সাজেদ রহমান: চারুবালা কর নিহতের পর যশোরবাসী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। সেনানিবাসে বন্ধ করে দেয়া হয় খাবার সরবরাহ। বেকায়দায় পড়া যশোর সেনানিবাসের রসদ সরবরাহের নিশ্চয়তার অনুরোধ করছিলেন যশোর সেনানিবাসের কর্মকর্তারা। মারুফ হোসেন খোকন বলেন, ‘যশোর সেনানিবাসের পাকিস্তানি কর্নেল তোফায়েল ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ সকালে চা-চক্রের অনুরোধ করেন যশোর আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে। তার আশা ছিল বৈঠক হলে সেনানিবাসে খাদ্য-পানীয়ের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। যশোর সেনানিবাসে থাকা বাঙালি সদস্যদের কথা মাথায় রেখে সকালের চা-চক্রে যেতে সম্মত হন নেতারা। কিন্তু যেভাবে তাঁরা গেলেন সেখানে, তা পাকিস্তানিদের কাছে অভাবিত। তারা দেখে যে আওয়ামী লীগ নেতাদের বহনকারী গাড়িতে লাগান বাংলাদেশের পতাকা! সে মিটিং থেকে ফেরার সময় দেখা গেল গাড়িতে লাগান বাংলাদেশের পতাকা খুলে ফেলেছে পাকিস্তানিরা। আরও বড় বিস্ময়ের মুখোমুখি হতে হয় পাকিস্তানি কর্নেল তোফায়েলকে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের পতাকা ছাড়া ফেরত আসতে অস্বীকৃতি জানায়। অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনসহ উপস্থিত অন্য নেতাদের দৃঢ়তায় পাকিস্তানি কর্নেল তোফায়েল গাড়ি থেকে খুলে নেয়া বাংলাদেশের পতাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।
ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। কর্নেল তোফায়েল হাজির করে নতুন কৌশল। রাতে আলোচনার জন্য ডিনারে যেতে হবে আবার। কিন্তু ততক্ষণে নানান দিক থেকে খবর আসতে শুরু করেছে অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনের কাছে। যশোরের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর কাছে খবর পাঠিয়েছেন যশোরে পাকিস্তানিদের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে। ঢাকা থেকেও আসে খবর, পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। ইপিআর-এ কর্মরত সেকেন্দার আলী নিয়ে এলেন ভেতরের খবর। সব মিলিয়ে তখন আর আলোচনা নয়, যুদ্ধ প্রস্তুতিই একমাত্র কর্তব্য হয়ে উঠেছে। রাতে ডিনারে যাওয়ার বিষয়ে আলাপ হলে অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন দৃঢ়ভাবে তার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য হল, যদি তাঁরা সেখানে যান, তাহলে পাকিস্তানিরা আর তাঁদের ফিরতে দেবেনা। ওখানেই সব শেষ হয়ে যাবে। তিনি জোর দিয়ে অ্যাডভোকেট মশিয়ুর রহমানকে বললেন যে, আর যাওয়া যাবেনা। ডিনারে গেলে তারা আমাদের সবাইকে আটক করবে। যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে মতভিন্নতার সমাধান করতে ছাত্রনেতারা স্পষ্টভাবে মোশাররফের পক্ষ নিলেন। যুবনেতাদের ভেতর আলী হোসেন মনি, রবিউল আলম, শেখ আব্দুস সালাম, মশিয়ার রহমান প্রমুখ যুদ্ধপ্রস্তুতির পক্ষে এবং সেনানিবাসে যাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এরপরও রাতে মশিয়ুর রহমানের সাথে ফোনে কথা হয় অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনের। তাঁকে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পরামর্শ দেন বাসা ছাড়তে। কিন্তু মশিয়ুর রহমান ছিলেন সহজ সরল মানুষ, তাই শেষ পর্যন্ত বাসাতেই থাকেন। মশিয়ুর রহমানকে বাসা থেকে নিয়ে আসতে ছাত্রনেতা আব্দুস শহীদকে পাঠান অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন। কিন্তু বাসা ছাড়েননি তিনি। ২৬ শে মার্চ পাকিস্তানি আর্মি তাঁকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্মম নির্যাতন করে ২৩ এপ্রিল তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর লাশটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’