নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রায় এক যুগ আগেও যে এখানে আমন-আউশ ধানসহ, রবি শস্য উৎপাদনে কৃষকদের মনে সোনালী আনন্দের বন্যা বইতো, তা প্রায় ভুলেই গিয়েছেন আট গ্রামের মানুষ। এখন এসব গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক, ভরা শুষ্ক মৌসুমেও নৌকায় চড়ে তাদের জমি জিরেত দেখে শুধুই চোখের পানি ছাড়েন। ওই সব জমিতে এখন আর সোনার ফসল ফলে না। তাদের চোখের জলেই তৈরি হয়েছে, বিশাল জলরাশি – নাম তার বিলকচুয়া। আর এটার জন্য দায়ী কয়েকশ’ প্রভাবশালী মাছের ঘেরের মালিক।
যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার আলীপুর, বাঁকড়া, মুকুন্দপুর, খোলসী বিষ্ণপুর, রায়পটন, মহেশপাড়া, খাটবাড়িয়া গ্রামের অংশ বিশেষ স্থানীয়রা বিলকচুয়া নামে ডাকেন। এক সময় সোনা ফলা বিলের মাঠটি এখন সাত গ্রামের মানুষের চোখের নোনা জলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে আছে। অন্যতম কারণ ১৯২৭ সালের ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী সরকারি খালের জমি ৯০ সালের রেকর্ডে ব্যক্তি মালিকানায় নামপত্তন করে সেখানেই মাছের চাষ চলছে। সরকারি খালের আরও কোন অস্তিত্বই নেই। এ কারণেই পানি বের হতে না পারায় আজকের এই জলাবদ্ধতা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিল কচুয়ার সাড়ে ৩ হাজার বিঘা জমিতে থৈ থৈ পানি। নৌকা ছাড়া বিলের মাঝখানে যাওয়া যায় না। ফলে, রোপা আমন চাষ করতে পারেননি সাত গ্রামের সহস্রাধিক কৃষক। তাঁরা চলতি মৌসুমে ইরি-বোরো ধানও চাষ করতে পারছেন না। ধানের প্রধান আবাদ ইরি-বোরো ও রোপা চাষ করতে না পারায় ভুক্তভোগি কৃষকরা নিরুপায় হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
বর্ষাকালে এ সকল গ্রামের অধিকাংশ পানি বিলকচুয়ায় এসে পড়ে। সেখান থেকে বিলের বুক চিরে খোলসী গ্রামের সেতুর নিচ দিয়ে শাঁকদাহ স্লুইজ গেট হয়ে পানি প্রবাহিত হতো। কিন্তু পানি প্রবাহের পথে অপরিকল্পিতভাবে শতাধিক পুকুর কেটে মাছ করায় আটকা পড়েছে পানি। ১০ বছর আগে এলাকার প্রভাবশালীরা এসব পুকুর কাটেন। এতে করে বিলকচুয়ার বিল এলাকায় বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি নির্ধারিত খাল দিয়ে প্রবাহিত হতে পারছে না। স্থায়ী জলাবদ্ধতায় পানির নিচে রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার বিঘা জমি। ফলে গত ১০-১১ বছর ধরে বিলটিতে আর কোনো চাষাবাদ হচ্ছে না।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার মাসুদ হাসান পলাশ বলেন, জলাবদ্ধতার ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ইউএনওকে বলেছি,তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সুরাহা করবেন বলে শুনেছি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ চার শতাধিক কৃষক স্বাক্ষরিত একটি আবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্নি দফতরে দিয়েছিলেন। তাতে লেখা হয়েছিল, বিলের পানি নিষ্কাশনের পথে অবৈধভাবে খাটবাড়িয়ার মুজাম্মেল হক, আলীপুরের মোহাম্মদ বিসি ও বিষ্ণপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামসহ কয়েকজন পুকুর কাটায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি অতিবৃষ্টি হলে বিলের পানি উজান এলাকার গ্রামে ঢুকে পড়ে। সেখানেও ফসলহানীর ঘটনা ঘটে।
সংসদ সদস্য ডা. মেজর জেনারেল (অব.) নাসির উদ্দীন বলেন, স্থানীয়দের সাথে বসে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থ্যা নেয়া হবে।
মঙ্গলবার ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল হক দৈনিক কল্যাণকে বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধিসহ জমির মালিকদের সাথে আলোচনা হয়েছে। বাঁকড়া ইউপি চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির সদস্যদের দিয়ে আপাতত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়াও আগামী মৌসুমের আগেই এলজিইডি’র একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সাড়ে ৯ হাজার ফুট খাল খনন করে জলাবদ্ধতা দূর করা হবে।