ঢাকা অফিস
সারা দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে দ্রুতগতিতে। স্বল্প দূরত্বের বাহনটি এখন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই পরিস্থিতির রাশ টানতে সরকার ‘মোটরসাইকেল চলাচল নীতিমালা’র খসড়া তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজার মতো উৎসব-পার্বণের আগে-পরে ১০ দিন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ রাখা হবে। এছাড়া মহাসড়কে মোটরসাইকেল আরোহী বহন এবং ১২৬ সিসি ইঞ্জিনের নিচে বাইক চলাচলও নিষিদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। খসড়াটি শিগগিরই অনুমোদন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দুজন কর্মকর্তা বলেন, নীতিমালটি এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। এতে নীতিমালার বিভিন্ন ধারা-উপধারায় পরিবর্তন আসতে পারে। দুই ঈদ ও দুর্গাপূজার সময় মহাসড়কে বাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ১০ দিনের ক্ষেত্রে কমতেও পারে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রায় মোটরসাইকেলের চলাচল বহুগুণে বেড়ে যায়। এতে মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশি হয়। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় হতাহত হয়ে থাকে। জরুরি প্রয়োজনে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের উদ্দেশ্য থাকলেও বর্তমানে তা মহাসড়কসহ সর্বত্র চলাচল করতে দেখা যায়।
এতে বেপরোয়া প্রতিযোগিতার মনোভাব, গতি বাড়ানোর প্রবণতা, মোটরসাইকেলের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা না থাকা, আইন পালনে অনীহা, মোবাইল ফোন ব্যবহার ইত্যাদিকে মোটরসাইকেলজনিত দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ কারণে সড়ক নিরাপত্তার উন্নতির জন্য মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়।
নীতিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ নম্বর ধারায় ‘মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ’-এর কথা বলা হয়েছে। ১৪টি উপধারার মধ্যে দুটিতে বলা আছে, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা ইত্যাদি পার্বণকালীন আগে ও পরে মোট ১০ দিন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। মহাসড়কে সর্বনিম্ন ১২৬ সিসি ইঞ্জিন বা সমতুল্য ক্ষমতার (‘ল’ সিরিজ) মোটরাইকেল চলাচল করতে পারবে অর্থাৎ মহাসড়কে ১২৬ সিসি ইঞ্জিন বা সমতুল্য ক্ষমতার চেয়ে নিম্ন ক্ষমতার কোনও মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারবে না।
আরও পড়ুন:সরকার ভূত দেখার মত ভয় পেয়েছে : ফারুক
অন্য উপধারায় বলা হয়েছে, মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালনাকালে চালক কোনও আরোহী বহন করতে পারবে না। চালককে নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি (চেস্ট গার্ড, নি গার্ড, এলবো গার্ড, গোড়ালি ঢাকা জুতা বা কেডস, সম্পূর্ণ আঙুল ঢাকা গ্লাভস এবং ফুলপ্যান্ট, ফুল শার্ট) ব্যবহার করতে হবে। হালনাগাদ বৈধ কাগজপত্র (ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন সনদ, ট্যাক্স-টোকেন ইত্যাদি) এবং রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্রেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো যাবে না।
রোড সেফটির নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘নীতিমালাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমবে। তবে এতে কিছু ভালো দিকের পাশাপাশি অনেকগুলো অযৌক্তিক বিষয় আছে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না আনতে পারলে কেবল বাইকের ওপর নিয়ন্ত্রণারোপ করে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।’
তার মতে, নীতিমালা করলেই হবে না, সেটি সঠিক ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে নজরদারি বাড়াতে হবে, বিশেষ করে রাতে। রাতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটলেও তা বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারছে না পুলিশ। নিরাপদ সড়ক আইনের সঠিক বাস্তবায়ন তো হচ্ছে না, সেটি করতে হবে। সড়কের অন্যগুলোকে বাইরে রেখে কেবল মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করলে তা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি ঘটবে না।
প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতু চালুর পর গেল বছরের ঈদযাত্রায় ৭ থেকে ১৩ জুলাই সাত দিন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা হয়। সে সময় সচিবালয়ে ঈদযাত্রা নিয়ে এক বৈঠকের পর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানিয়েছিলেন, যৌক্তিক কারণ ছাড়া ঈদের আগের ৩ দিন, ঈদের দিন এবং ঈদের পরের ৩ দিন এই ৭ দিন মোটরসাইকেল চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে।
বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২২ সালে জানায়, গত তিন বছর ৯ মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৯ হাজার ২৩টি, প্রাণহানি ঘটেছে ২১ হাজার ৯৮৩ জনের। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪৭৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৩৩ জন নিহত হয়েছেন।
আরও পড়ুন:পথভ্রষ্ট হয়ে ভুলপথে হাঁটছে বিএনপি : শাহীন চাকলাদার
