স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সংকট

0
7

“মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একমাত্র গণ্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ভাবতে হবে বৃহত্তর জনগণের মধ্যে বিরাজমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্যারাডাইম শিফট না হলে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয় সম্ভব নয়। বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় আবার সব তছনছ করে দিতে পারে। জেলা থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের নীতি-নৈতিকতা ও ভাবমূর্তি রক্ষা করে আদর্শের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার কোনো বিকল্প নেই”

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
দেখতে দেখতে ৫০টি বছর পেরিয়ে গেল। একাত্তরের কথা মনে এলে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। এখন যা দেখছি তার সঙ্গে কোনো হিসাব মেলে না। যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পেরিয়ে যাওয়া পঞ্চাশ বছর, সময়ের বাঁকে বাঁকে দেশ কেমন ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা কেমন ছিল, কেমন আছে- এসব কথা মনে এলে দুঃখ আর বেদনাই শুধু ভর করে, অন্যকিছু দেখি না। স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা পৃথিবীর কোনো দেশেই কখনো অনুগ্রহের পাত্র হয় না, হতে হয়নি। যাক সেসব কথা। সব ভুলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের উৎসব দেখার সৌভাগ্যে উদ্বেলিত হলেও পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পথ ধরে নবজীবনপ্রাপ্ত একাত্তরের পরাজিত জামায়াত, মুসলিম লীগ এবং ঘাতক-দালাল গোষ্ঠীর উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক বিস্তৃতি ও আস্ফালন দেখে স্বস্তিতে বলতে পারছি না যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শসংবলিত বাংলাদেশ আজ সম্পূর্ণ নিরাপদ। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বিশাল সম্ভাবনার হাতছানির সঙ্গে চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনার অপর পিঠ হিসেবে দেখতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু সংকটের জায়গাগুলো সম্পর্কে আমরা কতখানি উপলব্ধি করতে পারছি, সেই প্রশ্নটিই আজ মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই বছরের শুরুতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সংকট প্রসঙ্গে একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরতে চাই। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ মর্যাদাশীল এবং সমৃদ্ধির পথে অগ্রগামী একটা দেশ। পৃথিবীর প্রায় দুই শ রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনামূলকভাবে গত ১০-১২ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতির গতিমাত্রা ঈর্ষণীয়। বর্তমান বিশ্বের চালিকাশক্তি, প্রযুক্তি খাতে বিপ্লবীয় অগ্রগতি ঘটেছে। প্রায় ১০ কোটি ইন্টারনেট এবং ১৬ কোটি মোবাইল ফোন বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা আজ যেখানে পৌঁছেছে, তা যদি না হতো তাহলে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম, বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য, বৈদেশিক সংযোগ এবং মিডিয়ার কর্মকাণ্ড একেবারে অচল ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ত। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল আদান-প্রদান, ই-কমার্স এবং অনলাইন ক্রয়-বিক্রয় বাংলাদেশকে সচল রেখেছে শুধু নয়, ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে ধরে রেখেছে, যেখানে চীন-ভারতের মতো দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। শেখ হাসিনার অসীম ধৈর্যের পরিচয়ে কখনো কখনো আশ্চর্য হলেও ধৈর্যের সঙ্গে দৃঢ়তা ও বুদ্ধিদীপ্ত বিচক্ষণতা আজকে শেখ হাসিনাকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের মর্যাদা দিয়েছে। ২০২১-২২ সালে অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটা বিপ্লবীয় পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠবে। দেশের অভ্যন্তর থেকে একটি রাজনৈতিক এবং সুশীল পক্ষের ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মহাচ্যালেঞ্জের সব জাল ভেদ করে পদ্মা সেতুর পুরোটাই এখন দৃশ্যমান, যান চলাচল শুরু হবে এ বছরের মধ্যে। বিশাল জাতীয় অর্জন। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের সঙ্গে দেশের একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের ঘোঁট পাকানো, এটিকে পাশে রেখে কিছু মিডিয়া, তার সঙ্গে চিহ্নিত, সুপরিচিত সুশীল পরিচয়ের কিছু ব্যক্তির তখন আদা-জল খেয়ে মাঠে নামার চিত্র, যাতে পদ্মা সেতু না হয়, এই জায়গাটির গভীর বিশ্লেষণে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মূল সংকটটি কোথায় এবং তা কত গভীর। পদ্মা সেতুর সঙ্গে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণ, ঢাকার মেট্রোরেল, উড়ালপথ, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরসহ মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ২০২১-২২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হলে তার প্রভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি যেভাবে বৃদ্ধি পাবে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থাসমূহের পূর্বাভাস অনুযায়ী বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৮তম অর্থনীতির দেশ হওয়ার সম্ভাবনা আরো প্রশস্ত এবং উজ্জ্বলতর হবে। এগুলোর কোনোটাই চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। তবে বিগত দিনের মতো সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব হবে না, যদি বিদ্যমান সংকটের বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়। সামনের দিনের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট বাংলাদেশের রাজনীতিতে। রাজনৈতিক সংকটকে উপেক্ষা করা হলে একসময়ে সেটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশকে কীভাবে বিধ্বস্ত করতে পারে তার উদাহরণ লিবিয়া, সিরিয়া ও ইরাক। এই তিনটি দেশই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটকে উপেক্ষা করার কারণেই তিনটি দেশই আজ ধ্বংসস্তূপ ও বিরানভূমি, হাহাকারে পরিপূর্ণ। গত ৫০ বছরে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শ, অর্থাৎ উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে। এর বিপরীতে ১৯৭৫ সালের পর দুই সামরিক শাসক ও তাদের উত্তরসূরিদের রাজনীতি, যা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত, সেই রাজনীতি দেশকে কতখানি অন্ধকারে নিক্ষেপিত করতে পারে, পশ্চাৎপদতার দিকে টানতে পারে, তার চিত্র এখন সবার সামনে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার ফল ও পরিণতির দিকে তাকিয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে বিচার করলেই সবাই সেটা উপলব্ধি করবেন। কিন্তু সংকট হলো, আমরা কি নিশ্চিত হয়ে আজ বলতে পারছি, সে রকম অন্ধকার ও পশ্চাৎপদতার রাজনীতি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ওপর আর কখনো চেপে বসবে না। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ। জনসংখ্যার রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্র অনুযায়ী যে সংখ্যাটি এখনো ওই পশ্চাৎপদ রাজনীতির পক্ষে, তার সঙ্গে ওই সুপরিচিত এবং চিহ্নিত মিডিয়া ও সুশীল ব্যক্তিবর্গ, যাদের কথা পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি, এই সম্মিলিত পক্ষ রাজনৈতিকভাবে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে মেরুকরণগত ওই জনসংখ্যাটি নির্বাচনে পরিবর্তন ঘটাতে পারাটা অসম্ভব নয়। তারা এই আশায়ই বসে আছে। যে দেশে গণহত্যাকারী মতিউর রহমান নিজামীর মতো যুদ্ধাপরাধী নির্বাচনে জয়ী হতে পারে, সে দেশে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় উন্মাদনায় কাতর পশ্চাৎপদতার রাজনীতি বজায় থাকা পর্যন্ত কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু দেশের শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষকে পক্ষে আনতে পেরেছিলেন বলেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মীয় উন্মাদনার পশ্চাৎপদ রাজনীতির বিরুদ্ধে আরেকটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয় বাংলাদেশের জন্য আজ অত্যন্ত জরুরি। এই রাজনৈতিক বিজয় অর্জনের একমাত্র ভরসার দল আওয়ামী লীগ এবং তার নেত্রী বঙ্গবন্ধুর মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার একক জনপ্রিয়তা আজ অনন্য শীর্ষে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য লিডারশিপের মধ্যে তিনি অন্যতম। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের দেশে একজন ব্যক্তির ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দলের জেলা পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে দলীয় সাংগঠনিক শক্তি যদি বলবান ও বিস্তৃত হওয়ার বদলে খর্ব হতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটিকে সংকট হিসেবেই দেখতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই, নোয়াখালী জেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার একটি কথা সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তার কথার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের একটা দুর্বল চিত্রই ফুটে উঠেছে। তিনি যা বলছেন তার চেয়ে সেটি সামাজিক মাধ্যমে কেন ভাইরাল হলো, তার তাৎপর্যটি অনুধাবন করা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি তখনই দেখা যায়, যখন সংকট প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতির কথা সবারই স্মরণে আছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটা উদাহরণ দিই। ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছর তুরস্কে ক্ষমতায় আছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, যার নেতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাইয়েপ এরদোয়ান। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এরদোয়ানকে উৎখাত করার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। অনেকে মনে করেন, ওই অভ্যুত্থান-চেষ্টার পেছনে আমেরিকার হাত ছিল কিন্তু অভ্যুত্থান সফল হয়নি, বরং এরদোয়ানের জন্য সেটা শাপে বর হয়েছে। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার কারণ, রাতে সামরিক অভ্যুত্থান দৃশ্যমান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী আঙ্কারাসহ বড় বড় সব শহরে এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ নেতা-কর্মী রাস্তায় এসে সামরিক বাহিনীর ট্যাংক ও কামানের সামনে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, রাস্তার ওপর শুয়ে পড়ে। তার ফলেই সামরিক বাহিনীর ভেতরে এরদোয়ানের অনুগত পক্ষ পাল্টা অভিযান চালিয়ে অভ্যুত্থান-চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়।
বাংলাদেশের কথায় ফিরে আসি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একমাত্র গণ্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ভাবতে হবে বৃহত্তর জনগণের মধ্যে বিরাজমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্যারাডাইম শিফট না হলে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয় সম্ভব নয়। বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় আবার সব তছনছ করে দিতে পারে। জেলা থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের নীতি-নৈতিকতা ও ভাবমূর্তি রক্ষা করে আদর্শের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সংকট কাটিয়ে একাত্তরের মতো আরেকটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য একান্ত প্রয়োজন। সেটা হলে বাংলাদেশ আর কখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন ও পশ্চাৎপদতার কবলে পড়বে না।
লেখক : গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY