পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরও ভয়াবহ আঘাত হানবে।
কল্যাণ ডেস্ক
ইরানের বিপ্লবী গার্ড মঙ্গলবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকে, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘এক লিটার তেলও’ জাহাজে পাঠাতে দেবে না।
এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরও ভয়াবহ আঘাত হানবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন সোমবার বিশ্ব আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং তারা সহজে পিছু হঠতে রাজি নয়।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে এবং তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, তার নির্ধারিত প্রাথমিক চার সপ্তাহের সময়সীমার অনেক আগেই এই সংঘাত শেষ হবে। যদিও এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ বলতে আসলে কী বোঝায়, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
ইসরায়েল বলছে, তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য হলো ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা। মার্কিন কর্মকর্তারা মূলত বলছেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, কিন্তু ট্রাম্প বলেছেন, কেবল একটি অনুগত ইরান সরকারের মাধ্যমেই এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূতের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষে ইরান জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৩৩২ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন হামলা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচভাগের একভাগ এই পথ দিয়েই যায়। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর এত জোরে আঘাত করব যে, তাদের বা তাদের সাহায্যকারী অন্য কারো পক্ষে বিশ্বের ওই অংশটি আর কখনও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।’
ইরান বলছে যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত তাদের
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে তারা এই অঞ্চল থেকে কোনো তেল বের হতে দেবে না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরাই নির্ধারণ করব এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে।’
পরবর্তীতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর একটি পোস্টে ট্রাম্প তার সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার জন্য কিছু করে, তবে তাদের ওপর এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি কঠোরভাবে আঘাত হানবে আমেরিকা।’
এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ট্যাঙ্কারগুলো চলাচল করতে পারছে না এবং মজুত করার জায়গা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদনকারীরা তেল উত্তোলন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
সোমবার মোজতবা খামেনির নিয়োগ যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর ফলে তেলের বাজার লাফিয়ে বেড়েছে এবং শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। তবে ট্রাম্প যখন দ্রুত যুদ্ধ শেষের ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং রাশিয়ার জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের খবর আসে, তখন বাজার আবার উল্টো দিকে মোড় নেয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেলের ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছু দেশের’ ওপর থেকে তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। একাধিক সূত্রের মতে, এর অর্থ হতে পারে রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা, যা ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোকে শাস্তি দেওয়ার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যান্য বিকল্পের মধ্যে রয়েছে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়া অথবা মার্কিন রপ্তানি সীমিত করা।
মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার তেলের দাম ১০ শতাংশেরও বেশি কমেছে, অথচ সোমবার এটি ২৯ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বৈশ্বিক শেয়ার বাজারও কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দামের একটি বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে, কারণ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটাররা ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। সোমবার প্রকাশিত একটি রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ আমেরিকান আগামী মাসগুলোতে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন এবং মাত্র ২৯ শতাংশ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
তেল শোধনাগারে আঘাত
একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর ইরানের রাজধানী তেহরান ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের ওপর হামলার একটি বড় ধরনের আঘাত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস গেব্রেয়েসুস সতর্ক করে বলেছেন, এই আগুন খাদ্য, জল এবং বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে।
তুরস্ক জানিয়েছে যে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা ভূপাতিত করেছে। যুদ্ধের মধ্যে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় ঘটনা। ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রতিবেদনের ওপর কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা মধ্য ইরানে নতুন হামলা চালিয়েছে এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও আঘাত হেনেছে। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া হিজবুল্লাহ সীমান্ত দিয়ে হামলা চালানোর পর ইসরায়েল লেবাননে তাদের অভিযান জোরদার করেছে।
অস্ট্রেলিয়ায়, ইরানের নারী ফুটবল দলের পাঁচজন খেলোয়াড়কে মানবিক ভিসা দেওয়া হয়েছে। তারা নিজ দেশে নির্যাতনের ভয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। এছাড়া ক্যানবেরা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক নজরদারি বিমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানের হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সহায়তার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
