রাইসুল ইসলাম অপু
সময়ের স্রোতে যখন সমাজ এগিয়ে চলে নির্দয় গতিতে, তখন যশোরের পালবাড়ি বিহারী কলোনির এক কোণে নীরবে থেমে আছে একটি জীবন-একটি পরিবার। সেখানে উন্নয়নের আলো পৌঁছায় না, পৌঁছায় না চিকিৎসার হাত, পৌঁছায় না স্বস্তির নিঃশ্বাস। অন্ধকার ঘরে ভাঙা চৌকি আর শূন্য হাঁড়ির পাশে পড়ে থাকে মানুষের আর্তনাদ, চোখে না দেখা কিছু মানুষের অসহায় বেঁচে থাকার লড়াই। এই গল্প কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো খবরের শিরোনামও নয়-এটি আমাদের সমাজের বুকে লুকিয়ে থাকা এক গভীর মানবিক যন্ত্রণা, যা আজও নীরবে কাঁদে সাহায্যের আশায়।
চার দেয়ালের ভেতর নেই আলো, নেই স্বস্তি-শুধু আছে অসহায়ত্ব আর দীর্ঘশ্বাস। ভাঙাচোরা দুটি চৌকি, একটি হাঁড়ি আর একটি কড়াই-এই সামান্যই তাদের সংসারের সব সম্বল। মানুষের কাছে হাত পেতে, বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে তাদের জীবন।
চার ভাই ও একমাত্র বোনের এই পরিবারে নিয়তি যেন নির্মমভাবে আঘাত হেনেছে। চারজনের মধ্যে তিন ভাই ও বোন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। যিনি একমাত্র চোখে দেখতে পারতেন, সেই তুকাব্বরও আজ ১৫ বছর ধরে এক ভয়ংকর চর্মরোগে আক্রান্ত। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীনতা। চিকিৎসার অভাবে তার শরীর ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছে—প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে। তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছেন তিনি, অথচ পাশে নেই চিকিৎসা, নেই সহানুভূতির হাত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তুকাব্বরের শরীরে বাসা বেঁধেছে দুর্লভ ও ভয়াবহ রোগ ‘ওলমস্টেড’। দীর্ঘদিনের অযত্ন আর চিকিৎসাহীনতায় তার পায়ের ক্ষত স্থানে ধরেছে পচন। দুর্গতির ওপর দুর্যোগ হয়ে, এক মাস আগে এক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় তার একটি পা। সেই থেকে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও নেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি।
তুকাব্বরের পরিবারে এখন সদস্য বলতে আছেন কেবল তার একমাত্র বোন-যিনি নিজেও সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। একদিকে ভাইয়ের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া পচা ক্ষতের গন্ধ, অন্যদিকে অনাহারের তীব্র যন্ত্রণা-সব মিলিয়ে এই ভাই-বোনের সংসার যেন প্রতিদিনের এক অসহনীয় আর্তনাদ। চোখে না দেখা এই বোনের পক্ষে অসুস্থ ভাইয়ের সেবা করা তো দূরের কথা, বাইরে গিয়ে মানুষের কাছে সাহায্য চাইবার সামর্থ্যও নেই।
অন্য ভাইরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের ঘরে এক মুঠো চালও নেই। ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। বোন নিজেই চোখে দেখে না-সে কীভাবে ভাইয়ের দেখাশোনা করবে?”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাঝে মাঝে কেউ দয়া করে খাবার দিলে তাদের পেটে দানাপানি জোটে। না হলে অনাহারই তাদের নিত্যসঙ্গী। তারা আবেগভরা কণ্ঠে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন ও সরকারের কাছে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
মানবিক এই বিপর্যয়ের মুখে সামান্য আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ‘আমরা সবাই এক’ সামাজিক সংঘ। তবে প্রয়োজন যে কতটা গভীর-তা ভাষায় বোঝানো কঠিন।
এ বিষয়ে ডা. গোলাম মোর্তজা বলেন, “তার শরীরে বাসা বেঁধেছে ভয়ংকর রোগ ‘ওলমস্টেড’। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হওয়ায় পায়ের ক্ষতস্থানে পচন ধরেছে। অবিলম্বে চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
পালবাড়ি বিহারী কলোনির সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন-এই সমাজে কি একজন মানুষকে এভাবে পচে মরতে হবে? সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ আর মানবিক হৃদয়গুলো যদি এগিয়ে আসে, তবে কি বাঁচানো যাবে না তুকাব্বরকে? অন্তত একজন মানুষকে যদি আবার কর্মক্ষম করে তোলা যায়, তবে এই পরিবারটি হয়তো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।
এই গল্প কেবল দারিদ্র্যের নয়-এটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়ানো এক প্রশ্ন। আমরা কি শুনব এই নীরব কান্না? নাকি চোখ ফিরিয়ে নেব, সমাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাব-পিছনে ফেলে রেখে যাব অন্ধকার এক মানবিক ট্র্যাজেডি?
