কল্যাণ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়েও সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বুধবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর উত্তরসূরি হিসেবে যিনিই নির্বাচিত হোন না কেন, তাঁকে হত্যা করা হবে।
গত শনিবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এরপর থেকেই দেশটিতে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কাৎজের এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলকে ধ্বংসের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসন এবং ইরানি জনগণকে দমন–পীড়নের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখলে নতুন নেতাকেও ‘নিশানা’ করা হবে—তিনি যেখানেই থাকুন না কেন।
খামেনিকে শেষবিদায়: তিন দিনের আনুষ্ঠানিকতা
ইরান সরকার জানিয়েছে, খামেনিকে শেষবিদায় জানাতে তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। স্থানীয় সময় বুধবার রাত ১০টা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে। জানাজার সময় ও স্থান পরে ঘোষণা করা হবে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর আগে খামেনির শাহাদাতে সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ শোকমিছিল ও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
ইরানে ব্যাপক হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি
ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তাঁর দাবি, গত কয়েক দিনে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং ইরানের ১৭টি রণতরী ধ্বংস করা হয়েছে।
মার্কিন পক্ষের দাবি, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কমে এসেছে। তবে ইরান বলছে, তাদের হাতে এখনো ‘সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র’ রয়েছে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে প্রস্তুত।
বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে এক হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
ইরানের বিভিন্ন শহরে স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও আবাসিক এলাকায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। নিহত শিক্ষার্থীদের জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে।
লেবানন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে উত্তেজনা
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। বৈরুত ও বালবেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও নয়টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস ও সিআইএ–সম্পর্কিত স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
রাশিয়া–চীনের প্রতিক্রিয়া
ইরানে যৌথ হামলার সমালোচনা করেছে রাশিয়া ও চীন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। রাশিয়ার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সরাসরি অবস্থান নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া, ইসরায়েলের সরাসরি হত্যার হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত ও বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে।
