# সাময়িক বরখাস্তের পরও ‘লীজ বাণিজ্য’
# নকল রশিদ বই ছাপানোর অভিযোগ
তবিবর রহমান
যশোর জেলা পরিষদের জমি লীজ প্রদান ও নবায়ন ঘিরে একের পর এক ঘুষ কেলেংকারির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কর্মচারী আলমগীর হোসেনের কয়েকটি অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে দুর্নীতির হাড়ির খবর জানতে পেরেছেন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় গত ২ মার্চ আলমগীরের নামে যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছে জেলা পরিষদ। আর গতকাল (৪ মার্চ) ৩৭৭ জনের নামে দেয়া লীজকৃত জমির বরাদ্দ বাতিল করেছে। যা স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লীজগ্রহীতাদের জাননো হয়েছে।
জেলা পরিষদ সূত্র মতে, যশোরের ৮ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জেলা পরিষদের খন্ড খন্ড জমি রয়েছে। ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত কয়েক বছর ধরে লীজ প্রদান বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই জমিগুলো নবায়নের নামে জালিয়াতি করা হয়। একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইশারায় উচ্চমান সহকারী আলমগীর হোসেন নির্ধারিত ফি’র বাইরে মোটা অঙ্কের ঘুষ না দিয়ে কিছু কিছু আবেদনের বিপরীতে লীজ দিয়েছেন। তাও যথাযথ নিয়ম অনুসার করা হয়নি। অনেক আবেদনের ফাইল অনুমোদন, চুক্তিপত্র, ডিসিআর রশিদ জলিয়াতি করা। কিছু আবেদনই করা হয়নি। কিন্তু ডিসিআর এর রশিদ বইয়ে টাকা নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। আবার সেই টাকা সরকারের রাজস্ব খাতের জমা দেয়ার তথ্য মিলছে না। বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত থাকা আলমগীর নকল ডিসিআর বই ছাপিয়ে জমি লীজ দিচ্ছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, গতবছর ২৬ অক্টোবর যশোরে দুদকের গণশুনানিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। সেখানে তিনি বলেছিলেন ‘শুধুমাত্র কিছু পাকা কলা নিয়েছিলাম’। এরপর ৫ নভেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত শুরু করে জেলা পরিষদ।
৫০ বছরের লীজ, নবায়নে ২ লাখ টাকার দাবি :
শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়ায় কাছাড়িপটিতে অবস্থিত একটি দোকানঘর প্রায় ৫০ বছর আগে জেলা পরিষদ থেকে লীজ নেওয়া হয়। ভুক্তভোগী আব্দুল গফুর জানান, ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত নবায়ন করলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিল নবায়নের অনুমতি পেয়ে আবেদন করলে উচ্চমান সহকারী আলমগীর হোসেন সরেজমিনে পরিদর্শনে যান। অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শনের দিনই তিনি নগদ ৭ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।
পরে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ পুনরায় আবেদন করলে অফিসে ডেকে ৩৪ হাজার টাকার ডিসিআর প্রস্তুত করা হয়। তবে রসিদ দিতে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তার ভাড়াটিয়ার ছেলে শফিকের নামে একই দোকানঘর ২ লাখ টাকার বিনিময়ে লীজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
৭ শতকের বদলে ৩ শতক, তাও কৃষি জমি! :
শার্শা থানার রাড়ীপুকুরিয়া মৌজার এসএ ১৪১৩ নম্বর দাগের ৭ শতক সরকারি জমি লীজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী আব্দুল গফুরের দাবি প্রথমে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। দরকষাকষির পর ৩০ হাজার টাকা প্রদান করা হলেও ৭ শতকের বদলে মাত্র ৩ শতক কৃষি জমি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী আব্দুল গফুর বলেন, জমিতে তার অস্থায়ী বসতবাড়ি থাকলেও কৃষি জমি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়ায় ভবিষ্যতে উচ্ছেদের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
৪ লাখ টাকার দাবি, না দিলে অন্যের নামে ডিসিআর :
একই জমি ডিসিআর করে দেওয়ার নাম করে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী ১ লাখ টাকা দিতে রাজি হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে অধিক টাকার বিনিময়ে অন্য ব্যক্তির নামে ডিসিআর প্রদান করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমিতেও ‘লেনদেন’ অভিযোগ :
চৌগাছা উপজেলায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি লীজের আবেদন করা হলে প্রথমে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫৫ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। বিকাশে ৫ হাজার ও নগদে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও এখনো লীজ প্রদান করা হয়নি বলে অভিযোগ।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও অবস্থান :
জমি লিজ ও নবায়ন করা নিয়ে পদে পদে জালিয়াতি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে জেলা পরিষদ। একারণে যাদের নামে জমি লিজ ও নবায়ন করা হয়েছিল সবগুলো (৩৭৭টি) বাতিল করা হয়েছে। জেলা পরিষদ গতকাল স্থানীয় পত্রিকায় লীজ বাতিলের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ-সচিব) এসএম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় উচ্চমান সহকারী (সাময়িক বরখাস্তকৃত) আলমগীর হোসেন কর্তৃক যে সকল জমি লীজ ও নবায়ন করা হয়েছে তা অনিবার্য কারণবশত বাতিল করা হলো। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, আলমগীর হোসেন অবৈধভাবে অজ্ঞতনামা প্রিন্টিং প্রেস থেকে নকল বিবিধ আসায় রশিদ (ডিসিআর) বই ছাপিয়ে এখনও অবৈধভাবে লীজ নবায়ন করে যাচ্ছে। যা প্রতারণার শামিল ও দন্ডনীয় অপরাধ। এজন্য যশোর জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
