রুহুল আমিন
যশোরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘির হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে পৌরসভা। প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে দীঘিটিকে পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় রয়েছে দীঘির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর, পাড় বাঁধানো, বসার জন্য নান্দনিক সিঁড়ি ও বারান্দা, আলোকসজ্জা, টাইলস বসানো হাঁটার পথ এবং তিনটি প্রধান ফটকসহ একাধিক প্রবেশপথ নির্মাণ। একই সঙ্গে দীঘির তলদেশের জমে থাকা কাদা-মাটি ও ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হবে।
তবে দরপত্রের নিয়মকানুন সংশোধনের কারণে আপাতত সংস্কারকাজের দরপত্র আহ্বান স্থগিত রয়েছে। পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ আশা করছে, নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লালদীঘির সংস্কারকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লালদীঘি তার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। একসময় এই দীঘির পানিতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিয়মিত গোসল করতেন। অনেকে বাসাবাড়ির রান্নাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনেও দীঘির পানি ব্যবহার করতেন। সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে ময়লা-আবর্জনা জমে দীঘিটির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পানিও ব্যবহার ও গোসলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

পৌরসভার পরিকল্পনা অনুযায়ী, দীঘির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে, যাতে আশপাশের কেউ সহজে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলতে না পারেন। পাশাপাশি পাড় বাঁধানো, বসার জায়গা তৈরি, আধুনিক হাঁটার পথ এবং আলোকসজ্জার মাধ্যমে পুরো এলাকাকে নান্দনিক করে তোলা হবে। দীঘির বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হবে তিনটি প্রধান ফটক ও কয়েকটি ছোট প্রবেশপথ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীঘিটি শুধু পরিচ্ছন্নই হবে না, নগরবাসীর অবসর কাটানোর উপযোগী স্থান হিসেবেও গড়ে উঠবে বলে আশা করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
লালদীঘির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। ৮০ বছরের বেশি বয়সী লতা মিয়া বলেন, তাঁর বয়স যখন ২২ থেকে ২৫ বছর, তখন লালদীঘির প্রাণচাঞ্চল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। সে সময় মণিহার সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে প্রায়ই যশোর শহরে আসতেন তিনি। দীঘির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখতেন, সারিবদ্ধভাবে মানুষ সেখানে গোসল করছেন। বাসাবাড়ির নারীরা রান্নার জন্য কলসিতে করে পানি নিয়ে যাচ্ছেন।
লতা মিয়া বলেন, ‘তখন লালদীঘি শহরের মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন এর অবস্থা দেখে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। দীঘিটির আগের সৌন্দর্য আর ব্যবহার ফিরে এলে ভালো লাগবে।’
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোকলেছুর রহমান বলেন, লালদীঘিকে পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হলে সংস্কারকাজে হাত দেওয়া হবে। নভেম্বরের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা যেতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, লালদীঘি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে এবং নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে। দরপত্রের জন্য নতুন করে রেট শিডিউল প্রস্তুত করতে হচ্ছে। এ ছাড়া দরপত্রসংক্রান্ত কিছু নিয়মকানুন পরিবর্তন ও সংশোধনের কাজ চলায় প্রক্রিয়াটি আপাতত বন্ধ রয়েছে। নভেম্বর থেকে দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হতে পারে। প্রক্রিয়া শুরু হলে লালদীঘিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তুত করা নকশা অনুযায়ী সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘লালদীঘি যশোরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। বর্তমানে দীঘিটি তার পুরোনো জৌলুস হারাতে বসেছে। এর সৌন্দর্য ফিরিয়ে এনে সবার কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পৌরসভার পক্ষ থেকে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে লালদীঘিকে পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হবে।’
