আবাসন, সরকারের অগ্রাধিকার খাত

17

রেজাউল করিম সিদ্দিকী
কোন দেশ কতটা উন্নত তা সে দেশের ভৌত অবকাঠামো অবলোকন করলে সহজেই অনুধাবন করা যায়। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, উন্নত প্রযুক্তি এবং পরিকল্পিত ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম পরিচায়ক। ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, আমেরিকার টুইন টাওয়ার, মালযয়েশিযয়ার পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার সময়ের নিরিখে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতির পরিচয় বহন করে। মধ্যযুগের সপ্তম আশ্চর্য মস্কোর ঘন্টা, চীনের প্রাচীর, বেবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান, আগ্রার তাজমহল প্রভৃতি সেসময় সংশ্লিষ্ট জনপদের নান্দনিকতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, বেবিলন সভ্যতা, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা কিংবা এদেশের ময়নামতি, মহাস্থানগড়, উয়ারী বটেশ্বর ভৌত অবকাঠামোর মাধ্যমে আধুনিক সময়ে মানুষের নিকট পরিচিতি লাভ করেছে।
সংস্কৃতি মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয় কিন্তু সভ্যতা বাহ্যিক অবয়বে দৃশ্যমান। বাহ্যিক দৃশ্যমান অভাবের মধ্যে ভৌত অবকাঠামো প্রথমেই চোখে পড়ে।
প্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান বাংলাদেশ অধ্যুষিত ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মধ্যযুগে এ অঞ্চলের মানুষ মোটামুটি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতো। তাদের গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ ছিল। কালক্রমে বিভিন্ন বহিঃশত্রুর আক্রমণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িক বিরোধ প্রভৃতি কারণে অর্থনৈতিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। উপরন্তু ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের ঔপনিবেশিক আচরণ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ভারত দখল, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ ও নির্যাতনের ফলে এদেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সাথে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভৌত অবকাঠামোসহ সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে এদেশের মানুষ।
পশ্চাৎপদ এই জাতিকে এগিয়ে নিতে ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি একত্রিত হয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। সমাপ্তি ঘটে দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন ও পাক হানাদার শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতনের। স্বাধীনতার পর শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের মাধ্যমে এ জাতি ঘুরে দাঁড়াতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময় স্বৈরাচারী ও ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ প্রভৃতি কারণে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। তা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। শিক্ষা বিস্তার, দুর্যোগ মোকাবেলা, পররাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান চর্চা, স্বাস্থ্যসেবা, ভৌত অবকাঠামো, উন্নত টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিগত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, দুর্যোগ মোকাবিলা প্রভৃতির ন্যায় মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বাসস্থানের ও উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার গত এক যুগে এদেশের আবাসন ব্যবস্থায় যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

২০১৬ সাল অবধি ঢাকা শহরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর মাত্র শতকরা ৮ ভাগ আবাসন সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। বিষয়টি অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি আবাসন সুবিধা ৪০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশ প্রদান করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা স্বল্প সময়ে বাস্তবে রূপ দিতে রাজধানীর আজিমপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান ইত্যাদি এলাকায় পুরাতন ও
-২-
পরিত্যক্ত ভবন ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক বহুতল আবাসিক ভবন। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩০১২টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করে হস্তান্তর করেছে। এসব ফ্ল্যাটে রয়েছে আধুনিক ফিটিংস ও ব্যবস্থাপনা। সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীরা ইতোমধ্যে এসব ভবনে বসবাস শুরু করেছেন। বর্তমানে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে মোট ৯৭৩৪ টি ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। তন্মধ্যে ঢাকায় ৭,৭৪২ টি ফ্ল্যাট নির্মিত হবে। এতে ঢাকায় কর্মরত কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের মোট ১৮% আবাসিক সুবিধা পাবে। এছাড়াও ৮ হাজার ৮ শ ৩৫টি ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সারাদেশে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে আধা পাকা ঘর দিয়েছে। এছাড়া ৩৬টি উপজেলায় ৭৪৩টি ব্যারাক নিমার্ণের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর দিয়েছে বর্তমান সরকার।
বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন সরকারি আবাসিক ভবন, অফিস ভবন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আধুনিকায়ন ও সংস্কারসহ মোট ৩৩টি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার প্রকল্পমূল্য ১১ হাজার ১২৪.০১ কোটি টাকা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তর বর্তমানে ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের মোট ৩০৩টি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে, যার সর্বমোট প্রকল্পমূল্য (গণপূর্ত অংশ) প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিগত ২০১৯-২০২০ আর্থিক সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে মোট ৭০৯৫ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করেছে। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রূপপুর আবাসিক গ্রীন সিটির ১০৩৪ টি ফ্ল্যাট, উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্পের ২৯৪০ টি ফ্ল্যাট, পর্যটন ভবন, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভবন, ঢাকার শেরে বাংলা নগরে বিভিন্ন সংস্থার প্রধান কার্যালয়, পুলিশ ব্যারাক; কর্মজীবি মহিলা হোস্টেল; ছাত্রাবাস, ৬৪ জেলায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, কিশোরগঞ্জে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, ১০১টি জরাজীর্ণ থানা ভবন টাইপ প্ল্যানে নির্মাণ, অস্ত্রাগার, নৌ থানা ভবন, হাইওয়ে আউটপোস্টের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
আবাসন খাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যপকভাবে প্রসংসিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকায় বসবাসরত বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ অনেক দেশ মডেল হিসেবে অনুসরণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেশের আবাসন সংকট সমাধানে সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সামনে বর্তমানে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ভিশন: ২০৪১, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ডেলটা প্ল্যান ২১০০ রয়েছে। এসব পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তাবয়ন করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে এদেশের মানুষের কোনো আবাসন সংকট থাকবে না এবং দেশ হবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ । আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি সবার ঐকান্তিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।
লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সুত্র : পিআইডি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here