
১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি শার্শা থানার অন্তর্গত বুরুজবাগান থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করি। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পাকিস্তান আমলে মোটামুটি আধুনিক ডিজাইনে তৈরি ছিল, ১১ শয্যার হাসপাতালসহ ডাক্তারদের জন্য দুটি বাসভবন, নার্স ও প্যারামেডিকসের আবাসিক ব্যবস্থা এবং যশোর সদর হাসপাতালে রোগী আনা-নেওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও ছিল। থানাতে তখন শুধু ডাক্তাররাই প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন, এর পরবর্তী সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও থানা পশুপালন কর্মকর্তা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হয়। সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ছিলেন, যা এখন ইউএনও হিসেবে পরিগণিত।
আমি ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বুরুজবাগান থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। সাথে আমার স্ত্রী ডা. সিদ্দিকা সুলতানাও মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আমার আলোচনার বিষয়বস্তু এটা না, যেটা স্মৃতিতে স্মরণীয় তা হলো শার্শা থানার অন্তর্গত উলশী যদুনাথপুর খাল খনন।
উলশী যদুনাথপুর নাভারন মোড় থেকে বাগআঁচড়া-সাতক্ষীরা রাস্তায় কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত। থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগদানের কয়েক মাস পরই সিভিল সার্জন অফিস থেকে নির্দেশনা এলো যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর প্রকল্পের আওতায় স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের মাধ্যমে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও সেচের মাধ্যমে বোরো ধানের চাষ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রত্যয়ে পহেলা নভেম্বর ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট স্বয়ং খাল খনন প্রকল্পের সূচনা করবেন।
জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেল এই প্রোগ্রামকে সফল করার জন্য। উলশীতে আর্মি ক্যাম্প, হেলিপ্যাড এবং সরকারের সকল বিভাগের জন্য বিভিন্ন ধরনের বুথ তৈরি করা হলো। আমিও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করলাম, যেখানে সার্বক্ষণিক প্যারামেডিকস, নার্স ও প্রাথমিক চিকিৎসার সকল সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হলো।
প্রোগ্রাম অনুযায়ী ১৯৭৬ সালের পহেলা নভেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে উলশী যদুনাথপুরে প্রায় চার কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন, যা প্রায় বাইশ হাজার একর জমির জলাবদ্ধতা দূর করে পানির নাব্যতা বেতনা নদীতে নিয়ে যাবে এবং সেচের মাধ্যমে খালের দু’ধারের জমিতে বোরো চাষের ব্যবস্থা করা হবে।
তখন যশোরের জেলা প্রশাসক ছিলেন মহিউদ্দিন খান আলমগীর, যিনি পরবর্তীতে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের উপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এই স্বনির্ভর প্রকল্পের উপদেষ্টা হিসেবে জনাব মাহবুবুল আলম চাষী দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমরা অনেকবার জেলা প্রশাসক ও মাহবুবুল আলম চাষী সাহেবের সাথে খাল খনন বিষয়ে মিটিং করেছি।
তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আমাদের শিক্ষক অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনিও দুই-একবার উলশী খনন এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি একজন ভালো বক্তা ছিলেন এবং নিয়মিত টেলিভিশনে স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রোগ্রাম করতেন। একবার পরিদর্শনে এসে খনন এলাকায় সাধারণ জমায়েতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি খাওয়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং শাকসবজি খাওয়ার উপকারিতা সহজ-সরল ভাষায় বর্ণনা করেন। তখন খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মানুষের এত বেশি জ্ঞান বা সচেতনতা ছিল না। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমরাও তখন অনেক কিছু শিখেছিলাম।
ওই সফরে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব মহিউদ্দিন খান আলমগীর অস্ট্রেলিয়ান সরকারের অনুদানকৃত দুই পাশ খোলা হলুদ জিপে নিজে ড্রাইভ করে বি. চৌধুরী স্যারকে উলশীতে নিয়ে খনন কাজ সম্পর্কে অবহিত করেন।
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা উলশী ক্যাম্পে যেতে হতো। প্রতিদিন শতশত মানুষ বিভিন্ন অফিস ও সংস্থা থেকে বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে উলশীতে এসে খাল খননে অংশগ্রহণ করতেন এবং খনন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস ধরে দারুণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে এই কর্মযজ্ঞ চলেছিল।
উল্লেখ্য যে সত্তরের দশকে খননকৃত এই খাল দীর্ঘদিন অব্যবস্থাপনার কারণে আবার ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হয়তোবা রাজনৈতিক কারণে অতীতের সরকারগুলো এদিকে নজর দেয়নি। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৭ এপ্রিল সেই ঐতিহাসিক উলশী যদুনাথপুর খালের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন, আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে।
এ উপলক্ষে শার্শা উপজেলার উলশী যদুনাথপুরসহ গোটা যশোর জুড়ে দারুণ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। এক সময়কার যশোরের অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম তরিকুল ইসলামের যোগ্য উত্তরসূরি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের দিকনির্দেশনায় যশোরের পুরো প্রশাসন ও এলাকাবাসী এই প্রোগ্রামের সার্বিক সফলতার জন্য ভীষণ ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন।
একই ধরনের ব্যস্ততার সাথে এখন থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে একজন থানা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম। পুরো চিত্রটিই বারবার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে আর উলশী যদুনাথপুর তখনকার দিনে যেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাজধানীর রূপ নিয়েছিল। সেই নস্টালজিক স্মৃতি এখনও টাটকা হয়ে আছে।
থানা থেকে এখন উপজেলা হয়েছে, অনেক সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন হয়েছে, অনেক বড় বড় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, মানুষের জীবনমানের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। পঁচাত্তর বছর বয়সে আমি এই প্রকল্পের সফলতা কামনা করছি এবং খাল পুনঃখননের মাধ্যমে মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং সারা বাংলাদেশের খাল ও জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার এবং পুনঃখননের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনবান্ধব উদ্যোগে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পাবে-এই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করছি।
লেখক : অধ্যাপক, কার্ডিওলজি, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট শাহবাগ, ঢাকা এবং সভাপতি
যশোর জেলা সমিতি, ঢাকা।
