ভ্যাকসিন-ভ্রান্তি

9

ড. তৌফিক জোয়ার্দার
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, এই একবিংশ শতাব্দীতেও কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে পৃথিবী গোলাকার নয়, বরং সমতল। এদের বলা হয় ‘ফ্ল্যাট-আর্থার’। উন্নত বিশ্বে এমন আরেকটি গোষ্ঠী আছে, যারা ভ্যাকসিনকে একটি সম্প্রসারিত ধাপ্পাবাজি (বষধনড়ৎধঃব যড়ধী) বলে মনে করে। এদের বলা হয় ‘অ্যান্টি-ভ্যাকসার্স’। এদের বদৌলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অনেক দেশেই জনগণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ টিকা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে এসব প্রবণতা এতদিন তেমন দেখা যায়নি, যার প্রমাণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে হামের টিকা গ্রহণের হার ৯০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯১ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ৯৭ শতাংশ। কিন্তু কোভিড-১৯-এর টিকা সম্প্রতি বাংলাদেশে আসার পর থেকে পাশ্চাত্যের অ্যান্টি ভ্যাকসারদের অনুকরণে এ দেশেও কিছু মানুষ বুঝে না বুঝে অথবা বেশি বুঝে এর বিরোধিতা করছেন। এ বিষয়ে ভুল ভাঙাতে, বৈশ্বিক এবং দেশীয় প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতামূলক আলোচনা তুলে ধরছি।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯-এর টিকা নিয়ে যে ভুল ধারণাগুলো এখন তুঙ্গে, সেগুলো হলো
১) কোভিড-১৯-এর টিকা অল্প সময়ে তৈরি হওয়ায় এবং তড়িঘড়ি করে তার অনুমোদন দেওয়ায়, এগুলো নিরাপদ নয়।
২) টিকা কেবল বাণিজ্যিক লাভের কথা চিন্তা করেই তৈরি করা হয়েছে, এবং অতীতের অসংখ্য রোগের মতো কোভিড-১৯’ও নিজ থেকেই, অর্থাৎ টিকা ছাড়াই বিদায় নেবে।
৩) এমন টেকনোলজি দিয়ে টিকা তৈরি হয়েছে যা মানুষের শরীরে ঢুকে মানুষের জেনেটিক গঠনকে পরিবর্তন করে দেবে, মানুষ আর মানুষ থাকবে না।
এসবের বাইরেও অনেক আজগুবি আলোচনা আছে, যেমন বিল গেটস ইচ্ছাকৃতভাবে কোভিড-১৯ ভাইরাস তৈরি করেছেন পরে টিকা বিক্রি করার জন্য, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস তৈরি করেছে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এবং যে টিকা দেওয়া হবে তা চীনের ফাইভ-জি টেকনোলজির মাধ্যমে মানুষের শারীরবৃত্তকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলমাত্র ইত্যাদি। শেষের এই আজগুবি ষড়যন্ত্র-তত্ত্বগুলো সঙ্গত কারণেই উপেক্ষা করছি, তবে উপরের তিনটি প্রশ্নের বিজ্ঞানভিত্তিক উত্তর এখানে দিচ্ছি।
অনেক ভ্যাকসিনের তুলনায় কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন কম সময়ে তৈরি হলেও করোনাভাইরাস বিষয়ক গবেষণা সেই ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় থেকেই জারি আছে। কারণ, সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। অতীতে ভ্যাকসিনোলজির অনেক আধুনিক টেকনোলজি আবিষ্কার হয়নি, যা বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে এবং ভ্যাকসিন তৈরির সময়কে ব্যাপকভাবে কমিয়ে এনেছে। আগে যেখানে জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে মাসের পর মাস এমনকি বছর গড়িয়ে যেত, ২০১৯-এর ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে চীনা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পরিপূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং শেয়ার করে। তাছাড়া ভ্যাকসিন তৈরির তিনটি ট্রায়াল ফেইজকে যুগপৎভাবে সম্পন্ন করায় এবং রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু নিয়ম-কানুন শিথিল এবং ত্বরান্বিত করায় টিকা তৈরি করতে কম সময় লেগেছে। কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেন না থাকে তার জন্য তৃতীয় ফেইজের ট্রায়াল সম্পন্ন করে, যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষকদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম নিরীক্ষা করে তবেই এগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এটা সম্ভব হয়েছে বিশ্বের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, যেহেতু তারা আর সবকিছু বাদ দিয়ে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন কেবল কোভিড-১৯-এর উপাত্ত বিশ্লেষণে। এসব কিছুর পর যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক একটি ভ্যাকসিন অনুমোদন লাভ করে, তখন আর এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয়ের কারণ থাকতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনও ভ্যাকসিন আপনাদের হাত পর্যন্ত এসে পৌঁছাবে না।
দ্বিতীয় ভ্রান্ত মতামতটির খণ্ডন হলো, যদিও ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়, তবু ভ্যাকসিন ছাড়াও তাদের প্রচুর ওষুধ বাজারে আছে, যেগুলো তাদের ব্যবসার মেরুদণ্ড। কাজেই তারা একটি ভুয়া ভ্যাকসিন বানিয়ে নিজেদের প্রতি জনগণের আস্থাকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করাটা কষ্টকল্পনা, বিশেষ করে যখন অসংখ্য স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীর তীক্ষè দৃষ্টি প্রত্যেকটি ভ্যাকসিনের প্রতিটি খুঁটিনাটির প্রতি প্রতিনিয়ত নিবদ্ধ আছে। ভ্যাকসিন না নিলেও যে শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় সে কথা সত্য, কিন্তু সেসব অ্যান্টিবডি শরীরে কতদিন থাকে তা নির্দিষ্ট নয়। তা মানুষ থেকে মানুষে তারতম্য হয়, যা কী পরিমাণ ভাইরাস দ্বারা শরীর আক্রান্ত হয়েছিল তা-সহ আরও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। পক্ষান্তরে, ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ডোজে, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত পরিমিত পরিমাণে মানব শরীরে প্রয়োগ করা হয়, যাতে তা দীর্ঘদিন মানুষকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। একেকটি কোম্পানির ভ্যাকসিন কয়েক হাজার মানুষের শরীরে পরীক্ষিত হয়েই তবে আপনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।
তৃতীয় মতটির খণ্ডন হলো, এমআরএনএ হলো মেসেঞ্জার আরএনএ-র সংক্ষিপ্ত রূপ, আর কোন আরএনএ মানুষের শরীরের জেনেটিক গঠনকে পরিবর্তন করতে পারে না। ডিএনএ পারতে পারে, তাও সুনির্দিষ্ট কিছু শর্তে এবং পরিস্থিতিতে। যে ভ্যাকসিনগুলো এখন পর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে, যথা ফাইজার-বায়োনটেক, মডার্না, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, এদের কোনোটিই ডিএনএ-ভিত্তিক ভ্যাকসিন নয়। প্রথম দুটি এমআরএনএ-ভিত্তিক এবং তৃতীয়টি, যেটি বাংলাদেশে আসছে, মৃত অ্যাডেনোভাইরাসের (সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস) ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতকৃত। কাজেই বাংলাদেশিদের এ নিয়ে চিন্তাভাবনারই কোনও অবকাশ নেই।
এবার আসছি দেশীয় প্রেক্ষাপটে যে বিভ্রান্তিমূলক আলাপ আলোচনা বাজার চলতি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে :
১) ভারত থেকে আসা টিকাগুলোর গুণগত মান প্রশ্নসাপেক্ষ। ২) টিকা নিলে লিঙ্গ পরিবর্তিত হয়ে যাবে বলে একজন প্রখ্যাত ইসলামি বক্তা তার ওয়াজে উল্লেখ করেছেন। তিনি সবক’টি ভ্যাকসিনের পেছনে ইসলামবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
৩) ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও অনেকের কোভিড-১৯ ধরা পড়েছে এবং অনেকের মধ্যে ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে।
প্রথম প্রশ্নটির জবাব হলো, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য বিশেষ ধরনের কারখানা দরকার। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ফর্মুলা ব্যবহার করে ভ্যাকসিন উৎপাদন করে বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ভ্যাকসিনটি ভারতের মাটিতে উৎপাদিত হলেও তা ভারতীয় ভ্যাকসিন নয়। ভ্যাকসিনটির নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত এবং ল্যানসেট নামক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বাস্থ্য জার্নালে তা বিচার বিশ্লেষণের পর প্রকাশিতও হয়েছে। প্রথম ডোজ এবং ৪-১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিলে এ ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ মানুষকে পূর্ণ প্রতিরক্ষা দেয়। এখানে আরও বলা যেতে পারে যে, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের অসংখ্য শিশু ভারতে প্রস্তুতকৃত ভ্যাকসিন গ্রহণ করে উপকৃত হয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই ভারতে প্রস্তুতকৃত ভ্যাকসিন নিয়মিত প্রদান করা হয়। সম্প্রতি ভ্যাকসিন কূটনীতির অংশ হিসেবে ভারত ১ কোটি ডোজ টিকা আফগানিস্তান, ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মরিশাস এবং সেচিলিসে উপহার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা ভাবছেন ভারত কেন হঠাৎ করে বাংলাদেশকে ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার দিচ্ছে, তাদের জানাই, তারা শুধু বাংলাদেশে নয়, উপরে উল্লেখিত দেশগুলোতেও তারা টিকা পাঠাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বহু আগে থেকেই আলোচিত হচ্ছে এবং ভারতীয় মিডিয়ায় এ নিয়ে কেউ কেউ সমালোচনাও করেছেন যে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে বিদেশে টিকা পাঠানো কেন? কাজেই বিষয়টি নিছক বাংলাদেশের প্রতি উটকো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং বৃহত্তর কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির খণ্ডাংশ। এ নিয়ে অযথা সন্দেহের কিছু নেই।
দ্বিতীয় অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আসলে বলার কিছু নেই। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন আজগুবি কথা শুনতে হবে এটাই হতাশায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ভ্যাকসিন বা মানব শরীর এবং এর গঠন ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে যারা সামান্যতম অবগত আছেন, তারাই বুঝবেন ভ্যাকসিন কাজ করে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তথা ইমিউন সিস্টেমের ওপর। শরীরে ভ্যাকসিন কতা ঢুকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত হয়, এমনকি মেমোরি সেলগুলো শত্রুকে দীর্ঘদিন চিনেও রাখে। কিন্তু ভ্যাকসিন তো আসল শত্রু নয়, কেবল শত্রুর ভেকধারী কণিকা। পরবর্তীতে আসল শত্রু আক্রমণ করলে, পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া ও শত্রুকে চিনে রাখা আমাদের শরীরের ইমিউন কোষগুলো প্রবল বিক্রমে শত্রুর ওপর, তথা আসল কোভিড-১৯ জীবাণুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে। লিঙ্গ পরিবর্তনের এখানে কোনও বালাই নেই।
তৃতীয় প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে, পৃথিবীর কোনও ভ্যাকসিনই ১০০ ভাগ কার্যকর নয়, ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা এমন দাবিও করেননি। আগেও বলেছি, দুই ডোজ নিলে বাংলাদেশে আগত অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও সংখ্যাটা ৭০ থেকে ৯০-এর মধ্যে বলাটাই সঙ্গত। ফাইজার ও মডার্নার টিকা যথাক্রমে ৯৫ ও ৯৪ শতাংশ কার্যকর। কাজেই ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও অল্প কিছু মানুষ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হবেন এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, এখন পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া প্রত্যেকটি ভ্যাকসিনই দুই ডোজের ভ্যাকসিন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের মাঝে যে সময়, সে সময়ে এর কার্যকারিতা পূর্ণমাত্রায় থাকে না। এ সময় সাবধানে থাকতে হবে, কারণ আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তৃতীয়ত, বিশ্বের সব ওষুধের মতোই ভ্যাকসিনেরও কিছু গৌণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এসবের প্রভাব নগণ্য এবং ভ্যাকসিন না নিলে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ যে করবেন তাও পরিসংখ্যানগতভাবে প্রতিষ্ঠিত।
ভ্যাকসিন নিয়ে এত যে বিভ্রান্তি, তা দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রসালো মন্তব্য করেছে, কোভিড-১৯ রোগের টিকা দেওয়ার আগে মানুষকে তথ্যভ্রান্তির বিরুদ্ধে টিকা দেওয়াটা আবশ্যক। সেই শুরুর দিকের মাস্ক পরা না পরা থেকে শুরু করে হালের ভ্যাকসিন নেওয়া-না নেওয়া নিয়ে এত তর্কবিতর্ক থেকে যেটা বুঝতে পারছি সেটা হলো রেফারেন্স, ডেটা সোর্স, ডেটা অথেন্টিসিটি। এসব বিষয়ে আমাদের বোঝাপড়ায় মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। তাই একজন পেশাদার জনস্বাস্থ্য গবেষক হিসেবে আমি নিজে কোন সোর্সগুলো ফলো করি সে বিষয়ে জানাতে চাই। কোভিড-১৯-এর বিভিন্ন নির্দেশনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র। তারা তাদের প্রত্যেকটা গাইডলাইন এভিডেন্সের ভিত্তিতে তৈরি করে; এবং সেই গাইডলাইন তৈরির প্রক্রিয়াটাও বেশ রিগোরাস এবং মেথোডিক্যাল। যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ করেছেন অথবা কোনও প্রজেক্টের সূত্রে এর সংস্পর্শে এসেছেন তারা বিষয়টা স্বীকার করবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনেক সমালোচনা আছে, যেমন তারা অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক, সব সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে তোষামোদ করে চলে, সংকটকালে যথেষ্ট গতিশীল না, ইত্যাদি। কিন্তু টেকনিক্যাল বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখন পর্যন্ত সমালোচনা শুনিনি। কাজেই আমি আমার যেকোনও লেখা বা কথার জন্য তাদের গাইডলাইনটা দেখে নিই।
এর বাইরে সংক্রামক রোগের জন্য আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) হলো সবচেয়ে নামকরা কর্তৃপক্ষ। কোভিড-১৯ যেহেতু সংক্রামক রোগ, কাজেই তাদের ওয়েবসাইট এবং গাইডলাইনগুলোও দেখা যেতে পারে। এর বাইরে আর জন্স হপকিন্স কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃস্থানীয় অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান, তাই তাদের পডকাস্ট, হিটম্যাপ, রিসোর্স সেন্টার এগুলোর ওপরও নজর রাখা যায়। এছাড়া আরও নানা রাষ্ট্রীয় সংস্থা, বৈজ্ঞানিক জার্নালের কোভিড-১৯ রিসোর্স সেন্টার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন দেশের সরকার কী করছে না করছে, আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকা, সায়েন্টিফিক ব্লগ ও লিস্টসার্ভ এসবের ভিত্তিতেও আমি কথা বলছি, লিখছি ও পরামর্শ দিচ্ছি।
এসবের প্রায় সবগুলোই সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ গিয়ে এগুলো দেখতে পারেন, চোখ রাখতে পারেন। অনেক সাইটে কোনও আপডেট এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে জানিয়ে দেবে সেই ব্যবস্থাও আছে। এত কিছুর পরও আমরা কেন যে ফেইক নিউজ ছড়াই বা বিশ্বাস করি, অহেতুক তর্ক করে নিজের ভুল মতটাকে প্রতিষ্ঠিত করা চেষ্টা করি! আমার আজকের মতামত কালকে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে, যদি সেই বিষয়ে নতুন কোনও বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যায় এটা মেনে নেওয়ায় কোনও সমস্যা নেই। বিজ্ঞানের কোনও কথাই তো আমার বা আপনার ব্যক্তিগত মতামত নয়; তাহলে এসব মতামতকে উগ্র আইডিয়ালিজমের মতো, অপরিবর্তনীয় ধর্মমতের মতো আঁকড়ে ধরে থাকার কী হেতু থাকতে পারে? টিকা নিয়েও যদি গতকাল ভুল বুঝে থাকেন, জেনে থাকেন, বলে থাকেন, আজও তা আঁকড়ে থাকবেন না। নির্দ্বিধায়, নিঃশঙ্কচিত্তে টিকা গ্রহণ করুন। আর স্মরণ রাখুন, “অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী”।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here