‘এক মাসের ১৩শ’ টাকার চাল কিনতে হচ্ছে ১৭শ’ টাকায়। চিকিৎসা খরচও বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেলসহ প্রসাধনী পণ্য কিনতে লাগতো ৭শ’ টাকা। এখন পণ্য কম কিনেও ১২শ’ টাকায় কুলাচ্ছে না।’
সুনীল ঘোষ: নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। বৈশ্বিক মূল্য পরিস্থিতি ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির ঘায়ে প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে টাকা। কমছে টাকার মান। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ কুলিয়ে উঠতে পারছে না। কম খেয়েও আর সামাল দিতে পারছে না। এই চাপ সামাল দিতে সীমিত আয়ের অনেকেই মাছ-মাংস খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ তাদের আয় দিয়ে এই ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে পারছেন না। হিমশিম খাচ্ছেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছোট পদের কর্মচারীরাও। তবে ভাগ্য বদলের সম্ভাবনা একদমই ক্ষীণ-বলছেন ভুক্তভোগী মহল। উল্টো হতাশা বাড়ছে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
যশোরের ঝিকরগাছার বারবাকপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। তিনি বলেন, কপালে জোটেনি ভালো কোনো চাকরি। না পেরেছি ছোট-খাটো কোন কর্ম করতে। মহামারি করোনাভাইরাসের দু’বছরে সহায় সম্বল বেচে-কিনে খেয়েছি। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, এমনকি স্ত্রীর গহনাও বেচাবিক্রি হয়ে গেছে। ভাই-বোনের মধ্যে ভাগাভাগীর পর পৈত্রিক সম্পত্তি জুটেছে মাত্র সাড়ে ৪ কাঠা জমি। যৌবনে ছোট-খাটো পেশায় সম্পৃক্ত হতে লজ্জাবোধ করেছি। কিন্তু আজ চলিশোর্ধ বয়সে ফেরি করে ফল বিক্রি করছি। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে সবার অগোচরে সাইকেলে আম নিয়ে চলে আসি যশোর শহরে। পেঁয়ারা ও শাখ আলুসহ মৌসুমী ফল বিক্রি করে সংসারের ঘানি টানছি।
আমিরুল বলেন, বাবাকে নিয়ে ৪ সদস্যের সংসার। মাসে ৩০ কেজি চাল কিনতাম ১৩শ’ টাকায়। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ১৭শ’ থেকে ১৮শ টাকায়। চিকিৎসা খরচও বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেলসহ প্রসাধনী পণ্য কিনতে মাসে লাগতো ৭শ’ টাকা। এখন পণ্য কম কিনেও ১২শ’ টাকায় কুলাচ্ছে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন যে আয় হয় তাতে কোনো ভাবেই সংসার চালানো সম্ভব হয় না। প্রতি মাসেই ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ঘাটতি পড়ছে।
কথা হয় টাইলস মিস্ত্রি রানার সাথে। তার মাসে আয় ১০-১২ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বাপের ভিটা যশোর সদরের ভেকুটিয়া গ্রামে বসবাস করি। ঘর ভাড়া লাগে না। বছর খানেক আগেও যা আয়, তাতেই সংসার চলতো। দায়-দেনা তেমন হতে হয়নি। এখন চাল কিনতেই বাড়তি খরচ হচ্ছে ৯শ’ টাকা। ৪৫ টাকা কেজির চাল ৬০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। তেল, সাবান, ওয়াশিং পাউডারসহ নিত্যপণ্যের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। নুন আনতে পান্তা ফুরাচ্ছে মন্তব্য করে রানা বলেন, মাসে ব্যয় বেড়ে গেছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। কিন্তু আয়-রোজগার যা ছিল তাই রয়েছে।
চৌগাছার পাতিবিলা গ্রামের বাসিন্দা শওকত হোসেন স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচ্ছন্নতা কর্মী। ২০১৬ সালে চাকরিতে যোগ দেন শওকত। বর্তমানে যশোর শহরের রাসেল চত্বর সংলগ্ন পরিবার-পরিকল্পনা ক্লিনিক্যাল সুপার ভিশন কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট (পিসিএসটি) অফিসে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, সর্বসাকুল্যে বেতন পাই ১৬ হাজারের একটু বেশি। বেতনেই চলে স্ত্রী ও ৩ কন্যা নিয়ে তার সংসার। গত এক বছরে এক টাকাও বেতন বাড়েনি। কিন্তু দ্রব্যমূল্য চড়া হওয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে ৫ হাজারের বেশি। চাল, ডাল, আটা, ভোজ্য তেল, মাছ-মাংস ও মসলাসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য কিনতে চলে যাচ্ছে এই টাকা। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি জানিয়ে শওকত বলেন, বেতন না বাড়লে সংসারের ঘানি টানা সম্ভব হবে না।
উপ-শহরের আজগার আলী একজন মুদি ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, দোকানের পণ্য বাকিতে চলে যাচ্ছে। চাকরিজীবীরাও মাসিক টাকা শোধ করতে পারছেন না। পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বাজেটের ভেতরে কিছুই হচ্ছে না। মাসিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিমাসেই কিছু টাকা টাকা বকেয়া থেকে যাচ্ছে। এরফলে দোকানে মাল তুলতে দায়-দেনা করতে হচ্ছে। বাজারের পাইকারী ব্যবসায়ীদের চাপে নাভিশ^াস উঠছে। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে মনে হয় দোকান গুটিয়ে দিই কিন্তু ৩ লক্ষাধিক টাকার উপরে বকেয়া পড়েছে। দোকান গুটিয়ে দিলে এসব টাকা আদায় হবে না। এসব চিন্তা করে পণ্য তুলছি কম। বকেয়া আদায়ের চেষ্টা করছি কিন্তু কোনোভাবেই হচ্ছে না। উল্টো প্রতিমাসে ক্রেতার কাছে বকেয়া বাড়ছে। আজগর বলেন, নিজের সংসারে প্রতিমাসে খরচ ছিল ১৮ হাজার টাকা। গত এক বছরে বেড়ে ঠেকেছে ২৬/২৭ হাজারে। এভাবে টিকে থাকা কঠিন।
পল্লী চিকিৎসক আব্দুর রউফ সদরের বীরনারায়নপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যা রোজগার হয় তাতেই সংসারে স্বচ্ছল ছিল। এখন ওষুধপত্র নিয়ে মানুষ টাকা দিতে পারছেন না। এরফলে সংসারে টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে চাল-আটা, ময়দা ও নিত্যপণ্য কিনতে দেড়গুণ ব্যয় বেড়ে গেছে কিন্তু সেভাবে রোজগার বাড়েনি। তিনি বলেন, আগে ২২ হাজার টাকায় সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়া খরচ লাগতো। এখন ৩০ হাজারেও কুলাচ্ছে না।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় যশোর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর মোশারফ হোসেন বাবুর সাথে। তিনি বলেন, বৈশি^ক মহামারির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ শ্রেণির মানুষ সব কষ্টে থাকে। তাদের আয়ের সাথে ব্যয়ের বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে।