Sunday, October 25
, ২০২৫

ঢাকা অফিস
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে গতকাল (২৫ অক্টোবর) রাতে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরাও সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে টোকিওর উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সোমবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে তাঁদের বহনকারী উড়োজাহাজটি নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে তিনি টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অবস্থান করবেন।
শীর্ষ বৈঠকে গুরুত্ব পাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক :
সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের চলমান মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তারেক রহমান।
এর আগে সোমবার জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের সভাপতি তারো আসো, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন তিনি।
জাপানি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ :
সফরের তৃতীয় দিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
এ ছাড়া জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক এবং তাঁর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক হবে। পাশাপাশি জাপানের আরও ১৪টি কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি দলীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিকেলে টোকিওর জেট্রো ভবনে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। পরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কমিউনিটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
শিল্প ও জ্বালানি প্রযুক্তি দেখতে যাবেন কারখানায় :
সফরের অংশ হিসেবে জাপানের শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে টোকিও থেকে নাগোয়া যাবেন তিনি। সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করবেন। পরে টয়োটা সুসো করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোশিমিতসু ইমাইয়ের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন।
এরপর টোকিও ফিরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৯ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টায় তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প খাতে দেশটির দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে সেই সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি, ঋণের শর্ত সহজ করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের পথ তৈরি হতে পারে।

Share.
Leave A Reply