কল্যাণ ডেস্ক
ঈদকে সামনে রেখে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে উত্তরাঞ্চলের পথে রওনা দিয়েছিলেন তুহিন ও তার বাবা নজরুল ইসলাম। সামান্য ভাড়া বাঁচাতে তারা বেছে নিয়েছিলেন রডবোঝাই একটি ট্রাক। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫ জন। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন তুহিনের বাবাও।
সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় উত্তরবঙ্গগামী লেনে রডবোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে ভর্তি করা হয়েছে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে।
দুর্ঘটনার পর বাবাকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যান তুহিন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“বাবা তুমি না আমাকে বাড়িতে নিয়ে প্যান্ট-শার্ট কিনে দেবে! এখন আমার প্যান্ট-শার্ট লাগবে না, লাগবে বাবা তোমাকে।”
চট্টগ্রামে হকারি করতেন তুহিন ও তার বাবা। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে ট্রাকে বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তুহিন। ঘুম ভাঙতেই দেখতে পান ভয়াবহ সেই দৃশ্য—ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে আছে, চারদিকে লাশ আর আহতদের আর্তনাদ। বাবার শরীর ট্রাকের নিচে আটকে আছে।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তুহিন বলেন,
“আগে কেন ঘুম থেকে জাগলাম না! জেগে দেখি আমার আব্বুর শরীর ট্রাকের মধ্যে আটকা। আমি বেঁচে গেলাম, কিন্তু আব্বুকে আর বাঁচাতে পারলাম না। তোমাকে আমি কোথায় পাব বাবা!”
তুহিন জানান, তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। ঈদে কম খরচে বাড়ি ফিরতেই তারা রডবোঝাই ট্রাকে ওঠেন। চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। পরে ফেনী থেকেও ওঠেন অনেকে। অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে নন-এসি বাস ভাড়া প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। অথচ তারা চারজন মিলে মাত্র ২ হাজার ৩০০ টাকায় ট্রাকে ওঠেন। অর্থাৎ জনপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা কম ভাড়ার আশাতেই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বেছে নিয়েছিলেন তারা।
স্থানীয়দের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। ট্রাকটি খাদে পড়ে দুমড়েমুচড়ে গেলে অনেকে বের হওয়ারও সুযোগ পাননি।
তুহিনের অভিযোগ, দুর্ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু হলে আরও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারত বলেও দাবি করেন তিনি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালান। পরে ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার কাজের কারণে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার ফুয়াদ রুহানি জানান, উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে এবং এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
