নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু পরিবার আছে, যাদের নাম উচ্চারিত হলেই উঠে আসে ত্যাগ, সংগ্রাম আর আদর্শের দীর্ঘ পথচলার কথা। সেই ধারারই এক উজ্জ্বল অধ্যায় সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম–এর পরিবার। আর সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের নাম—অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এটি যেন একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সংগ্রামের স্বীকৃতি এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল।
উত্তরাধিকার নয়, দায়িত্বের ভার
তরিকুল ইসলাম ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতির এক প্রভাবশালী নাম। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী এবং পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–র দুই মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দক্ষ সংগঠক ও দৃঢ় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
এই রাজনৈতিক পরিবেশেই বড় হয়েছেন অমিত। কিন্তু শুধুমাত্র ‘সাবেক মন্ত্রীর সন্তান’ পরিচয়ে থেমে থাকেননি তিনি। বরং সময়ের কঠিন পরীক্ষায় নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন মাঠের কর্মী, সংগঠক ও আন্দোলনের সামনের সারির নেতা হিসেবে।
দমন-পীড়নের সময়ের লড়াকু মুখ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির রাজনীতিতে ছিল মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা ও দমন-পীড়নের দীর্ঘ ছায়া। সেই সময়েই অমিত যশোরে দলকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেছেন। অর্ধশতাধিক মামলার আসামি হয়েছেন, একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। তার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি—খুলনা বিভাগের অনেক জেলায় যখন কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন যশোরে রাজপথে বিএনপির পতাকা সচল রেখেছিলেন অমিত। এই ধারাবাহিকতা তাকে শুধু নেতা নয়, কর্মীদের কাছে এক ‘আস্থার নাম’-এ পরিণত করেছে।
সাংগঠনিক পরিসর থেকে জাতীয় নেতৃত্বে
২০০০ সালের দিকে যশোর জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। ২০১৬ সালের এপ্রিলে তিনি খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হন। বর্তমানে বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ (সদর) আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন অমিত। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি জাতীয় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে প্রবেশ করেন।
এই মন্ত্রণালয় কেবল একটি প্রশাসনিক খাত নয়—এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি ও নাগরিক জীবনের চালিকাশক্তি। রমজানে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কিংবা বোরো মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করার মতো বাস্তব ইস্যু এখন তার দায়িত্বের অংশ। ফলে রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে বাস্তব চ্যালেঞ্জও।
শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও বহুমাত্রিক পরিচয়
১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট যশোরে জন্ম নেওয়া অমিতের শিক্ষাজীবনও সমৃদ্ধ। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এ প্রাণরসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনে বিতর্কচর্চায় সক্রিয় ছিলেন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের হয়ে টিভি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তার মা অধ্যাপক নার্গিস বেগম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। পারিবারিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন বলে ঘনিষ্ঠরা জানান।
ব্যবসা ও সামাজিক সম্পৃক্ততা
অমিত পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ল্যাবস্ক্যান মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড ও লোকসমাজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া যশোরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
এই বহুমাত্রিক সম্পৃক্ততা তাকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
প্রত্যাশা, প্রতীক ও রাজনৈতিক বার্তা
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষায়, অমিতের মন্ত্রিত্ব ‘ত্যাগের পুরস্কার’। তাদের বিশ্বাস—এই দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন শক্তির সঞ্চার করবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রাজনীতির ইতিহাসে উত্তরাধিকার পাওয়া সহজ, কিন্তু তা ধরে রাখা কঠিন। তরিকুল ইসলামের স্মৃতি, দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা—এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এখন সময়ই বলে দেবে—তিনি কেবল একজন নেতার সন্তান, নাকি নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এক নতুন অধ্যায়ের নির্মাতা।
