মমতার ওপর হামলা নিয়ে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ

41

কল্যাণ ডেস্ক : নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে অজ্ঞাত চার-পাঁচজন ব্যক্তির ধাক্কায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবরে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে তোলপাড় চলছে। বেশ কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা মমতার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিজেপি একে সহানুভূতি আদায়ের ‘নাটক’ বলছে।

ঘটনা বুধবার সন্ধ্যার। মমতা হলদিয়ায় মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে হেলিকপ্টার যোগে নন্দীগ্রাম যান। রানিচকে একটি মন্দিরে ‘হরিনাম সংকীর্তনে’ অংশ নিয়ে বের হওয়ার সময় চার-পাঁচজন ব্যক্তির ধাক্কায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এরপর জরুরিভিত্তিতে তাৎক্ষণিক তাকে কলকাতায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নন্দীগ্রামের মন্দিরে আহত হওয়ার পর মমতা জানিয়েছেন, আচমকা চার-পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এখন কলকাতার পিজি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতার পিজি হাসপাতালে ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের সাড়ে ১২ নম্বর কেবিনে আছেন তিনি। তার বাঁ পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। নন্দীগ্রামের মন্দিরে আহত হওয়ার পর মমতা জানিয়েছেন, আচমকা চার-পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়।

পিজি হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায় বুধবার রাতে জানান, মুখ্যমন্ত্রী পায়ের পাতা, গোড়ালি, ডান হাত, গলা ও ডান কাঁধে চোট লেগেছে। বুকে ব্যথা অনুভব করছেন তিনি। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমআরআই ও এক্স-রেসহ সব পরীক্ষা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল বোর্ড। আইসিইউতে আছেন তিনি।

আগামী ২৭ মার্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হবে। তার আগে মমতার আহত হওয়ার খবর নিয়ে তোলপাড় চলছে ভারতে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের চাপানউতর শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিশ্চুপ রয়েছেন। এ নিয়ে একটি কথাও বলেননি তারা।

তৃণমূলের অভিযোগ, তফসীল ঘোষণা হওয়ার কারণে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে। আর তা চালিত হচ্ছে বিজেপির নির্দেশে। প্রশাসনের বদলিতে পক্ষপাতিত্ব ও তারপর মুখ্যমন্ত্রীর ওপর এই হামলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনকে কড়া চিঠি দিয়ে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তফসীল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে কমিশনের হাতে। তা চালিত হচ্ছে বিজেপির নির্দেশে। তাই পুলিশ প্রশাসনের বদলিতেও ধরা পড়েছে পক্ষপাতিত্ব। সেই পক্ষপাতিত্বের জেরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার ওপর এই হামলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দলের ওই প্রতিবাদপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই ডিজি পদে বদল করা হয়েছে। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এমনটা ঘটল। তাই এই ঘটনার দায় কোনোভাবেই নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মমতার ওপর হামলা পূর্বপরিকল্পিত দাবি করে তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি, তিনি নন্দীগ্রামের প্রার্থীও। কিন্তু ঘটনার সময় ছিলেন না পুলিশ সুপার কিংবা থানার আইসি। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় ওই দুজনেরই ঘটনাস্থলে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু পুলিশের কোননো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার জেড প্লাস সিকিউরিটি (বিশেষ নিরাপত্তা) পাওয়ার কথা। কিন্তু তেমন কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘটনাস্থলে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় ছিলেন শুধু তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরাই। আমরা জানতে চাই দেশের একমাত্র নারী মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় এমন গাফিলতি কেন।’

ভিড়ের মধ্যে চার-পাঁচজন বাইরে থেকে ঢুকে পড়েছিল। মন্দির থেকে বের হওয়ার সময় ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় আমাকে। ইচ্ছাকৃত ধাক্কা মারা হয়। এর পেছনে অবশ্যই ষড়যন্ত্র ছিল।

মমতা নিজেও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে গতকালই বলেছেন, ‘ভিড়ের মধ্যে চার-পাঁচজন বাইরে থেকে ঢুকে পড়েছিল। মন্দির থেকে বের হওয়ার সময় ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় আমাকে। ইচ্ছাকৃত ধাক্কা মারা হয়। এর পেছনে অবশ্যই ষড়যন্ত্র ছিল। ওই সময় আমার পাশে কোনো পুলিশকর্মী বা পুলিশ সুপার কেউই ছিলেন না।’

এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের অন্যান্য দলের রাজনীতিকেরা। টুইটার বার্তায় আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল টুইট করে বলেছেন, ‘মমতা দিদির ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচার করতে হবে। আমি তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।’

মমতার আরোগ্য কামনা করে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদব টুইটে লিখেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলা হয়েছে। ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ এখন বিজেপি সরকারের নির্বাচন কমিশনের অধীনে। জনগণ জানে, তারা (বিজেপি) গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে না। এ হামলায় জড়িতদের বিচার করতে হবে।’

মমতা আহত হওয়ার পর তৃণমূল এক টুইটে লেখে, ‘মমতাকে চুপ করাতে তার ওপর আক্রমণ এই প্রথম নয়। এর আগেও হয়েছে। কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বহুবার তার ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তার ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি। আপনাদের জন্য তিনি ছিলেন, তিনি আছেন এবং তিনি থাকবেন।’

তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ওপর এ হামলাকে সহানুভূতি আদায়ের কৌশল বলে আখ্যায়িত করেছেন কংগ্রেসের সংসদ নেতা, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি অধীর চৌধুরী। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় এটিকে ‘নাটক’ বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

শিবরাত্রির দিন অর্থাৎ আজ বৃহস্পতিবার কালীঘাট থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায় দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করবেন বলে কথা ছিল। তবে নির্বাচনী আসন নন্দীগ্রাম সফরে বুধবার মমতার আহত হওয়ায় ঘটনায় সে পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত। আহত মুখ্যমন্ত্রীর ঠিকানা এখন পিজি হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ড।

এদিকে মমতা হাসপাতাল থেকেই আবারও নির্বাচনী মাঠে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার চোট গুরুতর। সহজেই সব স্বাভাবিক হবে না। তবে প্রয়োজন হলে তিনি হুইলচেয়ারে করে ভোটের প্রচার চালাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here