শাহারুল ইসলাম ফারদিন
দেশের অন্যতম বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাটে শনিবার চামড়া উঠে আশানুরূপ। কিন্তু কাঙ্খিত দাম না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, বেচাকেনায় আড়তদাররা সরকার নির্ধারিত মূল্যের কোনো তোয়াক্কা করছেন না। এজন্য এবছর ব্যাপক লোকসানের আশংকা করছেন তারা। তবে ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া বিক্রি করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। শনিবার (২২ জুন) ঈদ পরবর্তী দ্বিতীয় হাট ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজারহাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় চামড়ার হাট। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী, নাটোরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। ঈদ পরবর্তী সময়ে এ বাজারের দিকে নজর থাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের। শনিবারের হাটে প্রায় ৬০ হাজার চামড়া আনা হয়েছে বলে দাবি ইজারাদার ও ব্যবসায়ী নেতাদের। এদিন বেচাকেনাও হয়েছে অনেক। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যে তারা চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। একেকটি গরুর চামড়া ৪শ থেকে ৭শ টাকায় কিনেছেন বলে দাবি করেছেন তারা। লবণ ব্যবহারের ফলে আরও ১শ থেকে ১শ ৫০ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এছাড়াও পরিবহন ও লেবার খরচ আছে আরো ১শ থেকে ১শ ৫০ টাকা। কিন্তু হাটে প্রতি পিস চামড়ার দাম ৫শ থেকে ৯শ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
খুলনার পাইকগাছা থেকে চামড়া নিয়ে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাধন দাস বলেন, ৩৮০ পিস চামড়া নিয়ে আসা হয়েছে এই হাটে। কিন্তু আশানুরূপ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। একেকটি চামড়া ক্রয়, লবণ ব্যবহার, পরিবহন ও লেবার খরচ পড়েছে ৭শ টাকা করে। অথচ ৬শ ৫০ টাকার উপরে কেউ দাম বলছে না। ছাগলের চামড়া নিয়ে আসা হয়েছে ২শ পিস। ২০ টাকা করে ৮০ পিস চামড়া বিক্রি হয়েছে। বাকি চামড়াগুলো কেউ ৫ টাকাও দাম দিতে চাচ্ছে না। সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও, সেই দামে হাটে বেচাকেনা হচ্ছে না। চরম লোকসানের শিকার হতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার রঘুনাথপুর থেকে ২১৬ পিস গরুর চামড়া নিয়ে এসেছেন আর এক ব্যবসায়ী লক্ষ্মণ চন্দ্র দাস। আশির দশক থেকে তিনি চামড়া কেনা-কেনা করে আসছেন। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ ছোট আকারের ৪০ পিস গরুর চামড়া বিক্রি করেছি ৪শ টাকা দরে। বড়গুলোর দাম ৭শ টাকার নিচে। তিনি জানান, প্রতিটি চামড়া কেনা, লবণ দেওয়া, পরিবহন, শ্রমিক খরচ দিয়ে গড়ে খরচ হয়েছে ৮শ টাকার মতো। কিন্তু বাজারের যে দর, তাতে চামড়া বিক্রি করে লাকসান হবে।
এদিকে আড়তদারদের দাবি দাম নির্ধারণ করা হলেও, ট্যানারি মালিকরা সে দামে কিনছেন না। ফলে বাজার অনুপাতে মানভেদে চামড়া সংগ্রহ করছেন তারা।
হাসিব ইসলাম নামে এক বড় ব্যবসায়ী বলেন, ঈদের পরবর্তী হাটে ৩০ ফুটের চামড়া ট্যানারি মালিকরা ১ হাজার টাকা করে দাম দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম দিচ্ছেন না তারা। ফলে আড়তদারদেরও বাজার অনুপাতেই চামড়া কিনতে হচ্ছে। এ কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না। তাছাড়া চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ‘চায়না’মুখী হয়ে গিয়েছে। এ বাজারকে ইউরোপমুখী করা গেলে সুদিন ফিরবে বলে মন্তব্য করেছেন এই আড়তদারের। চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকার ট্যানারি স্থানান্তর হওয়ার কারণে অনেক আড়তদার চামড়া সংগ্রহ করছেন না। ট্যানারি এক জায়গায়, আড়ত আরেক জায়গায়। অনেক আড়তে আমাদের টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যেসব কেমিক্যাল দরকার, সেগুলোর দামও বেড়েছে।
রাজারহাট বাজারের সাবেক ইজারাদার ও আড়তদার হাসানুজ্জামান হাসু বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে। যে চামড়ার মান ভালো, সেটি বেশি দামেই কেনা হচ্ছে। নিম্ন মানের চামড়ার দাম বেশি হবে না এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, আজকে পর্যাপ্ত চামড়া উঠেছে। তবে সেটি আশানুরূপ নয়। আগামী হাটগুলোতে আরও বেশি পরিমাণে চামড়া উঠবে, তখন দামও কিছুটা বাড়বে বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী।
এ অবস্থায় চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে তৃণমূলের ব্যবসায়ীদের ঋণ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি কাঁচা চামড়া রফতানির উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, আজকের হাটে প্রায় ৩০ হাজারের মতো চামড়া উঠেছে। চামড়ার মানভেদে বিভিন্ন দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দাম কম বললেও, একেবারে লোকসান হচ্ছে না তাদের। চামড়া ব্যবসার সুদিন ফিরিয়ে আনতে গেলে ব্লু বা কাঁচা চামড়া রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। যখন রেমিট্যান্স বেশি আয় করা সম্ভব হবে, তখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও ভালো দাম পাবেন। তাছাড়া চামড়া কেনার জন্য জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদেরও ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা এ খাতকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
