সুজিত কুমার রায়, কয়রা (খুলনা): দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্মৃতিবহ ভয়াল ২৫ মে আজ। ১৩ বছর আগে ২০০৯ সালের এদিনে সামুদ্রিক জলো”জ¦াস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা ‘আইলা’ আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে।
মুহূর্তের মধ্যে খুলনার কয়রা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ, হাজার হাজার গবাদিপশু আর ঘরবাড়ি। ক্ষণিকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখো পরিবার। লাখ লাখ হেক্টর চিংড়ি আর ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বাঁধ আর অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
সর্বনাশা ‘আইলা’র আঘাতে শুধু কয়রায় নিহত হয় ৪৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু, আর আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ। প্রলংয়করী আইলা আঘাত আনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় অঞ্চল কয়রার মানুষের হাহাকার এতটুকু থামেনি। দু’মুঠো ভাতের জন্য জীবনের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয় পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলা কবলিত এ অঞ্চলের রাস্তঘাট এখনও ঠিকমত মেরামত হয়নি। বিশাল এ জনপদে খুবই কম সংখ্যক সাইক্লোন সেন্টার রয়েছে।
দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপর শত শত মানুষ সেই সময় ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করেছে। এদের অনেকেই মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্যে দিয়ে বেড়িবাঁধকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সহায় সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তার সবটুকু জলোচ্ছ্াসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ওই সময়কার নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তার পূর্বের রূপ। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে প্রচন্ড দাপদাহে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে কৃষকরা আজো ঠিকমতো ফসল বুনতে পারছে না।
আইলা’র ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে বসবাসরত মানুষের চোখে মুখে এখনও ভয়ংকর সেই স্মৃতি। আইলায় হারেজখালি ও পদ্মপুকুর ভাঙ্গনের সেই হারেজখালি ক্লোজার এখন রিতিমত ঠিক হয়নি। এ জনপদের মানুষের যাতায়াতের পথ খুবই নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। বর্ষার দিনে এ এলাকার মানুষের নৌকায়ই তাদের একমাত্র ভরসা। আইলায় লোনা পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষি ফসল ও চিংড়ি উৎপাদন বন্ধ থাকায় গোটা এলাকাজুড়ে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সেই সময় অনেকেই এলাকা ছেড়েছে। তাদের অনেকেই আজও তাদের বাস্তভিটায় ফিরে যেতে পারেনি।
দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জানান, তার ইউনিয়নের জোড়শিং বাজারের বেড়িবাঁধ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে। যা কোন রকম জোড়াতালি দেয়া হয়। এখনও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ওই এলাকার মানূষ এখনও নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বাঁধ রক্ষায় কাজ করা হলেও পাউবো কর্তৃপক্ষ কোন ব্যাবস্থা না নেয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পাউবোর আমাদী সেকশন কর্মকর্তা, বলেন ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাধ সংস্কারের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
আইলার ৯ বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধগুলোর এখনো সংস্কার হয়নি। সামান্য ঝড় কিম্বা বৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে। এ মুহুর্তে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুটি পোল্ডারে কমপক্ষে ২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপুর্ণ রয়েছে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানিসহ যে সব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, নদী ভাঙন বা বেড়িবাঁধগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করার জন্য ইে তাপুর্বে ঊর্ধ্বতন মহলের নিকট জানানো হয়েছে।