নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোর সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘প্রদীপ্ত স্বাধীনতা’ উধাও করে দেয়া হয়েছে। চার বছর আগে ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরির নামে ভাস্কর্যটি ধ্বংস করা হয়। পরবর্তীতে আর সেই ভাস্কর্যটি পুনঃনির্মাণ করা হয়নি। কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্যটি ধ্বংস করা হলো, আর কেন নির্মাণ করা হয়নি, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তৎকালীন অধ্যক্ষ ও বর্তমান অধ্যক্ষ একে অন্যকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি ও ভাস্কর্যটি পুনঃনির্মাণের দাবি শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের।
১৯৬৫ সালে যশোর সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। নারী শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে কলেজটি। ২০০৫-২০০৬ অর্থ বছরে শিক্ষক, কর্মচারীদের চাঁদায় কলেজ ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে খোলা জায়গায় নির্মাণ করা হয় ভাস্কর্য ‘প্রদীপ্ত স্বাধীনতা’। মহান বিজয় দিবস, স্বাধীণতা দিবসে এই ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে কলেজে উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সময় প্রদীপ্ত স্বাধীনতা ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়। কলেজের শিক্ষক, কর্মচারীরা বলছেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ভাস্কর্যটি ভাঙ্গা হয়। তবে শিক্ষক কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তহবিলে ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয় এজন্য ভাঙ্গার সময় কোন রেজুলেশন করা হয়নি। নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক মহিলা কলেজের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, দেড় দশক আগে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিজস্ব টাকা দিয়ে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। সরকারি অন্য কলেজের মতো মহিলা কলেজটিতেও এই ভাস্কর্যটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছিলো। কিন্তু তৎকালীন অধ্যক্ষ ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণের নামে ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলে। ভেঙ্গে ফেলার ৫ বছর পার হলেও এটি এখনো নির্মাণ না হওয়াতে আমরা হতবাক। ভাস্কর্যটি শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বহন করছিলো না; কলেজেও ঐতিহ্য ধারণ করে আসছিলো। এছাড়া বিভিন্ন দিবসে কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানাতো। এখন ভাস্কর্যটি না থাকাতে শ্রদ্ধা জানাতে পারছে না।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই সবার আগে এই প্রদীপ্ত স্বাধীনতা ভাস্কর্যটি সবার চোখে পড়তো। সেখানে ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলে নির্মাণ করা হয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ। উন্মুক্ত মঞ্চ নাম দিলেও আসলে এটি মিলনায়তন কক্ষের মতো। উপরে টিনের ছাউনি দিয়ে ঘেরা এই মিলনায়তনে কলেজের অভ্যন্তরীণ উৎসব আর বিভিন্ন পরীক্ষার কক্ষ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ক্যাম্পাস থেকে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য অপসারণের চার বছরেও উদ্যোগ নেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনায় জড়িত ও পুনঃনির্মাণে গাফিলতির বিষয়ে অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যশোরের মুক্তিযোদ্ধারাও।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলতে পারে না। কোন উন্নয়নের জন্য ভেঙ্গে ফেলালেও সেটি অন্যত্র নির্মাণ করা উচিত ছিলো। এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ইতিহাস জানতে পারতো। তাদের এই ঘৃণিত কাজে নিন্দা জানাচ্ছি। তবে তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর এম হাসান সরোওয়ার্দীর দাবি, উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণের জন্য শিক্ষক কর্মচারীদের মতামতের ভিত্তিতেই ভাস্কর্যটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীতে পুনঃনির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু আমার বদলিজনিত কারণে কাজটি করে আসতে পারিনি। এর পরেও কেন হয়নি সেটা বলতে পারবো না। আর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়টি তারা অবগত নয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ পরিস্কার জায়গা দিয়েছে। আমরা সেখানে উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ করে দিয়েছি। ভাস্কর্য পুনঃনির্মাণের শর্তে ভাঙার নির্দেশ দিইনি। আর স্বাধীনতার স্মৃতি ভাস্কর্যটি পুনরায় স্থাপন করতে চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে আবেদন দিলে ব্যবস্থা নিবে শিক্ষাপ্রকৌশল অধিদপ্তর বলে জানান দপ্তরটির যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী হাদিউজ্জামান খান।
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর অমল কুমার বিশ্বাস বলেন, ক্যাম্পাসে ভাস্কর্য্যরে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ঘটনাটি আমার আসার আগে। বিষয়টি অবগত হলাম। খোঁজ নিয়ে পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নিবো।
