ফিচার ডেস্ক
ভোরের নরম আলো ছুঁয়ে যায় মিরপুর ডিওএইচএস-এর অলিগলি। তখনও পুরো মহল্লা ঘুমে মগ্ন। কিন্তু দুই ছোট ইলেকট্রিক গাড়ি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। প্রতিটি গাড়িতে সাজানো আছে আলু, শিম, গাজর, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি—সবই ধুয়ে কেটে ‘রেডি টু কুক’ অবস্থায়। মহল্লার বাসিন্দারা ঘুম ভাঙতেই পেয়ে যাচ্ছেন বাজার তাদের দরজায়।
এই অভিনব উদ্যোগের পেছনে আছেন মাহমুদা ইয়াছমিন। একসময় ব্যাংকের হিসাবনিকাশে ব্যস্ত দিন কাটাতেন। কিন্তু নিজের পরিবার ও নিজের সময়—সব মিলিয়ে জীবন যেন চাপে ভরা। সেই চাপ মুক্তির খোঁজে, স্বাধীনতা এবং কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় তিনি একদিন ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন।
“চাকরিজীবী মানুষের জীবন খুবই চেনা আমার। সময়ের অভাব, সকালে বাজারের ঝক্কি, বিকেলে রান্নার চাপ—সবই আমি ভেবেছি। তাই এমন কিছু শুরু করতে চেয়েছি যা তাদের জীবন সহজ করে দেবে,” বললেন মাহমুদা। স্বামীর পরামর্শে তিনি শুরু করেন ‘কুক ফ্রেশ’—একটি ভ্রাম্যমাণ সবজি প্রজেক্ট, যা রান্নার সময় বাঁচায়।
ভ্রাম্যমাণ সবজি বাজার: দরজায় বাজার
দুজন ডেলিভারি ম্যান সকাল ৮টা থেকে কার্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান। গাড়ি ঘিরে তাজা সবজি সাজানো, প্রতিটি প্যাকেট মন দিয়ে ধুয়ে কাটা। অনলাইন বা ফোন অর্ডার দিলে তা পৌঁছে যায় বাসার দরজায়। প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় ২০০ কেজি সবজি। গাড়িতে এমন সুবিধা থাকায় ক্রেতারা ঝটপট রান্না করতে পারছেন—কাটাকুটি আর ঝামেলা নেই।
“মানুষের জন্য কিছু করার আনন্দটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। আমাদের কার্ট দেখে কেউ প্রথমে ভেবেছিল অনেক দাম হবে। কিন্তু বাস্তবে দাম স্বাভাবিক, সুবিধা বিরাট,” বললেন মাহমুদা।
কম সময়, বেশি সুবিধা
‘কুক ফ্রেশ’ প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় বাজার থেকে তাজা সবজি সংগ্রহ করে। তারপর শুরু হয় বাছাই, ধোয়া এবং কেটে প্যাকেটিং। প্রতিটি গাড়িতে থাকে ‘রেডি টু কুক’ প্যাকেট। দাম ৫৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে, যা আস্ত সবজির তুলনায় ২০–৩০ টাকা বেশি। তবে সময় সাশ্রয়ের সুবিধা এই ছোট অতিরিক্ত খরচকে ম্লান করে দেয়।
শীতকালে আলু, গাজর, শিম, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, বেগুনসহ মৌসুমি সবজি থাকে কার্টে। সারাদিনের বেশিরভাগ পণ্য বিক্রি হয়ে যায়; অবিক্রীত অংশ যায় স্থানীয় হোটেলে।
ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা
সরকারি তিতুমীর কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিলকিস আক্তার বলেন, “কোনোদিন দেখা যায় হাতে সময় নেই, দ্রুত রান্না করতে হবে। তখন এখান থেকে সবজি কিনে ঝটপট রান্না করতে পারি। সত্যিই সময় বাঁচে।”
অবিবাহিত চাকরিজীবী মোহাম্মদ দুলাল আহমেদ বলেন, “এখন বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কাটাকুটি নেই। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু কিনি, ধুয়েই রান্না শুরু করি। জীবন সহজ হয়ে গেছে।”
মাহমুদা জানালেন, এই সেবা শুধু উচ্চবিত্ত নয়, রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, চাকরিজীবী—সবাই গ্রহণ করছে। এটি তাদের সময় বাঁচাচ্ছে এবং জীবনকে সহজ করছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
“সবজি পচনশীল, তাই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। জনবল বেশি লাগে, সময় বেশি লাগে। ধারণাটি নতুন, তাই বিশ্বাস অর্জনও চ্যালেঞ্জ,” বললেন মাহমুদা।
তবুও তিনি আশাবাদী। তিনি চান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে এই উদ্যোগ ছড়িয়ে দিতে। ভবিষ্যতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে কৃষক এবং গ্রাহক—দু’পক্ষই লাভবান হন।
“আমাদের লক্ষ্য একটাই—মানুষের সময় বাঁচানো। মানুষ হাসবে, আমরা সফল,” বললেন মাহমুদা ইয়াছমিন।
