এম আর মাসুদ, ঝিকরগাছা
সূর্য মাথার উপর। ঘড়ির কাটা একটার দাগ ছুঁয়েছে। একটি বড়ো আমগাছে চার-পাঁচজন খাঁচা (কঞ্চি-বাঁশের তৈরি) বাঁধছেন। গাছের নিচে শতাধিক শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে একটি ব্যানারে লেখা ‘একটুখানি সহযোগিতা আগামীর সম্ভাবনা, বাংলাদেশের পাখি, বাংলাদেশের প্রাণ, পাখি বাঁচান, বাংলাদেশকে বাঁচান।’ চিত্রটি দেখা গেছে শনিবার যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের তীরে বিদ্যালয় আঙিনায় ২০টি গাছে শতাধিক এ কৃত্রিম পাখির বাসা টাঙানো হয়।
উপজেলার কুলিয়া গ্রামের মোহাম্মদ সায়েদ আলী পাখির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই কাজটি করেন। ৫৩ বছরের মোহাম্মদ সায়েদ আলী পেশায় একজন কৃষক। তবে এলাকাবাসীর কাছে তিনি সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। আর এই নামে পরিচিত হতে তাকে সময় দিতে হয়েছে ২৯ বছর। সায়েদ আলী কুলিয়া গ্রামের মৃত মাহমুদ আলী মোড়লের ছেলে।
সায়েদ আলী, ১৯৯৫ সালে নিজ গ্রামের দাখিল মাদরাসার ৩০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে শুরু করেন বিভিন্ন সামাজিক ও পরোপকার কাজ। এরপর থেকে তিনি এ কাজ করেই যাচ্ছেন। গ্রামের রাস্তাঘাট নির্মাণ, অসুস্থকে সেবাদান, দারিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা, অসহায় পরিবারে ভ্যান ও সেলাই মেশিন প্রদান, দুস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, বজ্রপাত রোধে গ্রামের রাস্তার দুই পাশে তালের আঁটি (বীজ) রোপণ, ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ, পাখির অভয়াশ্রমের জন্য গাছে ঠিলা (মাটির ছোট কলস) টাঙানো ও পুকুর বানিয়ে সেখানে মাছ খাওয়ার ব্যবস্থা এবং পাখিদের খাবার দেবার মতো বেশকিছু কাজ তিনি নিয়মিত করেন।
রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সায়েদ আলী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গাছে কৃত্রিম বাসা টাঙানোর বিষয়টি শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর নজর কেড়েছে। বিদ্যালয়ে এ কাজটি শুরু করার আগে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানও করেন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কোরবান আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন মীর ফারুক আহম্মদ। বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. হাসানুল বান্না, শিক্ষক মিজানুর রহমান, বাগবুল মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। এ সময় বক্তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির প্রয়োজনীয়তা, পাখি সংরক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৌফিক হোসেন বলে, অনুষ্ঠানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্ব জেনেছি। পাখিদের আশ্রয়ের জন্য আমিও গাছে বাসা টাঙাতে চাই। পাখির উপকারিতা ও কাজ সম্পর্কে আগে এতো জানতাম না।
রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. হাসানুল বান্না বলেন, সাদা মনের মানুষ খ্যাত সায়েদ আলী আমার বিদ্যালয় আঙিনায় গাছে কৃত্রিম পাখির বাসা টাঙিয়ে যে বিষয়টি দেখালেন, তাতে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা নেবে এবং তারাও এ কাজটিতে যুক্ত হবে বলে মনে করি।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মীর ফারুক আহম্মদ বলেন, সায়েদ আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সেবামূলক কাজ করে বেড়ান। পাশাপাশি কয়েক বছর তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ, পাখি বাঁচাতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। যা সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে। সায়েদ আলীর এ জাতীয় কাজের কারণে এলাকার মানুষ তাকে সাদা মনের মানুষ বলে ডাকে।
মোহাম্মদ সায়েদ আলী বলেন, মানুষ হিসেবে এসব কাজগুলো করা উচিৎ তাই করি। এতে আমার ছেলে সাকিল হোসেন খরচ দেন। ছেলে সাকিল একটি কোম্পানিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছে। এসব কাজ করে আমি মানসিক প্রশান্তি পাই বাকি জীবন এভাবে চলতে চাই।
