ইঞ্জিন চালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধে নৈবচ নৈবচ

9

এম আর খায়রুল উমাম

সরকার সারাদেশে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন রিকশার সামনের চাকায় ব্রেক আছে। পেছনের চাকায় ব্রেক নেই। এগুলোতে ইঞ্জিন লাগিয়ে চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সারাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জনকল্যাণের সরকার নিশ্চয়ই বসে বসে দেখতে পারে না যে, দেশে এমন সব যানে জনগণ যাতায়াত করছে যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং আরোহীরা মারা যাচ্ছে। ঢেউ খেলানো, ছাল তোলা, মাছ চাষের গর্তে ভরা আধুনিক সড়ক ব্যবস্থায় চলাচলের যোগ্যতা এসব যানের নেই। এমন সড়ক পথে চলার জন্য যে শক্তি ও সামর্থের প্রয়োজন তা না থাকার কারণেই এরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মারছে। জেনেশুনে জনকল্যাণের সরকার জনগণের মরণফাঁদ পেতে রাখতে পারে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। অতীতে বেশ কয়েকবার সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কিন্তু শেষপর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে দেখা গিয়েছে। তবে তাতেও ‘রবার্ট ব্রুস’-দের চেষ্টা থেমে যাবে এমনটা ভাবা নিস্প্রয়োজন।
জাতীয় বা অন্য যেকোনো নির্বাচনের সময় এসব যানের গুরুত্ব দেখে খুব আনন্দ পাই। সুলভ ও সহজলভ্য হওয়ার কারণে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে এসব যান। সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকারীরাও তখন মৃত্যু ভয় ভুলে যায়। দলে দলে তখন তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলেছেন, দায়িত্ব পালন করে আবার ফিরেও আসছেন। গ্রামের প্রতিজন মানুষ তার সাক্ষী। আর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হতে পারত আমাদের নির্বাচন কমিশন। একটা সাক্ষ্য থাকতে পারত কত ব্যাপকভাবে যানগুলো নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছে। আর অন্যটা হচ্ছে এই যান ব্যবহারের ফলে কতটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, কত দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রাণ গিয়েছে এবং সরকারকে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুর্ভাগ্য এসব কোনোটারই কোনো হিসেব নির্বাচন কমিশন দিতে পারবে না। কারণ নিষিদ্ধ যানগুলো নির্বাচনকে কেবল সহায়তাই করেছে। কোনোরকম বিপদে ফেলেনি। কিন্তু অতীতে দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে আগামীতে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? জনকল্যাণের সরকার তো বসে বসে জনগণের মৃত্যু দেখতে পারে না। তাই সতর্ক থেকে সবকিছু দেখার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বা করতে বাধ্য হচ্ছে।
আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কী গভীর দৃষ্টি নিয়ে জনগণকে দেখছেন তা ভাবতেই মনটা জুড়িয়ে যায়। কোটি কোটি টাকা দামের গাড়িতে বসে দেখেছেন পিছনের চাকায় ব্রেক না থাকার কারণে কীভাবে এই ইঞ্জিন চালিত রিকশা ভ্যানগুলো উল্টে যায়। এতে কত মানুষ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুবরণ করছে। শুধু দামি গাড়ির কালো কাচের মধ্য দিয়ে দেখতে পান না সড়ক দুর্ঘটনায় জীবনহানিতে কার অবদান কত? প্রতিদিন মানুষ মারতে ও পঙ্গু করতে সড়ক পথে চলা বাস-ট্রাকের অবদান কত আর ইঞ্জিন চালিত রিকশা-ভ্যানের অবদান কত? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুগ্রহ করে জনগণের সামনে একটা হিসেব যদি রাখতেন তাহলে বিষয়টি সকলের বুঝতে সহজ হয়ে যেত। শুধু সামনে চাকার ব্রেক নিয়ে রিকশা ভ্যান এবং সামনে পিছনে হাইড্রেলিক ব্রেক নিয়ে বাস-ট্রাক কত মানুষকে প্রতিদিন খুন করছে, পঙ্গু করছে।
দেশের অনক্ষর অনাহারী মানুষ বিশ্বাস করে জনকল্যাণের সরকার যে কারণে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধ করে দিতে চান তা মূল কারণ নয়। প্রকৃত কারণ তারা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে পারছে না। আসলে দেশের শক্তিশালী পরিবহন সেক্টর চায় না এসব যান সড়ক পথে চলাচল করুক। এতে তারা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ৫/৭ মাইল দূরত্বের যাত্রীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের পরও বাধ্য হয়ে তারা পরিবহন ব্যবহার করত, কিন্তু আজ আর তা নেই। অল্পদূরত্বের যাত্রীরা পুরোপুরিভাবে পরিবহন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় পরিবহন মালিকদের যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষমতাধর পরিবহন সেক্টরের জন্য এমন ক্ষতি মানা সম্ভব হচ্ছে না বলেই তারা সবচাইতে সোচ্চার ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যানের প্রতি। অথচ আমাদের মর্যাদাপূর্ণ সমাজের কোনো অবদানই নেই এই যানগুলোর প্রতি। সাধারণ প্যাডেল করা রিকশাকে গতিসম্পন্ন করতে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির অবদান শূন্যের কোটায়। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবহন খাতে অবদান কী? সাধারণ মানুষকে আকাশ-পাতাল এক করে ফেলতে হবে অবদান খুঁজে দেখার জন্য। মিশুক ছাড়া কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। যে মিশুকে রাজধানীর মানুষ উঠতে ভয় পেত। এত অর্থ ব্যয়, এই মেধার ফলাফল যেখানে সাধারণ জনগণ খুঁজে পায় না। সেখানে গ্রামবাংলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইঞ্জিনটালিত রিকশা-ভ্যানগুলো। দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতাদের খারাপ লাগাটা কী অস্বাভাবিক? এরা নিজেদের কথা বলতে পারেন না তাই অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখেছে। জনকল্যাণের ব্যবসায়ী সরকারের ক্ষমতাবলয়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের এখানে ব্যবসাটা ভালো হয়নি। স্থানীয়ভাবে মালামাল সংগ্রহ করে এসব যান তৈরি করা হয়েছ। যদি ইজিবাইকের মতো একটা ব্যবসা হতো তাহলে না হয় সহ্য করা যেত। বিদেশ থেকে লাখ লাখ ইজিবাইক আমদানি করে আনা হলো। সাধারণ মানুষ ঋণ করে, জমি বিক্রি করে ইজিবাইক কিনে যখন রাস্তায় এলো তখনই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে উঠল। যার যতটুকু ক্ষমতা আছে সবাই একযোগে ইজিবাইক বন্ধে সর্বশক্তি নিয়োজিত করল। এখন প্রশ্ন হলো দেশে আমদানি কি নিয়ন্ত্রণহীন? দেশ ও জনগণের প্রয়োজন এখানে বিবেচনা করা হয় না? রাস্তায় ইজিবাইক চলাচলে বাঁধা দেয়া হয়েছে কিন্তু কোনো আমদানিকারকের শোরুমে কেউ উঁকি দেয়নি। আসল কাহিনী হচ্ছে যে কোনোকিছুতে ব্যবসা যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আমরাও আছি। এখন মাঝে মধ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তা চালু রাখার বাহানা করা হয় শুধু ব্যবসার সুযোগ বা নতুন দ্বার খুলে দেওয়ার জন্য।।
গ্রামবাংলায় একটা কথা আছে ‘বিড়াল নরম জায়গায় পায়খানা করে’ দেশের শক্তিশালী পরিবহন সেক্টরে হাত দেয়ার ক্ষমতা কারো আছে বলে বিশ্বাস করতে পারা যায় না। তাই ফিটনেসবিহীন বাস-ট্রাক চলাচলে থাকবে বাঁধাহীন। চালকের দক্ষতা দেখার কেউ নেই, ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ নেই, পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নেই। কারণ এদের মাথার ওপর খোদ মন্ত্রী মহোদয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাধারণ জনগণের দাবির মুখে কেউ কিছু করতে গেলেই মন্ত্রী ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিপরীতে গ্রাম বাংলার পরিবহনের জন্য কে আছে? এদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মন্ত্রী নেই, জনপ্রতিনিধি নেই, সুশীল সমাজ নেই তাই নরম মাটি বিবেচনায় মনে চাইলেই নিষোধাজ্ঞা জারি করা যায়। জনগণের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকে তাদের জীবন রক্ষার তাগিদকে গুরুত্ব দিয়ে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। কর্মহীন হয়ে মানুষ না খেয়ে মারা গেলে ক্ষতি নেই কিন্তু এসব অ-যানের কারণে মারা পড়লে ক্ষমতাসীনরা এ দুঃখ কোথায় রাখবে? গ্রাম বাংলার এসব যানের চালকরা সরকারকে এমন দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করবে এ প্রত্যাশা করতে পারি। আপনাদের মঙ্গলের জন্য সরকার সবসময় চিন্তা করে, পাশে থাকতে চায় তাই আপনাদেরও দায়িত্ব সব অবস্থায় সরকারি নির্দেশ মান্য করা।

বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক, গবেষণা সংস্থা সামান্য আগ্রহী হয়ে যদি ইঞ্জিন চালিত রিকশা-ভ্যানের কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা বিষয়ে একটা সমীক্ষা করেন তবে আশা করা যায় এসব যান গুরুত্ব পাবে। এ যানবাহনগুলো গ্রামীণ জীবন কতটা সহজ করে দিয়েছে তা সহজে বোঝা যাবে, কতটা গতি এনে দিয়েছে জানা যাবে, মালামাল পরিবহনসহ যাত্রী পরিবহন এবং অসময়ে রোগী পরিবহন করে কত জীবন রক্ষা করছে তা জানা যাবে। গ্রামবাংলার এ যানগুলো দামি গাড়ির মধ্যে বসে কালো কাচের মধ্যে দিয়ে উলটে যাওয়ার চাইতে সোজা থেকে কত উপকার করছে তা দেখা প্রয়োজন। হয় ঝেড়ে কাশতে হবে, নয়তো এসব যান যাতে আরো উন্নয়ন করা যায়, সামনের চাকার ব্রেকের কারণে উলটে না যায়, গতি নিয়ন্ত্রণ করে চালানো যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে দেশে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধ নৈবচ নৈবচ।
লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

Previous articleএপাশে সাক্ষ্যগ্রহণ, ওপাশে ওসি প্রদীপের মোবাইলে কথোপকথন!
Next articleপ্রতারণা থেকে বাঁচতে এড়িয়ে চলুন ৮ অ্যাপ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here