ঢাকা অফিস
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন। মামলা, নিষেধাজ্ঞা, প্রচারণা আর নির্বাসনের ভার নিয়ে কাটানো এক দীর্ঘ সময়ের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে ফিরেছেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ফেরা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়—এ যেন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে ভাঙতে হবে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্মিত একতরফা ‘নেতিবাচক বয়ান’ এবং নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে দেশের মানুষের সামনে।
ফেরার পর থেকেই তারেক রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপ, বক্তব্য ও আচরণ রাজনীতির অঙ্গনে তৈরি করছে নতুন আলোড়ন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—যারা গত ১৬-১৭ বছর ধরে তারেক রহমানকে চিনেছে কেবল নিষেধাজ্ঞা আর প্রচারণার মধ্য দিয়ে—তারাই আজ সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী ও আকৃষ্ট।
ভাঙা স্বপ্নের জায়গায় নতুন প্রত্যাশা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা দেখেছিল এক নতুন ভোরের স্বপ্ন। রাজপথে বুক পেতে দেওয়া ছাত্রনেতাদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল প্রবল আশাবাদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলনের চেতনা ঝাপসা হয়ে যায় বলে মনে করছেন অনেকেই। সাধারণ মানুষের অভিযোগ—তাদের আবেগ ও আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মোহভঙ্গের জায়গাতেই তৈরি হয় এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা। মানুষ বুঝতে শুরু করে—আবেগ দিয়ে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও সংযম। আর ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই সংযত ভাষা, প্রতিহিংসাহীন বক্তব্য আর পরিকল্পিত রাজনীতির মাধ্যমে সামনে আসেন তারেক রহমান।

তরুণদের চোখে ‘ভিন্ন এক নেতা’
নাহিদ-সারজিসদের প্রতি যে ভরসা দ্রুত কমছে, তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশার পারদ ঠিক ততটাই দ্রুত বাড়ছে। কারণ, তরুণরা এখন আর কেবল স্লোগান নয়—তারা দেখতে চায় পরিকল্পনা, সংস্কার ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন,
“তরুণরা এখন আবেগী বক্তব্যের চেয়ে অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই জায়গায় তারেক রহমানের সংযত আচরণ ও বক্তব্য তাকে নতুন করে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।”
রাজনীতি নয়, মানবিকতার ভাষা
স্বদেশে ফিরে তারেক রহমান কেবল রাজনৈতিক সভা-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবার, জুলাই বিপ্লবে আহত ও শহীদদের স্বজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তার আচরণ বহু মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। প্রটোকল ভেঙে আহতদের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো, তাদের হাত ধরা, কান্নারত শিশুদের কথা শোনা—এসব দৃশ্য রাজনীতির চেনা ফ্রেম ভেঙে দিয়েছে।
রিকশা ও ভ্যানচালকদের সঙ্গে বসে তাদের জীবনসংগ্রামের কথা শোনা কিংবা তরুণ শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের উপহার গ্রহণ—সব মিলিয়ে তারেক রহমানকে অনেকেই দেখছেন একজন ‘পিপলস লিডার’ হিসেবে।
শোকেও সংযম, প্রতিশোধ নয় সৌজন্য
মায়ের মৃত্যুতে তারেক রহমানের আচরণও দেশের মানুষের মন জয় করেছে। জানাজায় দাঁড়িয়ে প্রতিহিংসার ভাষা নয়, বরং বিনীত কণ্ঠে ঋণ শোধের আহ্বান—রাজনীতির ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শোকসভায় দর্শক সারিতে বসে থাকা, মঞ্চ এড়িয়ে যাওয়া—এই সংযম তরুণদের কাছে তাকে আলাদা করে তুলেছে।
আশার আলো, তবে সতর্কতার ঘণ্টা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমানকে ঘিরে এই বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তা যেমন আশার, তেমনি ঝুঁকিরও। অতীতের ‘হাওয়া ভবন’ বা চাটুকার বেষ্টনীর পুনরাবৃত্তি হলে এই জনজোয়ার ভাটায় রূপ নিতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত তার আচরণে তোষামোদের প্রতি অনাগ্রহই স্পষ্ট।
শেষ কথা
তারেক রহমান এখন আর শুধু একটি দলের নেতা নন—তিনি হয়ে উঠছেন কোটি মানুষের প্রত্যাশার প্রতীক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক সম্ভাব্য ‘চেঞ্জমেকার’। প্রতিহিংসা নয়, সংস্কার ও পুনর্গঠনের রাজনীতি—এই পথে তিনি কতদূর যেতে পারেন, তা নির্ধারণ করবে আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন।
তরুণরা এখন তাকিয়ে আছে—
তারেক রহমান কি সত্যিই হবেন সেই নেতা, যিনি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কারিগর?
উত্তর দেবে সময়, আর জনগণের রায়।
