দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না

14

দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না। সময়ের কাজ সময়ে করি না। এমন প্রবাদ আমরা সকলে জানি ও বুঝি। তবে জানা বোঝার মধ্যেই সেটা সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বাস্তবক্ষেত্রে তা কাজে লাগনো হয় না বললেই সমুচিত হবে। খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন যারা সময়ের কাজ সময়ে করেন । অধিকাংশই আমরা ভেবে থাকি সময় হলেই সব করা যাবে। আবার যারা তরুণ বা যারা সুস্থ আছি তারা মনে করি যে, আমরা এখন বৃদ্ধ হয়নি ব্যায়াম করার কোন প্রয়োজন নেই বা এখন না করলেও সমস্যা নেই। এছাড়াও মনে করি “আমিতো সুস্থ আমি কেন ব্যায়াম করবো বা নিয়মিত হাঁটবো”। তবে এই ভাবনাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ সুস্থ মানুষ বা সব বয়সের মানুষদের ব্যায়াম করা প্রয়োজন। শৈশব থেকে ব্যায়াম করা উচিত।
কেননা ব্যায়াম আমাদের স্বাস্থ্য ভাল রাখে সুস্থ ও সতেজ করে। কেবলমাত্র তাই নয়, আমাদের শরীরের পুনঃগঠনে বিশেষ অবদান রাখে। ব্যায়াম আমাদের পেশিশক্তি বৃদ্ধি করে, ওজন কমানোয় সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যায়াম তারুণ্যকে ধরে রাখে আর বয়স ও বার্ধক্যের গতি কমিয়ে দেয়।
এছাড়া ব্যায়াম হৃদপিন্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হৃদযন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এবং হৃদরোগের পাশাপাশি ব্যায়াম, সংবহন তন্ত্রের জটিলতা, ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা রোধে শারীরিক ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া মানসিক অবসাদগ্রস্ততা দূর করতে, ইতিবাচক আত্মসম্মান বৃদ্ধিতে, সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায়, শরীরের সঠিক অনুপাত অর্জনে শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেমন- মাংসপেশী ও সংবহন তন্ত্র সবল করা, ক্রীড়া-নৈপুন্য বৃদ্ধি করা, শারীরিক ওজন হ্রাস করা বা রক্ষা করা।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা শারীরিক ব্যায়ামকে “অলৌকিক” এবং “আশ্চর্যজনক” ঔষধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে আমাদের দেশে শরীরচর্চা কেন্দ্র মুষ্টিমেয় থাকলেও সেখানে বয়োজ্যেষ্ঠ বা অসুস্থ ব্যক্তিগণকে বেশি দেখা যায়। আবার সকাল, সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানেও ব্যায়াম করতে বা হাঁটতে বেশি সংখ্যক বয়োজ্যেষ্ঠ বা অসুস্থ মানুষকে দেখা যায়।
কারণ আমাদের ব্যস্ততা, অলসতা, সর্বোপরি ভ্রান্ত ধ্যান ধারণা। এখনও আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে এসেও মানসিকতার পরির্বতন হচ্ছে না। আসলে জীবনকে সুন্দর করতে সঠিক সময়ে করণীয় স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাসগুলো আমাদের জানা প্রয়োজন।
দার্শনিক মার্গারেট ফুলার বলেছেন যে, ‘যদি জীবনকে সুন্দর করতে চাও, তবে স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাসগুলোকে নিষ্ঠার সাথে পালন করো।’
এজন্য ব্যায়াম শুরু করতে হবে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস থেকে। মনোবিজ্ঞানীরা এই দিন থেকে ব্যায়াম শুরু করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সপ্তাহের এই দিন থেকে ব্যায়াম শুরু করলে সারা সপ্তাহ এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
মনকে প্রশান্তির জন্য যেমন শিল্প সাহিত্য চর্চা প্রয়োজন। দেহের জন্য তেমন ব্যায়ামের প্রয়োজন। সুস্থ আত্মা শারীরিক উন্নতির জন্য সহায়ক। আর সুস্থ দেহ মনকে উন্নত ও দৃঢ় করে এবং জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করে। নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ব্যায়াম করার মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শারীরিক, কায়িক পরিশ্রম এবং ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ব্যায়ামের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সময় বের করে নেয়া প্রয়োজন। সকালের ব্যায়াম শরীরের জন্য বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশি উপকারী। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে সপ্তাহে ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটার বা ৭৫ মিনিট দৌড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। শরীরের ঘাম ঝরানো-মনকে সতেজ করে, বিষণœতা দূর করে, ঘুম ভালো হয়, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করে।
ব্যায়ামের ফলটা খুব ধীরগতিসম্পন্ন, যে জন্য মানুষ এটার প্রতি আকৃষ্ট কম হয়। কিন্তু সুস্থ–সবল জীবন যাপন করতে চাইলে ব্যায়ামকে নিত্যদিনের রুটিনে রাখাই আমাদের বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এজন্য শৈশবে শরীরের ওজন ঠিক রাখতে, শক্ত হাড় গঠনে, ঘুম ঠিক রাখতে ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে ব্যায়াম। শিশুদের দিনে অন্তত এক ঘণ্টা ব্যায়ামে কাটানো উচিত। শিশুদের টইটই করে দৌড়ে বেড়ানোতেই ব্যায়াম হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবলের মতো বিভিন্ন ধরনের দলগত খেলা; সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো, কারাতে ইত্যাদি শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যায়ামের চাহিদা মিটে যেতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রকমের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে শুরু করে। নিয়মিত কিছু ব্যায়াম সেই প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে অনেকটাই সুস্থ জীবন যাপন করতে সাহায্য করে। তবে এই বয়সে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রেখেই ভালো থাকা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি খুবই প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে, যেমন হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজনাধিক্য, হাড়ের রোগ, ব্যাকপেইন, কোলেস্টেরল লেভেল কমাতে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে, মাংসপেশিকে শক্তিশালী করতে, অস্টিওপোরসিসের ঝুঁকি কমাতে শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী হাঁটা, কিছুটা ফ্রি–হ্যান্ড, কার্ডিও টাইপ ব্যায়াম, এরোবিক্স ও ইয়োগা খুবই উপকারী।
তবে সকালে ভারী কোনো ব্যায়াম না করারই পরামর্শ দিলেন যমুনা ফিউচার পার্কের ফিউচার ফিটনেস জিমের প্রশিক্ষক মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, রাতে দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার ফলে সকালে শরীর প্রায় নির্জীব নিশ্চল থাকে। তাই এ সময়ে পেশি টানটান করা ভারী ব্যায়াম থেকে বিরত থাকা ভালো। না হলে হিতে বিপরীতও হতে পারে।
ব্যায়াম করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে বিকেল। যাঁদের ভারী ব্যায়াম করা প্রয়োজন, তাঁরা দিনের বেলার যেকোনো একটি সময় বেছে নিন। তবে দুপুরের খাবার গ্রহণের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পরে ব্যায়াম শুরু করতে পারেন।
আবার শারীরিক ব্যায়ামের কমপক্ষে ২ ঘণ্টা আগে ভারী খাবার খেয়ে নিতে হবে এবং খাবার খাওয়ার পরই যেমন ব্যায়াম করা যাবে না, ঠিক তেমনি ব্যায়াম শেষ করেই ভারী খাবার খাওয়া যাবে না। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই খালি পেটে ব্যায়াম করা যাবে না।
যেহেতু যারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না, তারা সুখী হতে পারে না এবং জাতির জন্যও তারা কোনো অবদান রাখতে পারে না। এবং সুস্থ দেহ সুস্থ মন এটাতো আমরা সকলে জানি ও বিশ্বাস করি। কাজেই আর দেরি না করে রুটিনমাফিক স্বাস্থ্য সচেতনমূলক অভ্যাসগুলি মেনে চলি। সব বাঁধা বিপত্তি এড়িয়ে চলার জন্য যুব সমাজকে এখনই সচেতন হতে হবে। ব্যায়ামকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে সকালের নাশতা খাওয়ার মতো আমাদের ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা সুস্থ থাকবো, হবো চিরসবুজ, চিরনবীন। আসুন আমরা নিয়মিত ব্যায়াম করি সুস্থ থাকি।

Previous articleআফগানিস্তানে এবার দাবার গুটি চালবে যারা !
Next articleবিয়ে করছেন অভিনেতা অপূর্ব, পাত্রী শাম্মা দেওয়ান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here