প্রেসক্রিপশনে লিখছেন চিকিৎসক
দামে অন্ধকারে রোগীরা
জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
রুহুল আমিন
যশোরের ওষুধ বাজারে ভারতের অস্তিত্বহীন ও বিলুপ্ত কয়েকটি কোম্পানির ওষুধ, কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনলাইনে অনুসন্ধান করলেও এসব কোম্পানির অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য তথ্য মিলছে না। অথচ যশোরের বিভিন্ন চিকিৎসক নিয়মিত এসব কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দেশের অনেক ওষুধ কোম্পানির ওষুধের পাতায় মূল্য উল্লেখ না করায় রোগীদের অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সাধারণ মানুষের দাবি, চিকিৎসক যে কোম্পানির ওষুধ লিখে দেন, সেটিই কিনতে বাধ্য হন রোগীরা। কিন্তু সেই কোম্পানি আসল, নকল নাকি অস্তিত্বহীনতা যাচাই করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। ওষুধের গায়ে মূল্য উল্লেখ না থাকায় দোকানদার যে দাম দাবি করছেন, সেই দামেই কিনতে হচ্ছে। এতে রোগীরা এক ধরনের ‘অন্ধকারে’ থেকে ওষুধ নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, যশোরে ভারতের ‘মায়া’ ও ‘জি এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামে কয়েকটি অস্তিত্বহীন বা বিলুপ্ত কোম্পানির ওষুধ, ক্রীম, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ ও সাবান ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কিছু চিকিৎসক এসব পণ্য প্রেসক্রিপশনে লিখছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ীও এসব পণ্য বিক্রিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোরের বিভিন্ন ড্রাগ মার্কেটে ভারতের কয়েকটি বিলুপ্ত কোম্পানির পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ‘মায়া’ কোম্পানির ওলিগো কেয়ার, ওভা কেয়ার ও ওলিগো কেয়ার ফুড নামের ওষুধ যশোরের বিভিন্ন ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। গাইনি চিকিৎসকদের একটি অংশ হরমোনজনিত সমস্যার জন্য এসব ওষুধ লিখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ভারতে এই কোম্পানির কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
একইভাবে এক সময়ের পরিচিত ভারতীয় কোম্পানি ‘জি এম ইন্টারন্যাশনাল’র ক্রীম, জি এমটার শ্যাম্পু, জি এম সিক্সটি ফেসওয়াশ ও ড্রন্ট টি এম নামের পণ্যও যশোরের বাজারে মিলছে। চর্ম, যৌন ও এলার্জি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকে এসব পণ্য প্রেসক্রাইব করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ভারতের কয়েকটি সাবান ও শ্যাম্পু যশোরে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হলেও ভারতে সেগুলোর দাম ৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনের ফার্মেসিগুলোতে এসব পণ্যের বিক্রি বেশি বলে জানা গেছে। শহরের কিছু ড্রাগ মার্কেটেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, উত্তরবঙ্গ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। যশোরের বিভিন্ন ফার্মেসিতে ঝিনাইদহের রিপ্রেজেন্টেটিভরা ফেরি করে এসব ওষুধ বিক্রি করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালে পাস হওয়া ওষুধ ও কসমেটিক আইন অনুযায়ী নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সন্তান না হওয়ায় আমার স্ত্রী গাইনি চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনলাইনে খুঁজে দেখেছি, মায়া কোম্পানির কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তারপরও বাধ্য হয়ে ওই কোম্পানির হরমোনের ওষুধ কিনতে হচ্ছে।’
আরেকজন রোগী বলেন, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে একটি সাবান ও শ্যাম্পু ৭০০-৮০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। পণ্যটি আসল না নকল, সেটা জানার কোনো উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে জি এম ইন্টারন্যাশনালের ক্রীম ব্যবহার করছি। পরে জানতে পেরেছি কোম্পানিটির অস্তিত্বই নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এসব পণ্য অনেক সময় বিক্রয় প্রতিনিধিরা গোপনে সরবরাহ করেন। কিছু চিকিৎসককে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। রোগী যাতে ফিরে না যায়, সে কারণে অনেক ফার্মেসি মালিকও এসব পণ্য মজুদ রাখেন।
যশোর জেলা ড্রাগ মালিক সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিন বিলু বলেন, এ ধরনের তথ্য আমাদের জানা নেই। পরিদর্শনেও পাইনি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফার্মেসি মালিকদের নিয়মিত সতর্ক করা হয়, যাতে নকল, ভেজাল বা অস্তিত্বহীন কোম্পানির ওষুধ বিক্রি না করা হয়।
যশোর জেলা ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক সুলতানা রিফাত ফেরদৌস বলেন, আমরা নিয়মিত ফার্মেসিতে অভিযান চালাই। নিম্নমানের, নকল বা ভেজাল ওষুধ পেলে জব্দ করা হয় এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়। ভারতের অস্তিত্বহীন কোম্পানির ওষুধ বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল সাদিক রাসেল বলেন, যেসব চিকিৎসক এ ধরনের কোম্পানির ওষুধ লিখছেন, প্রমাণ পেলে তাদের কৈফিয়ত তলব করা হবে। প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
