জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকি ইউনিয়নের ছত্রপাড়া গ্রামে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (ঈদের দিন) দুপুরে ঘটে যাওয়া এই সহিংসতায় একজন নিহত হয়েছেন, গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। একই সঙ্গে রক্তাক্ত স্বজনদের দেখে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে নিহতের দাদারও মৃত্যু হয়েছে, যা ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি লাল খানের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। মূলত খাসজমির দখল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের শুরু।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, কে কোন প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন—বিশেষ করে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীকে ঘিরে—এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিতর্ক চরমে পৌঁছে।
শনিবার দুপুরে ছত্রপাড়া গ্রামে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গ্রামে লোকসমাগম ছিল। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে লাল খানের ভাতিজা তরিকুলকে মারধরের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।
এর জের ধরে প্রতিশোধ নিতে লাল খানের অনুসারীরা প্রতিপক্ষকে খুঁজতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্র—বিশেষ করে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সংঘর্ষে আব্দুল হান্নান পক্ষের কুবীর কাজী (৫০) ও শিমুল কাজী (১৭) এবং প্রতিপক্ষের নেতা লাল খান (৪৫) গুরুতর আহত হন। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়।
আহতদের প্রথমে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে শিমুল কাজী মারা যান।
গুরুতর আহত কুবীর কাজীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। লাল খান কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
সংঘর্ষের পর রক্তাক্ত অবস্থায় শিমুল কাজী ও কুবীর কাজীকে দেখে ঘটনাস্থলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন নাজিম উদ্দিন কাজী (৭৫)। তিনি নিহত শিমুলের দাদা এবং আহত কুবীরের চাচা। পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
গ্রামবাসীরা জানান, ছত্রপাড়া গ্রামে বিপুল পরিমাণ খাসজমি রয়েছে। অতীতে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের স্থানীয় নেতারা এসব জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকেন। এই নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রায়ই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
ডাউকি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দার হোসেন অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দলের ভেতরে বিভাজন ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
এদিকে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ (রাসেল) বলেন, পূর্ববিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারই এই সংঘর্ষের মূল কারণ। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গ্রামে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার পর ছত্রপাড়া গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, এবং দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
