ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি

19

করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর অধিকাংশের জীবনে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, নিম্ন আয়ের অনেক জীবিকা হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছেন। কর্মরতদের অনেকের আয় কমেছে। মধ্য আয়ের অনেকেও একই পরিণতি বরণ করেছেন। এমতাবস্থায় আয় কমার সঙ্গে যদি জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় তাহলে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস কী পর্যায়ে পৌঁছায় তা সহজেই বোধগম্য।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় ভোজ্য তেলের বাজারে কয়েক মাস ধরে চলছে অস্থিরতা। বিপণনকারীদের তথ্যানুযায়ী, তেল আমদানি ও বাজারজাতকারী শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানি গত সপ্তাহে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করেছে ১৪০ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে আমদানি পর্যায়ে তিন স্তরের পরিবর্তে এক স্তরের শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১২৪ ও খুচরা সয়াবিন তেলে ১০৯ টাকা দাম নির্ধারণ করা যায়। এদিকে বিষয়টি সুরাহায় একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১১ ফেব্রুয়ারি এ কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা আছে। ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভোজ্য তেলের থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলেও তা অর্জনে তেমন সমস্যা হবে না; বরং বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে এক স্তরে শুল্ক নির্ধারণই এখন একমাত্র উপায় দেখছেন তারা।
দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল আমদানি করতে হয়। কোম্পানিগুলো অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি করার পর পরিশোধন করে তা বাজারজাত করে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, গত ৭ জুলাই বিশ্ববাজারে এক টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৭৪৩ ডলার, যা গত মাসে সাড়ে ১১শ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ দরে সয়াবিন তেল দেশের বাজারে ঢুকলে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দাঁড়াবে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। তবে এখনো চড়া দামের তেল বাজারে আসতে শুরু করেনি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বলছে, এমনিতেই গত বছরের এ সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেলের দাম এখন ১৯ থেকে ২৬ শতাংশ বেশি। আগামী দিনগুলোতে যদি ভোজ্য তেলের দাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে সাধারণ জনগণের যে নাভিশ্বাস ঘটবে, তা সহজেই প্রতীয়মান হয়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পুরনো নথিপত্র অনুযায়ী, এর আগে ভোজ্য তেলের সর্বোচ্চ দাম ছিল ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে। ওই বছর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি মেট্রিক টন ১ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। তখন আমদানি কম হওয়ায় বাজারে তেলের ঘাটতিও তৈরি হয়েছিল। ওই সময়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৩৩ টাকা ৫০ পয়সা। তখন এই তেলের এক লিটারের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ টাকা। এখন সর্বোচ্চ দাম ১৪০ টাকায় নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল। জানা যায়, চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে ভোজ্য তেলের ওপর তিন পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা আগে শুধু আমদানি পর্যায়ে আদায় করা হতো। এছাড়া অগ্রিম করও দিতে হচ্ছে আমদানি পর্যায়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও কমে।
করোনায় আয় কমে যাওয়া মানুষ খাওয়ার অন্যান্য খরচ কমিয়ে শুধু কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বাজার ব্যয় সীমিত করে এনেছে। চাল ও ভোজ্য তেল তাদের খাদ্যতালিকার সবচেয়ে জরুরি পণ্যের মধ্যে থাকে। দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, ভোজ্য তেলের দাম যেহেতু বিশ্ববাজারে সর্বোচ্চ, তাই সরকারের বাড়তি পদক্ষেপ দরকার। আর ব্যবসায়ীরা যাতে সুযোগ নিয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কারণ ছাড়াও পণ্যের দাম বাড়িয়ে থাকেন। আগে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আমদানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী গ্রুপই এটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর ফলে আমদানির ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে থাকে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলদের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে টিসিবিকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ভোজ্য তেলের মূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য তিন স্তরের শুল্ক আরোপের পরিবর্তে এক স্তরের শুল্ক আরোপ করার যে সুপারিশ করেছে, সেটাও বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। করোনার নানামুখী অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশের জনগণ যেন ভোজ্য তেলসহ নানারকম নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিপন্নতার দুর্বিপাকে উপনীত না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

Previous articleস্বপ্নীল
Next articleবিপদে আমি না যেন করি ভয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here