপহার দিয়েছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় নিয়ে তিনি যে বিশ্লেষণ করেছিলেন, তার তুলনা কঠিন। সংবিধান বিষয়ে তাঁর লেখাপড়ার গভীরতা নিয়ে অনেকে একমত হবেন। একবার একটা লেখায় দেখেছিলাম, তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন সংবিধানের অন্তত অর্ধডজন অনুচ্ছেদ আপনাআপনি অকার্যকর ও অবৈধ হয়ে আছে। সংবিধান প্রণয়নের ৪৯ বছরের মধ্যেও বিষয়গুলো অখ্যাত থেকে যায়, তাবৎ বাঘা বাঘা আইনপ্রণেতার স্পর্শ পেয়েও। যা কিনা গণমাধ্যমকর্মীর চোখে পড়ে যায়। আর তিনি সেগুলো স্পষ্টত দেখিয়েও দেন।
আসলে এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে অসঙ্গতিগুলো দেখানোর মতো সাহস খুব কম সাংবাদিকেরই আছে। মিজানুর রহমান খানের বিদায়ে সেই কমটা আরও কমে গেলো। এই শূন্যতা কবে যে পূরণ হবে আল্লাহ জানেন।
করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার মুহূর্তে মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে শেষ দেখা হয় ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামের বাসায়। আমার অনুরোধে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সাহেব দেয়ালে টানানো ঐতিহাসিক ছবিগুলো সম্পর্কে আমাকে অবহিত করছিলেন। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত সময়ের ঐতিহাসিক ছবির সমাহার। সন্ধ্যার পর ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় ঢুকলেন মিজানুর রহমান। মুচকি হাসিতে দু’জনের আলাপ শেষ হয়েছে, এটা হয়তো ব্যারিস্টার সাহেবের চোখে পড়েনি। তিনি মিজানুর রহমানকে আমার সম্পর্কে বললেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কাজ করেন, একজন লেখক। মিজানুর রহমান খান স্বভাবসুলভ হাসি হাসলেন। তবে পরিবেশগত কারণে হা হা শব্দটা আগের মতো জোরালো ছিল না। ব্যারিস্টার সাহেবকে বললেন, তিনি আমার ঘনিষ্ঠ মানুষ। কয়েকটি পত্রিকায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি।
সেই হাসিটা যে শেষ হাসি হবে ভাবতে পারিনি। দুনিয়ার এই হাসি যেন ওপারেও অশ্লান থাকে প্রার্থনা করি।
লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here