অভিযানে ছোট মাছ ধরা পড়লেও অধরাই ‘গডফাদার’, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে অভিযান
নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র যেন ভিন্ন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদকের কারবার চললেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় মাপের কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা না দিয়ে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি সাজা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে মাদক নির্মূলে অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া, কয়লাপট্টি, ষষ্ঠীতলা, রেলগেট পশ্চিমপাড়া, বারান্দীপাড়া ও বড়বাজার এলাকার কয়েকটি স্পটে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলছে কোরেক্স উইন, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজার ব্যবসা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতাদের আনাগোনায় এসব এলাকা পরিণত হয়েছে মাদকের অভয়ারণ্যে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়ার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী রুমা, আজগর আলী গেদার স্ত্রী বেবী, বেবীর বোনের মেয়ে ও রায়পাড়া জামতলা ওয়াসিমের স্ত্রী ফিরোজা, কয়লাপট্টির হোসেন মরা, তার স্ত্রী আসমা, মা সাহিদা সাই, ছোটর স্ত্রী শিউলি বেগম, মুরগি রহিম, তার স্ত্রী দুলারী, মেয়ে সুরাইয়া, ইসরাইল ড্রাইভারের ছেলে সজল, ষষ্ঠীতলার রবিউল, সাইফুলের স্ত্রী হাসিনা, মৃত হাফিজুর রহমান মরার স্ত্রী রেখা, মজিবরের স্ত্রী জোহরা, করিম বেকার ছেলে সবুজ, রেলগেট পশ্চিমপাড়ার লাইলী, জোসনা, পিচ্চি রাজার স্ত্রী পিয়া, পিয়ার মা টেরি বেবী, তনু, বারান্দীপাড়ার মিনা, ইনছান এবং বড় বাজারের ঝালাইপট্টি এলাকার সঞ্জয় প্রকাশ্যেই মাদকের কারবার করে যাচ্ছে। এরমধ্যে মুরগি রহিম, সজল, তাজু বিভিন্ন বাহিনীর সোর্স বলে পরিচয় দেয়। শুধু তাই নয় অন্যান্য কারবারিদের কাছ থেকে মাসোয়ারা তুলে থাকে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদক সেবী ও খুচরা কারবারিরা এদের কাছ থেকে কোরেক্স, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজাসহ বিভিন্ন প্রকারের মাদক নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, চিহ্নিত কয়েকজন কারবারি নিজেদের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর “সোর্স” পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। শুধু তাই নয়, তারা অন্য কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে থাকে। স্থানীয়দের দাবি, এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে নানা ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।
একাধিক সূত্রের দাবি, যশোরে আসা অধিকাংশ মাদক কক্সবাজার ও ভারত সীমান্তবর্তী বেনাপোল দিয়ে প্রবেশ করছে। পরে সেগুলো জেলার বিভিন্ন স্পটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে কোরেক্স উইন, ট্যাপেন্টাডল ও ইয়াবার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযানে জব্দ হওয়া কিছু মাদক গোপনে আবার বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কাজে কয়েকজন কথিত সোর্স ও মাদক কারবারি জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কয়লাপট্টি এলাকার এক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের পর ঘটনাস্থলেই বড় অংকের টাকার বিনিময়ে নিয়মিত মামলা না দিয়ে মোবাইল কোর্টে মাত্র কয়েকদিনের সাজা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একইভাবে আরেক নারী কারবারিকেও আটক করে স্বল্পমেয়াদি সাজা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে রায়পাড়া জামতলা এলাকার এক নারী কারবারিকে ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক হলেও মামলায় কম পরিমাণ দেখানো হয়। বাকি মাদক কোথায় গেছে—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কারবারি আটক হলেও বড় চালান উদ্ধার কিংবা গডফাদারদের গ্রেপ্তারের দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সচেতন মহলের দাবি, প্রকৃত মাদক সিন্ডিকেট ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে যশোরকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পারভীন আক্তার বলেন, “নতুন করে কোনো বিশেষ অভিযান নয়, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, আবার অনেকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও দেওয়া হচ্ছে।”
